ইছামতি নদীর পাড়ের জেলা শহর পাবনার পরিচয় তিনটি প্রতিষ্ঠানে গভীরভাবে বোনা: হেমায়েতপুরের সৎসঙ্গ আশ্রম, শতাব্দীপ্রাচীন এডওয়ার্ড কলেজ, আর দেশের একমাত্র বিশেষায়িত মানসিক হাসপাতাল। কাকতালীয়ভাবে শেষ দুটির গল্পও প্রথমটির সঙ্গে জড়িয়ে — হাসপাতালটি দাঁড়িয়ে আছে যে জমিতে, তার সিংহভাগ একসময় ছিল আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতারই। পাবনা ভ্রমণে এই ত্রিভুজটাই শহরের আসল মানচিত্র।
হেমায়েতপুর: ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আশ্রম
শহর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পশ্চিমে, পদ্মা নদীর তীরে হেমায়েতপুর গ্রাম (যুগান্তর)। এখানেই ১৮৮৮ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর জন্ম শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের (বাংলাপিডিয়া)। পাবনা ইনস্টিটিউশনে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে কলকাতার ন্যাশনাল মেডিক্যাল স্কুল থেকে হোমিওপ্যাথিতে ডিগ্রি নিয়ে নিজ গ্রামে চিকিৎসা শুরু করেন তিনি (বাংলাপিডিয়া) — আজীবন মাতৃভক্ত এই মানুষটির মুখের বাণী সংগৃহীত হয়ে প্রকাশিত হয় "পুণ্যপুঁথি" নামে (বাংলাপিডিয়া)। জন্মভূমিতেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন সৎসঙ্গ আশ্রম — যেখানে তিনি ৫৮ বছর কাটান (বাংলাপিডিয়া)। সৎসঙ্গের চার আদর্শ: শিক্ষা, কৃষি, শিল্প ও সুবিবাহ; আশ্রমকেন্দ্রিক গড়ে ওঠে তপোবন বিদ্যালয়, দাতব্য চিকিৎসালয়, ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ, ছাপাখানা-প্রকাশনা, বিশ্ব বিজ্ঞান কেন্দ্র, কৃষি খামারসহ বহু প্রতিষ্ঠান (বাংলাপিডিয়া)। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, মহাত্মা গান্ধী, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও এ কে ফজলুল হক আশ্রম পরিদর্শন করে এর কাজের প্রশংসা করেছিলেন (বাংলাপিডিয়া)। ১৯৪৬ সালে তিনি বিহারের দেওঘরে (বর্তমান ঝাড়খণ্ড) গিয়ে সেখানে নতুন আশ্রম গড়েন; দেশভাগের পর আর ফেরেননি, ১৯৬৯ সালের জানুয়ারিতে সেখানেই প্রয়াণ ঘটে (বাংলাপিডিয়া)। সৎভাবে বলতে হয় — হেমায়েতপুরের মূল প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেক কিছুরই অস্তিত্ব আজ আর নেই (যুগান্তর); তবে আশ্রম আজও সক্রিয় তীর্থ: দোল পূর্ণিমা, তালনবমী ও আবির্ভাব তিথিতে বিশ্বের নানা প্রান্তের ভক্তের সমাগম ঘটে, সঙ্গে পদ্মায় পুণ্যস্নান মহোৎসব (যুগান্তর)। আশ্রমভিত্তিক সমাজগঠনের এমন নিদর্শন বাংলাদেশে আরও আছে — নোয়াখালীর গান্ধী আশ্রম জয়াগ তার অন্যতম।
মানসিক হাসপাতাল: একই মাটির দ্বিতীয় অধ্যায়
স্বাধীনতার আগে এ অঞ্চলের মানসিক রোগীদের চিকিৎসার জন্য যেতে হতো রাঁচিতে; দেশভাগের পর ১৯৫৭ সালে পাবনার সিভিল সার্জন মোহাম্মদ হোসেন গাঙ্গুলীর উদ্যোগে শহরের শীতলাই জমিদারবাড়িতে শুরু হয় দেশের প্রথম ও একমাত্র বিশেষায়িত মানসিক হাসপাতাল (প্রথম আলো/বাংলাপিডিয়া)। ১৯৫৯ সালে হাসপাতালটি স্থানান্তরিত হয় হেমায়েতপুরের প্রায় ১১২ একর জমির বিশাল চত্বরে (যুগান্তর) — আরটিভির প্রতিবেদন বলছে, অধিগ্রহণকৃত এই জমির সিংহভাগই ছিল ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের; অধিগ্রহণের সময় তিনি ভারতে ছিলেন। শুরুতে ৬০ শয্যা থেকে হাসপাতালটি পৌঁছায় ৫০০ শয্যায় (বণিক বার্তা)। সমালোচনাও দীর্ঘদিনের: জরাজীর্ণ ভবন ও সেবার ঘাটতি নিয়ে প্রথম আলোসহ গণমাধ্যমে নিয়মিত লেখা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বড় খবর — একনেকে পাশ হওয়া প্রায় ১,৩৬৫ কোটি টাকার প্রকল্পে হাসপাতালটিকে আন্তর্জাতিক মানের মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে রূপান্তর ও শয্যা এক হাজারে উন্নীত করার পরিকল্পনা চলছে (যুগান্তর/বণিক বার্তা)। হাসপাতালটি চিকিৎসাকেন্দ্র হলেও এর সবুজ বিশাল চত্বর পাবনার একটি পরিচিত ল্যান্ডমার্ক — ভেতরে রোগীদের এলাকায় প্রবেশ অবশ্যই অনুমতিসাপেক্ষ।
এডওয়ার্ড কলেজ: ১৮৯৮ থেকে
শহরের শিক্ষা-ঐতিহ্যের কেন্দ্র সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ। বিদ্যানুরাগী গোপাল চন্দ্র লাহিড়ী ১৮৯৪ সালে পাবনা ইনস্টিটিউশন প্রতিষ্ঠা করেন; ১৮৯৮ সালের জুলাইয়ে তারই একটি কক্ষে মাত্র ২৬ জন শিক্ষার্থী নিয়ে কলেজের যাত্রা শুরু (যুগান্তর)। ১৯০৬ সালে "পাবনা কলেজ" নামে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তি; ১৯১১ সালে সপ্তম এডওয়ার্ডের নামে নাম হয় এডওয়ার্ড কলেজ (যুগান্তর)। ১৯১২ সালে গভর্নর লর্ড কারমাইকেলের সফরে তাড়াশের জমিদার রায় বাহাদুর বনমালী রায় কলেজের উন্নয়নে পঞ্চাশ হাজার টাকা অনুদান ঘোষণা করেন (যুগান্তর)। আজ কলেজটিতে শিক্ষার্থী প্রায় চব্বিশ হাজার (যুগান্তর) — ছায়াঘেরা বিশাল ক্যাম্পাসটি শহরের সবচেয়ে সুন্দর খোলা জায়গাগুলোর একটি।
আরও যা আছে শহরে
বাংলাপিডিয়ার পাবনা সদরের প্রত্নতালিকায় আছে রাঘবপুরের জোড়বাংলা মন্দির (অষ্টাদশ শতাব্দী), তিন গম্বুজবিশিষ্ট ভারারা মসজিদ (১১৭৬ হিজরি) আর জমিদার আমলের তাড়াশ ভবন (বনমালী রায়ের কাছারি) ও শিতলাই ভবন — শহরে হাঁটতে হাঁটতে জমিদারি যুগের এই টুকরোগুলো মিলিয়ে নেওয়া যায়। মানিকগঞ্জের বালিয়াটি প্রাসাদের মতোই এগুলো জমিদার-স্থাপত্যের ধারাবাহিকতার সাক্ষী। শহর শেষ করে দিনটি সারতে ইছামতির পাড়ের বিকেল ভালো সঙ্গী।
ভ্রমণ তথ্য
ঢাকা থেকে বাসে পাবনা (ঈশ্বরদী হয়ে ট্রেনেও আসা যায়); শহর থেকে রিকশা-অটোতে হেমায়েতপুর প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। আশ্রমে উৎসবের দিনগুলোতে ভিড় বেশি; শান্ত দর্শনের জন্য সাধারণ দিন বেছে নিন এবং আশ্রমের নিয়ম মেনে চলুন। মানসিক হাসপাতাল এলাকা সংরক্ষিত চিকিৎসা-চত্বর — পর্যটক হিসেবে ভেতরে ঘোরার প্রত্যাশা রাখবেন না।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের জন্ম কবে ও কোথায়?
১৮৮৮ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর, পাবনার হেমায়েতপুরে (বাংলাপিডিয়া)।
সৎসঙ্গের চার আদর্শ কী?
শিক্ষা, কৃষি, শিল্প ও সুবিবাহ (বাংলাপিডিয়া)।
মানসিক হাসপাতাল কবে প্রতিষ্ঠিত?
১৯৫৭ সালে শীতলাই জমিদারবাড়িতে; ১৯৫৯-এ হেমায়েতপুরে স্থানান্তর (প্রথম আলো/যুগান্তর)।
এডওয়ার্ড কলেজ কবে শুরু হয়?
১৮৯৮ সালে পাবনা ইনস্টিটিউশনের একটি কক্ষে; নামকরণ এডওয়ার্ড কলেজ ১৯১১ সালে (যুগান্তর)।
আশ্রমে বড় উৎসব কখন?
দোল পূর্ণিমা, তালনবমী ও আবির্ভাব তিথিতে (যুগান্তর)।
শেষকথা
পাবনা শহরের গল্প মানুষ গড়ার গল্প: এক সাধকের বিদ্যালয়-হাসপাতাল-খামারের স্বপ্ন, এক সিভিল সার্জনের মানসিক হাসপাতালের উদ্যোগ, আর এক শিক্ষানুরাগীর কলেজ। এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের ত্রিভুজে দাঁড়ালে বোঝা যায়, কেন পাবনাকে শুধু জেলা শহর বললে কম বলা হয়।