লালমনিরহাট যদি রেলের বিভাগীয় শহর হয়, সৈয়দপুর তবে রেলের কারখানার শহর — পুরো শহরটাই গড়ে উঠেছে একটা ওয়ার্কশপকে কেন্দ্র করে। ১৮৭০ সাল থেকে চলা সেই কারখানার ধোঁয়া-শব্দ আজও শহরের দিন শুরু করে; আর সেই শহরেই দাঁড়িয়ে আছে চীনামাটির থালার টুকরোয় মোড়ানো এক অদ্ভুত সুন্দর মসজিদ।
কারখানা: ১৮৭০ সালের জন্ম
সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৭০ সালে, আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের আমলে — শুরুটা মিটারগেজ বাষ্পীয় ইঞ্জিন মেরামতের শেড হিসেবে, প্রায় ১১০ একর জমির ওপর (উইকিপিডিয়া; দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড)। ১৯৫৩ সালের মধ্যে এটি ব্রডগেজ-মিটারগেজ কোচ ও ওয়াগন মেরামতের পূর্ণাঙ্গ কারখানায় রূপ নেয়। আজ এটি বাংলাদেশের বৃহত্তম রেলওয়ে কারখানা — পাহাড়তলীর কারখানার পাশাপাশি দেশের দুটি প্রধান ওয়ার্কশপের একটি (উইকিপিডিয়া)। প্রায় ২৭টি উপ-কারখানায় কোচ-ওয়াগন মেরামতের পাশাপাশি তৈরি হয় প্রায় ১,২০০ ধরনের যন্ত্রাংশ (গ্রিন ওয়াচ বাংলাদেশ)। এর ভেতরেই ছিল প্রায় ১৮ একরজুড়ে সেতু কারখানা — একসময় উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ রেলওয়ে সেতু কারখানা, যা ২০১৪ সালে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড)। প্রতিবেশী লালমনিরহাট জংশনের সঙ্গে মিলিয়ে উত্তরবঙ্গের রেল-ঐতিহ্যের পুরো ছবিটা পাওয়া যায়।
সংকটের বাস্তবতা: মেশিন আছে, মানুষ নেই
এই কারখানার গল্পে গৌরবের পাশাপাশি বেদনাও সমান সত্য। সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মঞ্জুরিকৃত ২,৮৫৯ পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৭১৬ জন; ২০১৭ সালে ১৫৩ কোটি টাকায় আধুনিকায়ন করা যন্ত্রপাতির বড় অংশ জনবলের অভাবে অব্যবহৃত পড়ে আছে (গ্রিন ওয়াচ বাংলাদেশ)। একসময় এখানে দশ-বারো হাজারের বেশি শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করতেন (ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের হিসাব)। ভ্রমণকারীদের জন্য ব্যবহারিক তথ্য: কারখানাটি সচল শিল্প এলাকা — অনুমতি ছাড়া ভেতরে ঘোরা যায় না; শিক্ষা সফরের দলগুলো কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে পরিদর্শন করে। বাইরে থেকে বিশাল এলাকা, গেট ও পুরোনো ভবনগুলো দেখে শহরটা ঘোরাই সাধারণ দর্শনার্থীর জন্য বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা। কারখানা প্রাঙ্গণে ব্রিটিশ আমলের পুরোনো ন্যারোগেজ ইঞ্জিনের একটি ছোট সংগ্রহও রয়েছে বলে ভ্রমণ বিবরণে পাওয়া যায়।
চিনি মসজিদ: চীনা নয়, চীনামাটির
ইসলামবাগ এলাকার চিনি মসজিদ (চীনা মসজিদ বা গ্লাস মসজিদ নামেও পরিচিত) সৈয়দপুরের সবচেয়ে চমকপ্রদ স্থাপনা। ১৮৬৩ সালে হাজী বাকের আলী ও হাজী মুকু ছন-বাঁশের ছোট নামাজঘর হিসেবে এটি গড়েন; ১৯২০ সালে হাজী হাফিজ আবদুল করিমের উদ্যোগে প্রথম অংশ পাকা হয় (৪০ × ৩৯ ফুট), আর ১৯৬৫ সালে দ্বিতীয় অংশ সম্পন্ন হয় (বাংলা উইকিপিডিয়া)। নামের রহস্য চীন দেশে নয়: দেয়ালে বসানো হয়েছে চীনামাটির থালার ভাঙা টুকরো ও রঙিন কাঁচ — এই কৌশলের নামই "চিনি করা" বা "চিনি দানার কাজ"। কলকাতা থেকে আনা আড়াই শতাধিক মার্বেল পাথর ও প্রায় ২৫ মেট্রিক টন চীনামাটি-কাঁচের টুকরো লেগেছে সাজাতে (উইকিপিডিয়া; ঢাকা ট্রিবিউন); মো. মোখতুল ও নবী বক্সের নকশায় দেয়ালে ফুটেছে ফুলদানি, গোলাপ, চাঁদ-তারার নকশা। মসজিদে মিনার ২৭টি, যার পাঁচটি আজও অসম্পূর্ণ (উইকিপিডিয়া)। লোককথায় প্রধান মিস্ত্রি ছিলেন শঙ্কু নামের এক হিন্দু কারিগর — সম্প্রীতির সেই গল্পটাও এই স্থাপনার অংশ (ঢাকা ট্রিবিউন)। দুই তলা মসজিদে একসঙ্গে পাঁচ শতাধিক মুসল্লি নামাজ পড়তে পারেন।
শহরটা: উর্দুভাষী সৈয়দপুর
কারখানার টানেই বিহারসহ উপমহাদেশের নানা জায়গা থেকে এসে বসতি গড়েন দক্ষ কারিগরেরা — সৈয়দপুর হয়ে ওঠে উর্দুভাষী সম্প্রদায়ের শহর। ১৯৭১ সালের আগে শহরের জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশের বেশি ছিল উর্দুভাষী, আর শহরটি তখন ঢাকা-চট্টগ্রামের পর দেশের অন্যতম বড় শহর হিসেবে গণ্য হতো (বাংলা স্টোরিজ প্রকল্প)। আজও কিছু বিদ্যালয়ে উর্দু পড়ানো হয়, বাজারে দুই ভাষার শব্দ মিশে থাকে। অবশ্য শহরের ইতিহাসে ১৯৭১-এর কলঙ্কিত অধ্যায়ও আছে — মুক্তিযুদ্ধের সময় শহরের হিন্দু বাসিন্দাদের ওপর ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ঘটে; আজ শহরের কাছে বধ্যভূমি সেই স্মৃতি বহন করে। সৈয়দপুর বিমানবন্দর রংপুর বিভাগের একমাত্র সচল বিমানবন্দর — প্রকল্প শুরু ১৯৭১ সালে, পুরোপুরি চালু ১৯৭৯ সালে (গবেষণাপত্র, সিআরআইবি); ঢাকা থেকে ফ্লাইটে আসা যায়। জেলার প্রধান আকর্ষণ নীলসাগরের পথে এই শহরটাই সবচেয়ে সুবিধাজনক ঘাঁটি।
ভ্রমণ তথ্য
যাওয়া: ঢাকা থেকে বিমানে সৈয়দপুর বিমানবন্দর, অথবা ট্রেনে (ঢাকা, খুলনা ও রাজশাহীমুখী আন্তঃনগর ট্রেন থামে) ও বাসে সরাসরি শহরে আসা যায়; নীলফামারী সদর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার। দেখবেন: চিনি মসজিদ (নামাজের সময় বাইরে থেকে দেখুন, ভেতরে গেলে পোশাক ও শিষ্টাচার মানুন), কারখানার গেট ও বাইরের পুরোনো ভবনসমূহ, স্টেশন এলাকা। থাকা-খাওয়া: বিমানবন্দর রোড ও শহরের কেন্দ্রে নানা মানের হোটেল আছে; উর্দুভাষী সম্প্রদায়ের রেস্তোরাঁর খাবার এই শহরের বাড়তি স্বাদ। পরিকল্পনা: নীলসাগরসহ এক দিনে সৈয়দপুর ঘোরা যায়; কারখানা পরিদর্শন চাইলে আগেভাগে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
১৮৭০ সালে, আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের আমলে; এটি দেশের বৃহত্তম রেলওয়ে কারখানা (উইকিপিডিয়া)।
কারখানার ভেতরে ঘোরা যায় কি?
সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য নয় — সচল শিল্প এলাকা, অনুমতি প্রয়োজন; শিক্ষা সফরের দল অনুমতি নিয়ে পরিদর্শন করে।
চিনি মসজিদের নাম "চিনি" কেন?
চীন দেশের জন্য নয় — চীনামাটির থালা ও কাঁচের টুকরোর "চিনি করা" সজ্জার জন্য (উইকিপিডিয়া; ঢাকা ট্রিবিউন)।
মসজিদটি কবে তৈরি?
১৮৬৩ সালে ছন-বাঁশের নামাজঘর হিসেবে শুরু; পাকা অংশ ১৯২০ ও ১৯৬৫ সালে ধাপে ধাপে তৈরি (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
সৈয়দপুরে উর্দু কেন শোনা যায়?
কারখানাকে কেন্দ্র করে বিহার থেকে আসা কারিগরদের বসতির ঐতিহ্য; আজও সম্প্রদায়টি শহরের বড় অংশ (বাংলা স্টোরিজ)।
ঢাকা থেকে সৈয়দপুর কীভাবে যাব?
বিমানে সরাসরি, এছাড়া ট্রেন ও বাস আছে; বিমানবন্দরটি বিভাগের একমাত্র সচল বিমানবন্দর।
শেষকথা
সৈয়দপুরে ভ্রমণ মানে শিল্প-ঐতিহ্যের ভেতর দিয়ে হাঁটা — একদিকে ধুঁকতে থাকা এক মহাকারখানা, অন্যদিকে চীনামাটির ঝলমলে মসজিদ, মাঝখানে দুই ভাষার এক শহর। উত্তরবঙ্গের আধুনিক ইতিহাস বুঝতে এই শহরের বিকল্প কমই আছে।