• 30 Oct, 2026

লকমা রাজবাড়ি ও আছরাঙ্গা দীঘি ভ্রমণ গাইড — পাঁচবিবির সীমান্তে হাদী মামুন চৌধুরীর ধ্বংসপ্রায় জমিদার বাড়ির কিংবদন্তি, আর ক্ষেতলালে মৌন ভট্টের খনন করা হাজার বছরের দীঘির ইতিহাস, ১৯৯২-এর মূর্তি-আবিষ্কার ও ভ্রমণ তথ্য।

জয়পুরহাট জেলার দুই প্রান্তে দুই আমলের দুই সাক্ষী: পাঁচবিবির ভারত-সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাকা লকমা রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ, আর ক্ষেতলালের আছরাঙ্গা দীঘি — যার বয়স হাজার বছরের বেশি। একদিনের জেলা-সফরে দুটোই দেখা যায়; এই পোস্টে দুটোর গল্পই আছে, যার যেটুকু যাচাই করা গেছে ঠিক ততটুকুই।

লকমা: সীমান্ত ছুঁয়ে থাকা জমিদারি

পাঁচবিবি উপজেলার কড়িয়া গ্রামে, কড়িয়া বাজারের পশ্চিমে, একেবারে ভারত সীমান্তে লকমা জমিদার বাড়ি — স্থানীয়দের কাছে চৌধুরী বাড়ি (বাংলা উইকিপিডিয়া)। প্রতিষ্ঠাতা জমিদার হাদী মামুন চৌধুরী (বাংলা উইকিপিডিয়া/টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া)। জমিদাররা ছিলেন মুসলিম; তাঁদের জমিদারির মূল অংশ ছিল আজকের ভারতের ভেতরে — জামালপুর, মথুরাপুর, গয়েশপুরসহ বহু এলাকা এখন সীমান্তের ওপারে, বাংলাদেশে রয়ে গেছে শুধু পাঁচবিবির অংশটুকু (বাংলা উইকিপিডিয়া)। বয়স নিয়ে সূত্রে বড় মতভেদ আছে — লোকবিশ্বাসে আড়াইশো-তিনশো বছর (টেলিগ্রাফ), কোনো বর্ণনায় পাঁচশো বছর (টিবিএস); কোনো শিলালিপি বা নিশ্চিত তারিখ পাওয়া যায়নি, তাই নির্দিষ্ট সাল এই পোস্টে দেওয়া হলো না।

অভিশাপের কিংবদন্তি ও আজকের ধ্বংসস্তূপ

প্রচলিত কাহিনি: জমিদাররা প্রজাদের ওপর অত্যাচারী ছিলেন; একসময় "গায়েবি" নির্দেশে তাঁদের বাড়ি ছাড়তে বলা হয়, তাঁরা ছেড়ে যান — আর জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির অনেক আগেই এই জমিদারির অবসান ঘটে (বাংলা উইকিপিডিয়া — কথিত আছে)। কাঠামোর যা জানা যায়: তিন একর জায়গায় দুই ভাগে গড়া বাড়ি; মূল প্রাসাদ ছিল তিনতলা, যার নিচতলা এখন মাটির নিচে চাপা — দেখা যায় দুই তলা; কক্ষ ছিল ২৫–৩০টি; সঙ্গে হাতিশালা, ঘোড়াশালা, কাছারিঘর (বাংলা উইকিপিডিয়া); টেলিগ্রাফের বর্ণনায় প্রাসাদটি ইংরেজি U-আকৃতির। বড় পুকুর আর মন্দিরটি পড়েছে সীমান্তের ওপারে (লোনলি ট্রাভেলার ব্লগ)। আজ বাড়িটি প্রায় ধ্বংসস্তূপ — ছাদ ভেঙে পড়েছে, লতাপাতায় ঢাকা (সব সূত্র)। বর্তমানে লকমা চৌধুরীর বংশধর ও স্থানীয়দের ৪২ সদস্যের একটি সমিতি এটির দেখাশোনা করে (পর্যটন বিচিত্রা); টিবিএসের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনেও এর রহস্যময় ধ্বংস নিয়ে আলোচনা হয়েছে। শেষ প্রায় ২ কিলোমিটার রাস্তা যানবাহনের অযোগ্য — হেঁটে যেতে হয় (টেলিগ্রাফ) — হাতে সময় রেখে যাবেন। তুলনায় বলিহার রাজবাড়ির অবস্থা যেমন, লকমা তার চেয়েও বেশি ধ্বংসপ্রাপ্ত; তবু সীমান্ত-ঘেঁষা এই নির্জন ধ্বংসপ্রাসাদের নিজস্ব একটা টান আছে।

আছরাঙ্গা দীঘি: বারোশো বছরের জলাধার

এবার জেলার অন্য প্রান্তে — ক্ষেতলাল উপজেলার মামুদপুর ইউনিয়নে, তুলসীগঙ্গা নদীর পাড়ে আছরাঙ্গা দীঘি (বাংলা উইকিপিডিয়া)। লক্ষ্য করুন: দীঘিটি পাঁচবিবিতে নয়, ক্ষেতলালে — অনেক তালিকায় এই ভুলটা হয়। লিপিবদ্ধ ইতিহাস নেই; স্থানীয় বর্ণনায় তাহিরপুরের আদি রাজবংশের পূর্বপুরুষ ভট্টনারায়ণের ত্রয়োদশ বংশধর মৌন ভট্ট নবম শতকে (আনুমানিক ৮১৭ খ্রিস্টাব্দে) কম বৃষ্টিতে শুকিয়ে যাওয়া চাষের জমিতে সেচের জন্য দীঘিটি খনন করেন (বাংলা উইকিপিডিয়া/ভ্রমণগাইড)। আয়তন ২৫.৫০ একর, দৈর্ঘ্য প্রায় ১,১০০ ফুট ও প্রস্থ ১,০৭০ ফুট (বাংলা উইকিপিডিয়া)। জনশ্রুতি আছে, অগ্রহায়ণে আমন ধান পেকে ক্ষেত লাল হয়ে যেত বলেই এলাকার নাম ক্ষেতলাল (বাংলা উইকিপিডিয়া)। দীঘির পানি কাকের চোখের মতো স্বচ্ছ ও সুস্বাদু বলে প্রাচীনকালে তা ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হতো বলেও জনশ্রুতি (ভ্রমণগাইড)।

১৯৯২-এর পুনঃখনন ও আজকের আছরাঙ্গা

১৯৯২ সালে দীঘিটি পুনঃখনন করা হয়; খননের সময় পাওয়া যায় প্রায় ১২টি প্রাচীন মূর্তি, যেগুলো এখন দেশের বিভিন্ন জাদুঘরে সংরক্ষিত; তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া নিজে এটিকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে উদ্বোধন করেন (বাংলা উইকিপিডিয়া)। চারপাশে চারটি বাঁধানো ঘাট, পাড়ে গাছের সারি, শীতে অতিতি পাখির কোলাহল (বাংলা উইকিপিডিয়া/ভ্রমণগাইড)। একেবারে হালের খবর: জেলা পরিষদের উদ্যোগে ২০২৬ সালের অক্টোবরে দীঘিতে ওয়াকওয়ে নির্মাণকাজের উদ্বোধন হয়েছে — প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ২৫ লাখ টাকা (জনতার দেশকণ্ঠ)। পাহাড়পুরের সঙ্গে একই বরেন্দ্র অঞ্চলের ভ্রমণে এই প্রাচীন জলাধারটি সুন্দর বিপরীত-মাত্রা যোগ করে: বিহারের পাশে সেচের সভ্যতা।

ভ্রমণ তথ্য

জয়পুরহাট শহর থেকে আছরাঙ্গা প্রায় ৯ কিলোমিটার (ভ্রমণপ্রিয়); লকমা পাঁচবিবি হয়ে কড়িয়া বাজার — শেষ ২ কিমি হাঁটা (টেলিগ্রাফ)। একদিনের সার্কিট: শহর থেকে সকালে আছরাঙ্গা, দুপুরে পাঁচবিবি হয়ে বিকেলে লকমা (আলো থাকতে ফিরুন — সীমান্ত এলাকায় সন্ধ্যার পর ঘোরাঘুরি নয়)। লকমা ব্যক্তিমালিকানাধীন/সমিতি-তত্ত্বাবধানাধীন জায়গা — অনুমতি ও স্থানীয় নির্দেশনা মেনে চলুন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

লকমা রাজবাড়ি আসলে কার?

জমিদার হাদী মামুন চৌধুরীর — স্থানীয় নাম চৌধুরী বাড়ি (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

বাড়িটির বয়স কত?

সূত্রে ২৫০ থেকে ৫০০ বছর পর্যন্ত মতভেদ; নিশ্চিত তারিখ নেই (টেলিগ্রাফ/টিবিএস)।

আছরাঙ্গা দীঘি কোন উপজেলায়?

ক্ষেতলাল উপজেলায়, মামুদপুর ইউনিয়নে (বাংলা উইকিপিডিয়া) — পাঁচবিবিতে নয়।

দীঘি খনন করেন কে?

স্থানীয় বর্ণনায় নবম শতকে মৌন ভট্ট, সেচের জন্য (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

১৯৯২ সালে কী পাওয়া যায়?

পুনঃখননে প্রায় ১২টি প্রাচীন মূর্তি, এখন বিভিন্ন জাদুঘরে (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

শেষকথা

লকমায় সময় থেমে আছে অভিশাপের গল্পে, আছরাঙ্গায় বারোশো বছর ধরে বয়ে চলেছে সেচের পানি। জয়পুরহাট ছোট জেলা হলেও তার দুই প্রান্তের এই দুই সাক্ষী বলে দেয় — বরেন্দ্রর ইতিহাস শুধু বড় নগরীতে নয়, সীমান্তের ধ্বংসপ্রাসাদ আর গ্রামের দীঘিতেও লেখা আছে।