দেশের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন ও সবুজ শহরগুলোর একটা, আবার প্রাচীনতম জাদুঘরের শহর — রাজশাহী দুটোই একসঙ্গে। পদ্মার পাড়ে দাঁড়ানো এই বিভাগীয় শহরের পরিচয় "শিক্ষানগরী" ও "সিল্ক সিটি"; দক্ষিণের রাজবাড়ী শহরের মতো এখানেও পদ্মাই জীবনের কেন্দ্র, তবে ঢঙে অনেক বেশি সাজানো-গোছানো।
বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর: ১৯১০ সালের সংগ্রহশালা
শহরের হেতেম খাঁ এলাকায় বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর — প্রতিষ্ঠা ১৯১০ সালে, বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতির উদ্যোগে। প্রতিষ্ঠাতাদের তিনজন: নাটোরের দিঘাপতিয়ার জমিদার শরৎ কুমার রায়, আইনজীবী-ঐতিহাসিক অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় ও শিক্ষক রামাপ্রসাদ চন্দ (শিক্ষক বাতায়ন)। মূল ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন বাংলার গভর্নর লর্ড কারমাইকেল (১৯১৬); ভবনটির গড়নে গৌড়ের স্থাপত্যশৈলীর ছাপ (প্রথম আলো)। এটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন সংগ্রহশালা — পাল-সেন যুগের ভাস্কর্য, শিলালিপি, মুদ্রা ও পাণ্ডুলিপির সংগ্রহে সমৃদ্ধ; পরবর্তীতে (১৯৬৪) এটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আসে। রাজধানীর জাতীয় জাদুঘরের পর প্রাচীন বাংলার ইতিহাস বুঝতে এটাই সেরা ঠিকানা।
বড়কুঠি ও রেশমের যুগ
পদ্মার পাড়ে বড়কুঠি — ওলন্দাজদের রেশম কারখানার ভবন। রেশম বাণিজ্যের টানে ওলন্দাজ, ফরাসি ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এখানে কুঠি গড়েছিল (শিক্ষক বাতায়ন)। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের সময় বড়কুঠি ছিল ইউরোপীয় স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সদর দফতর; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর (১৯৫৩) এটি হয় উপাচার্যের বাসভবন ও কার্যালয়। জেলা সদর নাটোর থেকে রাজশাহীতে স্থানান্তরিত হয় ১৮২৫ সালে; পৌরসভা ১৮৭৬, সিটি কর্পোরেশন ১৯৯১ সালে (শিক্ষক বাতায়ন)। শহরে ঢোকার পথে নওদাপাড়া চৌরাস্তায় ঝুড়িভর্তি আমের ভাস্কর্য জানিয়ে দেয় — আমের রাজধানীতে এসে পড়েছেন।
পদ্মার পাড় ও শহরের বাকি রূপ
রাজশাহীর প্রাণ পদ্মা নদীর পাড় — বিকেলে সূর্যাস্ত দেখতে ভিড় জমে পাড়জুড়ে, চলে ছোট নৌকার ঘোরাঘুরি। পাড়ের কাছে রাজশাহী কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা — ব্রিটিশ আমলের রেসকোর্স ময়দানে গড়া প্রায় ৩৩ একর সবুজ (ভ্রমণট্রিপস)। রাজপাড়ায় দেশের দ্বিতীয় নভোথিয়েটার (ভ্রমণট্রিপস)। "শিক্ষানগরী" নামের ভিত্তি — রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৫৩), রাজশাহী কলেজ ও মেডিকেল কলেজের সবুজ ক্যাম্পাস-পরিবেশ। শহরের নামের সঙ্গে জড়িয়ে সুফি সাধক শাহ মখদুম রূপোস — বিমানবন্দরটি তাঁরই নামে। প্রাচীন জনপদ হিসেবে এই অঞ্চল একসময় পুন্ড্রবর্ধনের অংশ ছিল (ভ্রমণপিয়)।
যাতায়াত ও টিপস
ঢাকা থেকে বাস, ট্রেন ও আকাশপথ — তিনভাবেই রাজশাহী পৌঁছানো যায়; শহরের ভেতরে রিকশা-ইজিবাইক সহজলভ্য। জাদুঘর দেখতে সকালের দিকটা বেছে নিন (সাপ্তাহিক ছুটির দিন আগেই জেনে নিন), বিকেলটা রাখুন পদ্মার পাড়ের জন্য। আমের মৌসুমে (মে–জুন) শহরে ভিড় বাড়ে — তখনই আবার আম-লিচুর আসল স্বাদ।
একদিনে রাজশাহী
সকালে শুরু করুন বরেন্দ্র জাদুঘর দিয়ে — ভিড় কম থাকতে থাকতে গ্যালারিগুলো ধীরে দেখা যায়। দুপুরে বড়কুঠি ও দরগাপাড়া-ঘোড়ামারা এলাকা ঘুরে সাহেববাজারে খাওয়া-দাওয়া। বিকেলের দিকে কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা, সেখান থেকে সোজা পদ্মার পাড় — সূর্যাস্ত এই শহরের দিনের সেরা মুহূর্ত। সময় হাতে থাকলে পরদিনের জন্য রেখে দিন পুঠিয়া কিংবা বাঘা — দুটোই দিনভ্রমণের দূরত্বে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বরেন্দ্র জাদুঘর কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
১৯১০ সালে, বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতির উদ্যোগে (শিক্ষক বাতায়ন)।
জাদুঘরটি কে কে প্রতিষ্ঠা করেন?
শরৎ কুমার রায়, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় ও রামাপ্রসাদ চন্দ (শিক্ষক বাতায়ন)।
রাজশাহীর ডাকনাম কী কী?
শিক্ষানগরী, সিল্ক সিটি ও আমের রাজধানী (ভ্রমণপিয়)।
বড়কুঠি কী?
ওলন্দাজদের ঐতিহাসিক রেশম কারখানার ভবন, পদ্মার পাড়ে (শিক্ষক বাতায়ন)।
ঢাকা থেকে কীভাবে যাবেন?
বাস, ট্রেন ও বিমান — তিন পথই চালু আছে।
শেষকথা
রাজশাহী ভ্রমণ মানে ভিড়-তাড়া নয় — ধীরে হাঁটা, জাদুঘরে সময় দেওয়া, আর পদ্মার পাড়ে সূর্য ডুবতে দেখা। উত্তরবঙ্গের অভিযান শুরু করার এর চেয়ে ভালো ভিত্তি আর হয় না।