গাইবান্ধার দক্ষিণের বাণিজ্যিক উপজেলা গোবিন্দগঞ্জ, আর তার মহিমাগঞ্জে জেলার একমাত্র ভারী শিল্প — রংপুর সুগার মিলস। নামে "রংপুর" হলেও মিলটি গাইবান্ধাতেই; একসময় এশিয়ার সবচেয়ে বড় চিনিকল বলে পরিচিত ছিল। এই পোস্টে মিলের ইতিহাস, তার হারিয়ে যাওয়া রেলপথ, আর সেই জমি ঘিরে সাত দশকের বিতর্ক — সবটাই সৎভাবে।
মিলের ইতিহাস: ১৯৫৪–৫৭-এ গড়া শিল্পনগরী
প্রতিষ্ঠাতা আবু হোসেন সরকারের উদ্যোগে ১৯৫৪ সালে নির্মাণ শুরু, ১৯৫৭ সালে শেষ; ১৯৫৭–৫৮ মৌসুম থেকে চিনি উৎপাদন শুরু হয় (বাংলা উইকিপিডিয়া)। ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত হয়; বর্তমানে মালিক বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (বাংলা উইকিপিডিয়া)। দৈনিক আখ মাড়াই ক্ষমতা ১,৫০০ মেট্রিক টন, বার্ষিক চিনি উৎপাদন ক্ষমতা ১৫,০০০ টন (বাংলা উইকিপিডিয়া)। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের হিসাবে, ১৯৫৭ থেকে ২০২০ — ৬৩ বছরে মিলের চাকা ঘুরেছে মাত্র প্রায় ৫,৭৩৯ দিন; ৫৬ লাখ টনের বেশি আখ মাড়াই করে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৪.২৭ লাখ টন চিনি। দীর্ঘ লোকসানের ইতিহাসও দীর্ঘ: ২০০৪ সালে সরকার মিলটি বন্ধ করে দেয়, ২০০৬ সালে পুনরায় চালু হয় (ডেইলি স্টার)। ২০২০ সালের পর থেকে মিলে আখ মাড়াই বন্ধ রয়েছে বলে টিবিএসের তথ্যে ইঙ্গিত মেলে — যাওয়ার আগে মিলের বর্তমান কার্যক্রম স্থানীয়ভাবে জেনে নিন।
হারিয়ে যাওয়া রেলপথ: চিনিকলের নিজের ইঞ্জিন
মহিমাগঞ্জের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী গল্প এই রেলপথ (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন "রংপুর চিনিকলে হারিয়ে যাওয়া রেলপথের গল্প")। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে আমদানি করা দুটি ছোট্ট রেল ইঞ্জিন মিলের নিজস্ব প্রায় দুই কিলোমিটার রেলপথে মিল থেকে মহিমাগঞ্জ রেলস্টেশন পর্যন্ত চলত: বিভিন্ন স্টেশন থেকে আসা আখবোঝাই বগি টেনে মিলে আনা, আর উৎপাদিত চিনি-চিটাগুড় স্টেশনে পৌঁছে দেওয়া — সারাদিনই চলত এই আসা-যাওয়া। আজ ইঞ্জিন দুটির টিকে থাকা একটিও ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, লাইন জায়গায় জায়গায় হারিয়ে গেছে। স্টেশন এলাকা ও মিলের বাইরের অংশ থেকে এই শিল্প-প্রত্নের অবশেষ দেখা যায় — গাইবান্ধার বালাসী ঘাটের রেল-ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলিয়ে এই জেলায় রেলের দুই হারানো অধ্যায় পাশাপাশি দাঁড়ায়।
সাহেবগঞ্জের জমি: সাত দশকের বিতর্ক
সৎ প্রেক্ষাপটটি অপরিহার্য। মিলের আখ খামার সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্মের ১,৮৪২ একর জমি ১৯৫৫–৫৬ সালে অধিগ্রহণ করা হয়; এলাকায় ছিল প্রায় ২০টি গ্রাম, যার বেশিরভাগের বাসিন্দা ছিলেন সাঁওতালসহ আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ — উচ্ছেদ হয়ে তাঁরা ভূমিহীন হন (ডেইলি স্টার)। ১৯৬২ সালের চুক্তিতে শর্ত ছিল, আখ ছাড়া অন্য ফসল হলে জমি মূল মালিকদের ফিরিয়ে দিতে হবে; অভিযোগ, মিল কর্তৃপক্ষ বেশিরভাগ জমি ইজারা দিয়ে ধান-গম-তামাক চাষ করিয়েছে (ডেইলি স্টার)। উচ্ছেদিত পরিবারগুলোর গড়া ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির আন্দোলন চলেছে বহু বছর; ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে সংঘর্ষে সাঁওতালদের প্রাণহানি ঘটে (সংবাদমাধ্যমে দুই থেকে তিনজন নিহতের খবর এসেছে), বহু পরিবার এখনো অনিশ্চয়তায় (ডেইলি স্টার)। সাম্প্রতিক খবর: খামারের জমির ৪৫০ একর রংপুর ইপিজেড নির্মাণের জন্য সরকারি সিদ্ধান্ত হয়েছে (বাংলা উইকিপিডিয়া)। ভ্রমণকারী হিসেবে এই এলাকায় গেলে ইতিহাসের এই ভারী অধ্যায়ের প্রতি সংবেদনশীল থাকুন; স্থানীয়দের ছবি বা জমি-প্রসঙ্গে অনুমতি ও সম্মান বজায় রাখুন।
গোবিন্দগঞ্জ শহর: মহাসড়কের বাণিজ্য শহর
ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের ধারের গোবিন্দগঞ্জ উত্তরের অন্যতম ব্যস্ত উপজেলা শহর — পাইকারি বাণিজ্য, বাজার আর যাতায়াতের জংশন। মহিমাগঞ্জ যাওয়ার ঘাঁটি এটাই; শহর থেকে মহিমাগঞ্জ স্টেশন ও মিল এলাকা কাছেই। দিনাজপুর-রংপুর সার্কিটে চলতে গিয়ে এখানে যাত্রাবিরতি মানেই চিনিকলের শহরের স্বাদ। প্রতিবেশী জেলা শহর হিসেবে বগুড়া এই সার্কিটের স্বাভাবিক জুটি।
ভ্রমণ তথ্য
যাওয়া: ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে বাসে গোবিন্দগঞ্জ; রেলে মহিমাগঞ্জ স্টেশন। মিলটি সচল শিল্প/প্রশাসনিক এলাকা — ভেতরে প্রবেশে কর্তৃপক্ষের অনুমতি লাগে; বাইরে থেকে স্থাপনা ও স্টেশন এলাকা দেখুন। মাড়াই মৌসুমে (যদি চালু থাকে) আখের ট্রাকের সারি এই শহরের ঐতিহ্যিক দৃশ্য। চিনিকল-কেন্দ্রিক ভ্রমণে সেরা জুটি: সকালে মহিমাগঞ্জ, পরে গাইবান্ধা শহর হয়ে বালাসী ঘাটে বিকেল।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
রংপুর চিনিকল আসলে কোথায়?
নামে রংপুর হলেও গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মহিমাগঞ্জে (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
মিলটি কবে চালু হয়?
নির্মাণ ১৯৫৪–৫৭; উৎপাদন ১৯৫৭–৫৮ মৌসুম থেকে (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
চিনিকলের রেলপথটি কী ছিল?
মিলের নিজস্ব দুটি ইঞ্জিন প্রায় ২ কিমি লাইনে মহিমাগঞ্জ স্টেশন পর্যন্ত আখ-বগি ও চিনি বহন করত (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড)।
মিল কি এখন চালু?
দীর্ঘ লোকসানের পর ২০২০ সালের পর থেকে মাড়াই বন্ধের ইঙ্গিত মেলে (টিবিএস) — যাওয়ার আগে যাচাই করে নিন।
সাহেবগঞ্জ বিতর্কটি কী?
১৯৫৫–৫৬ সালে অধিগৃহীত সাঁওতালদের জমি ফেরতের শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ ঘিরে দীর্ঘ আন্দোলন (ডেইলি স্টার)।
শেষকথা
মহিমাগঞ্জ শুধু একটি বন্ধপ্রায় মিলের ঠিকানা নয় — শিল্পায়নের স্বপ্ন, রেলের স্মৃতি আর ভূমির ন্যায়ের প্রশ্ন একসঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকা এক বিরল পাঠ। গোবিন্দগঞ্জে থামলে সেই পাঠটাই এই উপজেলার আসল দর্শনীয় বিষয়।