কুড়িগ্রামের উত্তর-পূর্ব প্রান্তের উপজেলা ভূরুঙ্গামারী, আর তার বঙ্গ সোনাহাট সীমান্তে সোনাহাট স্থলবন্দর — ওপারে ভারতের আসামের গোলকগঞ্জ। এই বন্দরকে বলা হয় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাত রাজ্যের ("সেভেন সিস্টার্স") গেটওয়ে (বাংলা উইকিপিডিয়া)। কিন্তু সোনাহাটের আসল গল্প বন্দরে নয়, তার সামনের দুধকুমার নদের সেতুতে।
বন্দরের তিন ধাপে জন্ম
নদীর তীরবর্তী হওয়ায় ব্রিটিশ আমলেই সোনাহাট ছিল বিখ্যাত বাণিজ্যিক কেন্দ্র (বাংলা উইকিপিডিয়া)। আধুনিক স্থলবন্দরের যাত্রা ধাপে ধাপে: ২০১২ সালের ১৭ নভেম্বর উদ্বোধন, ২০১৪ সালের ২৮ এপ্রিল পণ্য আমদানি চালু, আর ২০১৮ সালের জুনে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন তৎকালীন নৌপরিবহন মন্ত্রী (বাংলা উইকিপিডিয়া)। বর্তমানে প্রধান আমদানি পাথর ও কয়লা — আসাম-নাগাল্যান্ড থেকে আসা পণ্য নিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৮০–১০০ ট্রাক গোলকগঞ্জ থেকে প্রবেশ করে বলে উইকিপিডিয়ায় বলা হয়েছে; অনুমোদিত আমদানি পণ্য ১০টি (পাথর, কয়লা, তাজা ফল, ভুট্টা, গম, চাল, ডাল, আদা, পেঁয়াজ, রসুন), রপ্তানি হয় মূলত প্লাস্টিক পণ্য (বাংলা উইকিপিডিয়া)। যাত্রী পারাপারের (ইমিগ্রেশন) বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে "প্রক্রিয়াধীন" — অর্থাৎ হিলির মতো এটিও এখন পর্যন্ত পণ্যবাহী বন্দর। ভুটানও একসময় বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যে এই বন্দর ব্যবহারের আগ্রহ দেখিয়েছিল (নিউজবাংলা) — দিনাজপুরের হিলি বন্দরের মতো সোনাহাটেরও সম্ভাবনা তার বর্তমান রূপের চেয়ে বড়।
সোনাহাট সেতু: ১৯৭১-এ বোমায় ভাঙা, ২০০১-এ মেয়াদোত্তীর্ণ
বন্দরগামী সড়কে দুধকুমার নদের ওপরের লোহার সেতুটি ব্রিটিশ আমলের — সড়ক ও জনপথ বিভাগের বর্ণনায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পশ্চিমবঙ্গ-আসাম সড়ক যোগাযোগের জন্য নির্মিত; দৈর্ঘ্য সূত্রভেদে ৩৬৬ থেকে ৪০০ মিটার (প্রথম আলো/ডেইলি স্টার)। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদার বাহিনী বোমা মেরে এর একটি অংশ উড়িয়ে দেয়; স্বাধীনতার পর স্টিলের পাত বসিয়ে মেরামত করে চলাচল চালু হয় (প্রথম আলো)। সেতুটির মেয়াদ শেষ হয় ২০০১ সালে (ডেইলি স্টার) — তবু দুই দশকের বেশি সময় ধরে বন্দরের ট্রাকসহ সব যানবাহন ঝুঁকি নিয়ে এই সেতু দিয়েই চলছে; পাড়ের পাঁচটি ইউনিয়নের (সোনাহাট, হলদিয়া, বল্লভের খাস, কচাকাটা, কেদার) মানুষেরও এটাই একমাত্র পথ। সেতুমুখে "ঝুঁকিপূর্ণ" সতর্কবার্তা টানানো আছে (প্রথম আলো)।
নতুন সেতু: সাত বছরেও অপূর্ণ (অক্টোবর ২০২৬)
সমাধানের প্রকল্প অনুমোদন পায় ২০১৮ সালের একনেকে: ৬৪৫ মিটার দীর্ঘ নতুন সেতু, প্রাথমিক ব্যয় ১৩৬ কোটি টাকা, পরে বেড়ে প্রায় ১৪১ কোটি। কাজ শুরু ২০১৯ সালের ২২ জুলাই, শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২১ সালের জানুয়ারিতে। বাস্তব: ছয় দফা সময় বাড়িয়েও ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত কাজ শেষ হয়নি — প্রায় ৭৫ শতাংশ সম্পন্ন; পূর্ব প্রান্তের সংযোগ সড়কের প্রায় ২৮০ মিটার অংশ আটকে আছে ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় (ডেইলি নিউ নেশন, অক্টোবর ২০২৬)। ততদিন ব্যবসায়ী, ট্রাকচালক আর কয়েক লাখ স্থানীয় মানুষের ভরসা সেই মেয়াদোত্তীর্ণ লোহার সেতুই।
ভ্রমণকারীর জন্য নোট
সোনাহাট ভ্রমণ-স্থান নয়, সীমান্ত বাণিজ্যের কর্মস্থল — চিলমারীর মতো এখানেও যাত্রী পারাপার নেই, অনুমতি ছাড়া বন্দর এলাকায় ছবি তোলা যাবে না। ভূরুঙ্গামারী শহরটিই থাকা-খাওয়ার ঘাঁটি। তবে ইতিহাস-অনুরাগীর জন্য দুধকুমারের পাড় থেকে পুরনো লোহার সেতুটি দেখা বিশেষ অভিজ্ঞতা — ব্রিটিশ যুগ, মুক্তিযুদ্ধ আর আজকের বাণিজ্য, তিন যুগের সাক্ষী এক কাঠামো। সেতুতে হাঁটার ক্ষেত্রে সতর্কতা: ভারী যানবাহনের চাপে থাকে সবসময় — পাশে সরে দাঁড়ান, সতর্কবোর্ডের নির্দেশ মানুন।
ভ্রমণ তথ্য
পথ: কুড়িগ্রাম শহর থেকে সড়কপথে নাগেশ্বরী হয়ে ভূরুঙ্গামারী, সেখান থেকে সোনাহাট। সীমান্ত এলাকায় যাওয়ার আগে স্থানীয় প্রশাসন/বিজিবির নিয়ম জেনে নিন। এই সার্কিটের সেরা ছন্দ: একদিনে ভূরুঙ্গামারী-সোনাহাট, আরেকদিনে চিলমারী — মাঝখানে কুড়িগ্রাম শহরে ধরলার পাড়ে সন্ধ্যা।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
সোনাহাট স্থলবন্দর কোথায়?
কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার বঙ্গ সোনাহাট সীমান্তে, আসামের গোলকগঞ্জের বিপরীতে (উইকিপিডিয়া)।
বন্দর দিয়ে কী আমদানি হয়?
প্রধানত পাথর ও কয়লা; মোট ১০টি পণ্য আমদানির অনুমতি আছে (উইকিপিডিয়া)।
সোনাহাট সেতু কেন আলোচিত?
ব্রিটিশ আমলের লোহার সেতুটি ২০০১ সালে মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও আজও সব যানবাহন এ দিয়েই চলে (ডেইলি স্টার)।
নতুন সেতুর কাজ কতদূর?
প্রায় ৭৫% শেষ; সংযোগ সড়কের অংশ ভূমি অধিগ্রহণে আটকে (ডেইলি নিউ নেশন, অক্টোবর ২০২৬)।
সোনাহাট দিয়ে যাত্রী ভারত যাওয়া যায়?
না — ইমিগ্রেশন চালু হয়নি; এটি পণ্যবাহী বন্দর।
শেষকথা
নতুন সেতু যেদিন খুলবে, সেদিন বদলে যাবে পুরো ভূরুঙ্গামারীর অর্থনীতি। ততদিন সোনাহাট দাঁড়িয়ে আছে একটা ঝুঁকিপূর্ণ লোহার সেতুর ওপর — সম্ভাবনা আর অবকাঠামোর ব্যবধানের সবচেয়ে স্পষ্ট ছবি হয়ে। কুড়িগ্রামের তিনটি পোস্ট এখানেই শেষ: ধরলার শহর, ব্রহ্মপুত্রের বন্দর, আর দুধকুমারের সীমান্ত — নদীই এই জেলার সব গল্পের নায়ক।