কুড়িগ্রাম শহর থেকে ৩৫ কিলোমিটার দক্ষিণে, ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে চিলমারী বন্দর — একদা উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে মুখর নদীবন্দরগুলোর একটি। আজ তার গল্প তিন স্তরের: পাটের স্বর্ণযুগ, ভাঙনের কাছে হার, আর পুনরুদ্ধারের অনিশ্চিত চেষ্টা। কুড়িগ্রাম শহর থেকে এক দিনের যাত্রায় এই বন্দর ইতিহাসপ্রেমীর জন্য অবশ্যদ্রষ্টব্য।
পাটের স্বর্ণযুগ: তিরিশের দশকের মুখর বন্দর
চিলমারীতে পাটের কারবার শুরু হয় ১৯৩০-এর দশকে (বাংলা উইকিপিডিয়া)। ব্রহ্মপুত্রের কোল ঘেঁষে কয়েক কিলোমিটারজুড়ে ছিল বন্দর — প্রশাসনিক ভবন, কাস্টমস অফিস, বড় বড় পাটের গুদাম; জুট ট্রেডিং কোম্পানিসহ প্রায় ৩০টি পাট কোম্পানি এখানে কারবার জমায়। পাট কেনা, বাছাই ও বেল তৈরির কাজে প্রতিদিন প্রায় ৯০০ শ্রমিক কাজ করতেন; প্রায় ৩০০ গরুর গাড়িতে দূরদূরান্ত থেকে পাট এসে নারায়ণগঞ্জ, খুলনা, চট্টগ্রামসহ নানা গন্তব্যে যেত (বাংলা উইকিপিডিয়া)। দেশি-বিদেশি জাহাজের আসা-যাওয়া ছিল নিয়মিত; সীমান্তের ওপারে আসামের সঙ্গে ফেরি সার্ভিসও চলত। আর সংস্কৃতিতে: চিলমারী বন্দর নিয়ে আব্বাসউদ্দীনের গাওয়া ভাওয়াইয়া আজও বাংলার লোকসংগীতের সম্পদ বলে বর্ণিত হয় (ডকুমেন্টারি সূত্র)।
ভাঙন: নদের গ্রাসে বিলীন বন্দর
কালের আবর্তে ব্রহ্মপুত্রের ভয়াবহ ভাঙনে ঐতিহাসিক বন্দরটি প্রায় সম্পূর্ণরূপে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায় (বাংলা উইকিপিডিয়া)। নাব্যতা কমে যাওয়ায় বড় জাহাজ চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে বন্দর; টিকে থাকে শুধু নৌপরিবহন। আজকের চিলমারী নদীবন্দরটি পরিচালনা করে বিআইডব্লিউটিএ — পণ্য ধান, পাট, পাথর ও রাসায়নিক সার; পানির গভীরতা মাত্র ২ মিটার; ইঞ্জিনচালিত নৌকায় পণ্য পরিবহন ও যাত্রী পারাপার চলে, আছে একটি ভাসমান তেল ডিপো (বাংলা উইকিপিডিয়া)। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ ঘাটের মতোই চিলমারী শেখায় — নদীবন্দরের ভাগ্য নদীর মর্জিতে বাঁধা।
সর্বশেষ অবস্থা (অক্টোবর ২০২৬): ফেরি বন্ধ, প্রকল্প চলমান
চিলমারীর সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘটনা চিলমারী–রৌমারী ফেরি সার্ভিস: ২০২৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর চালু হয় (বিআইডব্লিউটিসির ফেরি কুঞ্জলতা ও কদম; চিলমারীর রমনা ঘাট থেকে রৌমারীর ফুলেরচর ঘাট) — উত্তরাঞ্চলের পণ্য পরিবহনে এটি দ্রুত জনপ্রিয় হয় (বাংলাদেশ টুডে/জাগো নিউজ)। কিন্তু কয়েক দফা বন্ধ-চালুর পর ২০২৬ সালের ১৪ আগস্ট থেকে ফেরি চলাচল আবার পুরোপুরি বন্ধ; "মেরামতের" কথা বলে সরিয়ে নেওয়া ফেরি দুটি পরে চাঁদপুর ও ভোলা ঘাটে সংযুক্ত হয়েছে, বিআইডব্লিউটিসির স্থানীয় কার্যালয়ও সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অন্যত্র বদলি করা হয়েছে — ফলে সার্ভিস ফেরা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে (জাগো নিউজ, ২৮ অক্টোবর ২০২৬; সমকাল, ৩১ অক্টোবর ২০২৬)। বিপরীতে, একই সময়ে চলমান আছে প্রায় ৩৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে চিলমারী নদীবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ (একাধিক সংবাদমাধ্যম)। অর্থাৎ এই মুহূর্তে চিলমারী এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে: ভবিষ্যতের বন্দর নির্মাণাধীন, বর্তমানের ফেরি অনুপস্থিত।
ভ্রমণকারীর চোখে চিলমারী
দেখার জিনিস এখানে স্থাপত্য নয়, নদী নিজেই: বিস্তীর্ণ ব্রহ্মপুত্র, চর, নৌকার সারি; পরিষ্কার দিনে দূরে মেঘালয়ের পাহাড়শ্রেণির আভাস পাওয়া যায় বলে বর্ণনা মেলে। শীতে অষ্টমীর চর ও আশপাশের শাখা নদীগুলোতে নানা প্রজাতির পাখি আসে (ডকুমেন্টারি সূত্র)। রমনা, ফকিরেরহাট ও জোড়গাছ ঘাট থেকে রৌমারী, রাজিবপুর, ফুলছড়ি, বাহাদুরাবাদ প্রভৃতি গন্তব্যে যাত্রী নৌকা চলে — নৌকাভ্রমণই এখানকার সেরা অভিজ্ঞতা। ফেরি বন্ধ থাকায় যানবাহন নিয়ে রৌমারী যেতে হলে সড়কপথের বিকল্প আগে জেনে নিন।
ভ্রমণ তথ্য
কুড়িগ্রাম জেলা শহর থেকে বাস/অটোতে চিলমারী (প্রায় ৩৫ কিমি)। সেরা সময় শীতকাল — নদী শান্ত, পাখি আসে, চর জাগে। বর্ষায় ব্রহ্মপুত্রের বিস্তার দেখা গেলেও ভাঙনকবল এলাকায় সতর্ক থাকুন, ঘাটের সর্বশেষ অবস্থা স্থানীয়ভাবে যাচাই করে নিন — এই বন্দরের পরিস্থিতি দ্রুত বদলায়, যেমনটা ফেরির ঘটনাই দেখিয়ে দিল।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
চিলমারী বন্দর কিসের জন্য বিখ্যাত ছিল?
পাট বাণিজ্যের জন্য — ১৯৩০-এর দশক থেকে প্রায় ৩০টি পাট কোম্পানির কারবার ছিল এখানে (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
বন্দরটি ধ্বংস হলো কীভাবে?
ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে মূল বন্দর নদীগর্ভে বিলীন হয় (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
চিলমারী–রৌমারী ফেরি কি এখন চলছে?
না — ১৪ আগস্ট ২০২৬ থেকে বন্ধ; ফেরি দুটি অন্য ঘাটে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে (জাগো নিউজ/সমকাল, অক্টোবর ২০২৬)।
বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের অবস্থা কী?
প্রায় ৩৪৫ কোটি টাকার নদীবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলমান (সংবাদমাধ্যম)।
কুড়িগ্রাম শহর থেকে দূরত্ব কত?
প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দক্ষিণে।
শেষকথা
পাটের গুদাম নেই, জাহাজ নেই, এখন ফেরিও নেই — তবু ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে দাঁড়ালে চিলমারীর শতবর্ষের বন্দর-জীবনের ওজন টের পাওয়া যায়। উন্নয়ন প্রকল্প শেষ হলে হয়তো নতুন অধ্যায় শুরু হবে; ততদিন চিলমারী নদী-ইতিহাসের এক জীবন্ত পাঠশালা।