• 31 Oct, 2026

লালমনিরহাট শহর ভ্রমণ গাইড — বিভাগীয় রেল শহরের ইতিহাস, বেঙ্গল ডুয়ার্স রেলওয়ে ও আসাম মেইল, মোগলহাটের বিচ্ছিন্ন সীমান্ত লাইন, হারানো মসজিদের দাবি ও বিতর্ক, বিমানঘাঁটি এবং শহরের বেড়ানোর জায়গাসহ যাওয়ার তথ্য।

বাংলাদেশের হাতে গোনা যে কয়েকটা শহর রেলওয়েকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে, লালমনিরহাট তাদের সামনের সারিতে। শহরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা লাল ইটের রেল ভবন, ওয়ার্কশপ, চালক-প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আর কর্মচারী আবাসন আজও বলে দেয় — এই শহরের প্রাণ স্টেশন। সেই সঙ্গে আছে এক বিস্ময়কর দাবির মসজিদ আর হারিয়ে যাওয়া এক আন্তঃসীমান্ত রেলপথ।

জংশনের ইতিহাস: ডুয়ার্স রেলওয়ে ও আসাম মেইল

উনিশ শতকের শেষ দিকে লালমনিরহাট গুরুত্বপূর্ণ রেলকেন্দ্র হয়ে ওঠে। ১৮৭৯ সালে পার্বতীপুর–কাউনিয়া মিটারগেজ লাইন চালু হয়; কাউনিয়া–ধরলা লাইন ১৯০১ সালে মিটারগেজে রূপ নেয় (উইকিপিডিয়া)। বেঙ্গল ডুয়ার্স রেলওয়ে (প্রতিষ্ঠা ১৮৯১) লালমনিরহাট হয়ে গীতলদহ দিয়ে আসামের সঙ্গে সংযোগ গড়ে তোলে, আর ব্রিটিশরা এখানে গড়ে তোলে লোকোমোটিভ চালকদের প্রশিক্ষণ বিদ্যালয়, ক্যারেজ-ইঞ্জিন মেরামতের ওয়ার্কশপ আর সারি সারি স্টাফ কোয়ার্টার (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ফিচার)। দেশভাগের আগে মর্যাদাপূর্ণ আসাম মেইল সান্তাহার থেকে গুয়াহাটি যেত এই লালমনিরহাট হয়েই (উইকিপিডিয়া)। লালমনিরহাট জংশন স্টেশন চালু হয় ১৯০০ সালে; শহরটি আজও বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি বিভাগীয় সদর দপ্তর। বর্তমান ট্রেনগুলোর মধ্যে আছে লালমনি এক্সপ্রেস ও ২০২৪ সালে চালু হওয়া বুড়িমারী এক্সপ্রেসের সংযোগ।

মোগলহাট: ধরলায় ভেঙে যাওয়া সীমান্ত লাইন

শহর থেকে মাত্র নয়-দশ কিলোমিটার দূরের মোগলহাট একসময় ছিল আসাম-বাংলা বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র — লালমনিরহাট–মোগলহাট অংশ চালু হয় ১৮৮২ সালে (ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস)। ভাগের পরও এখানে কাস্টমস-ইমিগ্রেশন চলত; ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে ভারত-পাকিস্তান রেল যোগাযোগ ছিন্ন হয় (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড)। ধরলা নদীর গীতলদহ রেলসেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সীমান্ত পেরোনো ট্রেন পুরোপুরি থেমে যায়, আর লালমনিরহাট–মোগলহাট স্থানীয় লাইনটি ১৯৯৬ সালের জুনে বন্ধ হয়ে যায় (ডেইলি স্টার)। ইমিগ্রেশন কার্যক্রম পরবর্তীতে বুড়িমারীতে সরে যায় (ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস)। আজ মোগলহাটে পরিত্যক্ত প্ল্যাটফর্ম, মাটিতে অর্ধেক ডুবে থাকা লাইন আর নদীর ওপারে ভাঙা সেতু — সীমান্ত-ইতিহাসে আগ্রহীদের জন্য নীরব এক জাদুঘর। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লাইনটি পুনরায় চালুর জরিপ ও আলোচনা হয়েছে (ডেইলি স্টার), তবে এখনো তা চালু হয়নি।

হারানো মসজিদ: দাবি বড়, প্রমাণ অপেক্ষমাণ

সদর উপজেলার পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের রামদাসে রয়েছে হারানো মসজিদ (নতুন নাম সাহাবায়ে কেরাম মসজিদ)। স্থানীয় বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৮৩–৮৪ সালে "মজদের আড়া" নামের জঙ্গল পরিষ্কার করার সময় প্রাচীন ইটের ধ্বংসাবশেষ মেলে; ১৯৮৬ সালে পাওয়া একটি খোদাই করা ইটে কালিমার সঙ্গে "হিজরি সন ৬৯" লেখা ছিল বলে জানা যায় — অর্থাৎ ৬৮৮–৬৯ খ্রিস্টাব্দ, যা থেকে এটিকে দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীনতম মসজিদ বলে দাবি করা হয় (বাংলা উইকিপিডিয়া; বাংলা ট্রিবিউন, অক্টোবর ২০২৬)। সৎ সতর্কতা: এই প্রাচীনত্বের দাবি এখনো প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে প্রমাণিত নয় — বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, দাবির সত্যতা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন। শিলালিপির ইটটি কোথায় সংরক্ষিত — এ নিয়েও বিবরণে ভিন্নতা আছে; একটি বিবরণে রংপুরের তাজহাট জাদুঘরের কথা বলা হয়েছে। দাবি যাই হোক, জায়গাটি ঘিরে মানুষের আগ্রহ ও ভক্তি বাস্তব — ভ্রমণে গেলে সেই সংবেদনশীলতাকে সম্মান করুন।

আরও যা আছে: বিমানঘাঁটি থেকে তিস্তা সেতু

শহরের উপকণ্ঠে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আমলের লালমনিরহাট বিমানবন্দর — ব্রিটিশ আমলে গড়া বিশাল রানওয়ের এই ঘাঁটিতে এখন কোনো বাণিজ্যিক উড়ান নেই; এলাকাটি বিমান বাহিনীর তত্ত্বাবধানে থাকায় সাধারণ দর্শনার্থীদের অবাধ প্রবেশ নেই (ভ্রমণ-তালিকাসমূহ)। শহরের ভেতরকার বেড়ানোয় আছে তিস্তা সড়ক সেতু সংলগ্ন পার্ক, শিশু পার্ক, ধরলা সেতু এলাকা আর কাকিনা-মহীপুর ঘাট (বাসস, মার্চ ২০২৬)। জেলা হিসেবে লালমনিরহাট গঠিত হয় ১৯৮৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। জেলার বাকি দুই আকর্ষণ — তিস্তা ব্যারেজ আর বুড়িমারী-তিনবিঘা — মিলিয়ে দুই দিনের সার্কিট সাজানোই এই শহরে আসার সেরা পরিকল্পনা।

ভ্রমণ তথ্য

যাওয়া: ঢাকা থেকে লালমনি এক্সপ্রেস ও বুড়িমারী এক্সপ্রেস (লালমনিরহাট পর্যন্ত) সরাসরি ট্রেনে আসা যায়; রংপুর থেকে সড়কে প্রায় দেড়-দুই ঘণ্টা। থাকা-খাওয়া: স্টেশন এলাকা ও শহরের কেন্দ্রে সাধারণ মানের হোটেল-রেস্তোরাঁ আছে। পরিকল্পনা: প্রথম দিন জংশন এলাকা, রেল ভবনসমূহ, হারানো মসজিদ ও মোগলহাট; দ্বিতীয় দিন তিস্তা ব্যারেজ অথবা বুড়িমারীর দিকে। মোগলহাট সীমান্ত এলাকা — বিজিবির নির্দেশনা মেনে চলুন, অনুমতি ছাড়া সীমান্তের দিকে এগোবেন না। রেল স্থাপনাগুলো সচল সরকারি এলাকা; ছবি তোলায় কর্তৃপক্ষের নিয়ম মেনে চলুন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

লালমনিরহাট জংশন কবে চালু হয়?

১৯০০ সালে (উইকিপিডিয়া); শহরটি আজ রেলওয়ের বিভাগীয় সদর দপ্তর।

আসাম মেইল কী ছিল?

দেশভাগ-পূর্ব বিখ্যাত ট্রেন, যা সান্তাহার থেকে লালমনিরহাট হয়ে গুয়াহাটি যেত (উইকিপিডিয়া)।

মোগলহাট লাইন কেন বন্ধ?

ধরলার সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ও ১৯৬৫-পরবর্তী সীমান্ত বাস্তবতায় আন্তঃসীমান্ত চলাচল থামে; স্থানীয় লাইনটি ১৯৯৬ সালে বন্ধ হয় (ডেইলি স্টার; ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস)।

হারানো মসজিদ কি সত্যিই ৬৯ হিজরির?

স্থানীয় দাবি ও পাওয়া শিলালিপির ভিত্তিতে এমনটাই বলা হয়, তবে দাবিটি প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে এখনো প্রমাণিত নয় — আরও গবেষণা প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে (বাংলা ট্রিবিউন)।

লালমনিরহাটে কয় দিন লাগবে?

শহর এক দিনে ঘোরা যায়; তিস্তা ব্যারেজ ও বুড়িমারী মিলিয়ে দুই দিন আদর্শ।

শেষকথা

লালমনিরহাট ভ্রমণ মানে শুধু জায়গা দেখা নয় — রেলের সোনালি যুগ, ভেঙে যাওয়া সীমান্ত আর অমীমাংসিত প্রাচীনত্বের দাবি, তিনটি সময়স্তর একসঙ্গে পড়া। উত্তরবঙ্গের ইতিহাস বুঝতে এই শহরটা তাই অপরিহার্য এক অধ্যায়।