• 30 Oct, 2026

খুলনার রূপসায় বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ রুহুল আমিনের সমাধি কমপ্লেক্স আর শহরের কাছে ময়ূর নদীর তীরে গল্লামারী বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ — ১০ ডিসেম্বর ১৯৭১-এর গল্প, সমাধি কমপ্লেক্সের বিবরণ, যাওয়ার উপায়সহ মুক্তিযুদ্ধ-স্মৃতি ভ্রমণ গাইড।

খুলনা সফরে সুন্দরবন আর নদীর আনন্দের পাশাপাশি আরেকটা অধ্যায় আছে — মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি। এই অধ্যায়ের দুটি ঠিকানা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে রূপসা নদীর দুই পাড়ে: পূর্ব পাড়ের বাগমারা গ্রামে ঘুমিয়ে আছেন সাত বীরশ্রেষ্ঠের একজন, মোহাম্মদ রুহুল আমিন; আর শহরের গা ঘেঁষে ময়ূর নদীর তীরে গল্লামারী — দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে বড় বধ্যভূমিগুলোর একটি। শহরের বাকি সব দর্শনীয় জায়গার পরিকল্পনা পাবেন আমাদের খুলনা শহর গাইডে — এই পোস্টে শুধু এই দুটি স্মৃতিস্থল।

১০ ডিসেম্বর ১৯৭১: পলাশের শেষ অভিযান

রুহুল আমিনের জন্ম ১৯৩৫ সালে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ির বাঘপাঁচড়া গ্রামে। তরুণ বয়সে পাকিস্তান নৌবাহিনীতে যোগ দিয়ে তিনি হন ইঞ্জিন রুম আর্টিফিসার — জাহাজের ইঞ্জিনের দায়িত্বে থাকা কারিগরি নাবিক। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হতেই চাকরি ছেড়ে যুদ্ধে যোগ দেন, পরে দায়িত্ব পান বাংলাদেশের নৌযুদ্ধের ছোট্ট কিন্তু দুঃসাহসী গানবোট বহরের 'পলাশ'-এ। বিজয়ের ঠিক ছয় দিন আগে, ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর — মংলা বন্দর শত্রুমুক্ত করে পলাশ তখন এগোচ্ছে খুলনার দিকে, লক্ষ্য পাকিস্তানি নৌঘাঁটি পিএনএস তিতুমীর। খুলনা শিপইয়ার্ডের কাছাকাছি পৌঁছাতেই বিপর্যয়: মিত্রবাহিনীর যুদ্ধবিমান ভুল শনাক্তে গানবোটটির উপর বোমা বর্ষণ করে। কমান্ডার সকলকে গানবোট ত্যাগের নির্দেশ দিলেও রুহুল আমিন ইঞ্জিনরুম ছাড়েননি — ডুবন্ত গানবোটকে সচল রাখার শেষ চেষ্টা চালিয়ে যান, যতক্ষণ না গোলা বিস্ফোরণে ইঞ্জিনরুম ধ্বংস হয়। আহত অবস্থায় প্রায় সোয়া কিলোমিটার সাঁতরে রূপসার তীরে ওঠেন তিনি; কিন্তু তীরে অপেক্ষমাণ রাজাকারদের হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন। এই আক্রমণেই শহীদ হন গানবোটের আরেক নাবিক মহিবুল্লাহ (বীর বিক্রম) — দুজনের গল্প এখানে একসূত্রে গাঁথা।

বাগমারায় সমাধি কমপ্লেক্স

শহীদ হওয়ার পর রুহুল আমিনের মরদেহ তিন দিন রূপসা নদীর তীরে পড়ে ছিল। শেষে স্থানীয় আব্দুল গাফফার ও গ্রামবাসীরা পূর্ব রূপসার বাগমারা গ্রামে মহিবুল্লাহসহ তাঁকে সমাহিত করেন — সেই জায়গাটিতেই আজকের সমাধি। ১৯৯৭ সালে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ) কবরস্থান ঘিরে একটি স্মৃতি কমপ্লেক্স নির্মাণ করে; বর্তমানে কমপ্লেক্সটির তত্ত্বাবধানে আছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। প্রাঙ্গণে দুই বীরের সমাধি, স্মৃতিস্তম্ভ আর খোলা সবুজ — নদীর কাছের শান্ত পরিবেশ জায়গাটিকে করে তুলেছে নামাজ-দোয়া আর নীরব শ্রদ্ধার স্থান। প্রতি বছর ১০ ডিসেম্বর শহীদ দিবসে নৌবাহিনীসহ বিভিন্ন সংগঠন এখানে পুষ্পস্তবক অর্পণ, আলোচনা ও দোয়ার আয়োজন করে — ওই দিনটিতে গেলে অনুষ্ঠানমুখর রূপটা দেখা যায়। খুলনা শহর থেকে খানজাহান আলী সেতু পেরিয়ে রূপসা ঘাট এলাকা দিয়ে বাগমারা পৌঁছানো যায় স্থানীয় পরিবহনে।

গল্লামারী: ময়ূর নদীর তীরে বধ্যভূমি

শহর থেকে মাত্র তিন কিলোমিটারের মতো দূরে, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি ময়ূর নদীর তীরে গল্লামারী (বটিয়াঘাটা উপজেলার কৃষ্ণনগর এলাকা)। মুক্তিযুদ্ধের সময় এখানকার তৎকালীন রেডিও স্টেশন ভবনটিকে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা বানিয়েছিল নির্যাতন আর হত্যার কেন্দ্র। একটি মর্মান্তিক প্রেক্ষাপট এই বধ্যভূমির সঙ্গে জড়িত: যুদ্ধের সময় দক্ষিণের জেলাগুলো থেকে ভারতে আশ্রয় নিতে যাওয়া মানুষেরা খুলনা-রূপসা পথ ব্যবহার করতেন; দোসররা 'সহজ ও নিরাপদ পথ' দেখানোর ফাঁদে ফেলে তাদের গল্লামারীর ক্যাম্পে আটকে রেখে হত্যা করত। সরকারি জেলা পোর্টালের বিবরণ অনুযায়ী ধারণা করা হয় এখানে প্রায় পনেরো হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল; খুলনা মুক্ত হওয়ার পর গল্লামারী খাল ও আশপাশ থেকে প্রায় পাঁচ ট্রাক মানুষের খুলি ও হাড় উদ্ধার হয়। ১৯৯৫ সালে এখানে প্রথম স্মৃতিস্তম্ভ ওঠে; পরে খুলনা জেলা পরিষদের উদ্যোগে নির্মিত বর্তমান স্মৃতিসৌধটির উদ্বোধন হয় ২০১১ সালের ডিসেম্বরে। একটি বাস্তব কথা জানিয়ে রাখা ভালো — মূল পরিকল্পনার সব কাজ (সীমানা প্রাচীর, জাদুঘর ইত্যাদি) আজও সম্পূর্ণ হয়নি বলে স্থানীয় পত্রিকায় বারবার আক্ষেপ এসেছে; তবু জায়গাটি তার নৈঃশব্দ্য দিয়েই দর্শনার্থীর মনে গভীর দাগ কাটে। মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভিক পরিকল্পনার ইতিহাসে আগ্রহ থাকলে আমাদের তেলিয়াপাড়া গাইডটিও পড়ুন — ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল সেখানে হয়েছিল যুদ্ধের প্রথম কৌশলগত বৈঠক।

কখন যাবেন, কীভাবে ঘুরবেন

দুটি স্থানই খোলা জায়গা — সকাল থেকে সন্ধ্যার আলো থাকতেই যাওয়া ভালো। সহজ সূচি: সকালে সেতু পেরিয়ে বাগমারার সমাধি কমপ্লেক্স, দুপুরে শহরে ফিরে শেষ বিকেলে গল্লামারী। ১০ ডিসেম্বর (রুহুল আমিনের শহীদ দিবস), ১৬ ডিসেম্বর ও ২৬ মার্চের দিকে দুই জায়গাতেই কর্মসূচি আর লোকসমাগম বেশি থাকে। ডিসেম্বর মাসটা খুলনার মুক্তিযুদ্ধ-স্মৃতির জন্য বিশেষ তাৎপর্যময় — কারণ জাতীয় বিজয়ের পরদিন, ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ খুলনা শহর শত্রুমুক্ত হয়; আর তার ঠিক এক সপ্তাহ আগেই রূপসার তীরে শহীদ হয়েছিলেন রুহুল আমিন, মুক্ত খুলনা যিনি দেখে যেতে পারেননি। বছরের অন্য সময়ে শীতের মাসগুলোতে (নভেম্বর–ফেব্রুয়ারি) নদীপাড়ের আবহাওয়া সবচেয়ে মনোরম থাকে বলে এই স্মৃতি-ভ্রমণটাও তখনই সবচেয়ে স্বস্তিদায়ক হয়; বর্ষায় বাগমারার পথ কাদামাখা হয়ে উঠতে পারে। সমাধি প্রাঙ্গণে ঢোকার আগে পোশাক-আচরণে শালীনতা ও নীরবতা বজায় রাখুন, কবরে উঠে ছবি তোলা থেকে বিরত থাকুন, আর বধ্যভূমিতে গিয়ে জায়গাটির গাম্ভীর্য মনে রাখুন — এগুলো পিকনিক স্পট নয়, স্মৃতির স্থান।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

রুহুল আমিনের সমাধি কোথায়?

খুলনার পূর্ব রূপসার বাগমারা গ্রামে, রূপসা নদীর তীরে — একই প্রাঙ্গণে বীর বিক্রম মহিবুল্লাহর সমাধিও আছে। কমপ্লেক্সটি তত্ত্বাবধান করে বাংলাদেশ নৌবাহিনী।

রুহুল আমিন কোন সেক্টরে/নৌযানে যুদ্ধ করেছিলেন?

তিনি গানবোট 'পলাশ'-এর ইঞ্জিন রুম আর্টিফিসার ছিলেন। ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর মংলা মুক্ত করে খুলনা অভিমুখে যাত্রাপথে বিমান হামলায় গানবোট ডুবে গেলে সাঁতরে তীরে উঠে রাজাকারদের হাতে শহীদ হন।

গল্লামারী বধ্যভূমি শহর থেকে কত দূরে?

প্রায় তিন কিলোমিটার — খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ও ময়ূর নদীর কাছাকাছি, বটিয়াঘাটা উপজেলার কৃষ্ণনগর এলাকায়। রিকশা বা ইজিবাইকে সহজে যাওয়া যায়।

দুটি স্থানে প্রবেশমূল্য লাগে কি?

দুটিই উন্মুক্ত স্মৃতিস্থল — সাধারণত কোনো প্রবেশমূল্য নেই। বিশেষ দিবসের কর্মসূচির সময় ভিড় এড়াতে সকাল সকাল যান।

শেষকথা

সুন্দরবনের নীল জল আর খুলনার নদীপাড়ের সন্ধ্যা যেমন সত্য, তেমনি সত্য এই দুটি প্রাঙ্গণের নীরবতা। রূপসার তীরে এক মিনিট দাঁড়িয়ে থাকলেই বোঝা যায়, এই শহর তার স্বাধীনতা কত রক্তের বিনিময়ে কিনেছে। খুলনা সফরের সূচিতে এই দুটি স্থান রাখুন — ভ্রমণটা শুধু দেখা নয়, স্মরণও হোক।