বগুড়ার প্রত্ন-মানচিত্রে মহাস্থানগড়ের ছায়ায় আরও দুটি ঠিকানা আছে, যেগুলো ছাড়া জেলার গল্প অসম্পূর্ণ: দুর্গনগরী থেকে মাত্র ৬ কিলোমিটার পশ্চিমে ভাসু বিহার — হিউয়েন সাংয়ের বর্ণনার সঙ্গে মেলানো এক বৌদ্ধ মহাবিহার-সমষ্টি, আর শেরপুরের খেরুয়া মসজিদ — যার গায়ে লেখা তারিখটাই তাকে করে তুলেছে এই অঞ্চলের বিরল দলিল।
ভাসু বিহার: নরপতির ধাপের দুই মহাবিহার
শিবগঞ্জের বিহার গ্রামে, নাগর নদীর প্রায় ৫০০ মিটার পশ্চিমে পাঁচটি টিলার এই ক্ষেত্রটি স্থানীয়ভাবে নরপতির ধাপ নামে পরিচিত (তিব্বতি বৌদ্ধ বিশ্বকোষ)। খনন হয়েছে তিনটি টিলায়; বেরিয়ে এসেছে দুটি আয়তাকার মহাবিহার ও একটি অর্ধ-ক্রুশাকার মন্দির — গুপ্ত-পরবর্তী/প্রাক-পাল যুগের ভিত্তি, ওপরের স্তরে দশম–একাদশ শতকের কাঠামো (অ্যান্টিকুইটি জার্নাল)। বড় মহাবিহারটির বিস্তার প্রায় ১৪৮ × ১৩৯ মিটার, চত্বরের চারদিকে সারি সারি ভিক্ষুকক্ষ (তিব্বতি বিশ্বকোষ); ছোটটি প্রায় ৪৯ × ৪৬ মিটার (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)। খনন শুরু ১৯৭৩–৭৪ সালে ড. হারুন-অর-রশিদের নেতৃত্বে (ডেইলি স্টার/টিবিএস); পরে ১৯৯৮ ও ২০০৩ সালেও (বহুজাতিক প্রকল্প, অ্যান্টিকুইটি) খনন চলে, আর ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন খননে পাল-যুগের দেয়াল, মৃৎমূর্তি ও ধ্যানমগ্ন বুদ্ধমূর্তি মেলে (টিবিএস)। পাওয়া নিদর্শনের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ২৫০টির বেশি লিপিযুক্ত টেরাকোটা সিলমোহর (শতাধিক পাঠযোগ্য), ব্রোঞ্জমূর্তি, টেরাকোটা ফলক ও অলংকৃত ইট — মোট প্রায় ৮০০ প্রত্নবস্তু (তিব্বতি বিশ্বকোষ/ইংরেজি উইকিপিডিয়া)।
পো-শি-পো বিতর্ক: হিউয়েন সাংয়ের ৭০০ ভিক্ষু
কানিংহাম এই বিহারটিকেই সপ্তম শতকের চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং (ভ্রমণ ৬৩৯–৬৪৫) বর্ণিত "পো-শি-পো" বিহার বলে শনাক্ত করেছিলেন, যেখানে তাঁর লেখায় ৭০০ ভিক্ষু বাস করতেন (তিব্বতি বিশ্বকোষ)। তবে সব পণ্ডিত একমত নন — প্রশ্ন ওঠে, খননে পাওয়া মোট কক্ষের সংখ্যায় ৭০০ ভিক্ষুর থাকা সম্ভব কি না। পাল্টা যুক্তিও আছে: খনন এখনো শুধু ওপরের (দশম–একাদশ শতকের) স্তরেই পৌঁছেছে, সপ্তম শতকের স্তর পর্যন্ত যায়নি (তিব্বতি বিশ্বকোষ)। বিতর্কটা অমীমাংসিত — আর সেটাই ভাসু বিহারের বাড়তি আকর্ষণ: ধানক্ষেতের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা এই টিলাগুলোতে আরও অনেক ইতিহাস মাটির নিচে অপেক্ষা করছে।
খেরুয়া মসজিদ: তারিখ লেখা আছে যার গায়ে
শেরপুর উপজেলার খন্দকারটোলায় (শাহ বন্দেগী ইউনিয়ন), বগুড়া শহর থেকে প্রায় ২০–২৫ কিলোমিটার দক্ষিণে খেরুয়া মসজিদ। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সূত্রে বাসস (ডিসেম্বর ২০২৫) জানায়, গায়ের শিলালিপি অনুযায়ী এর নির্মাণ শুরু ১৫৮২ সালের ২১ জানুয়ারি (৯৮৯ হিজরির ২৬ জিলহজ) — জওহর আলী কাকশালের ছেলে মির্জা মুরাদ খান কাকশালের পৃষ্ঠপোষকতায়; নির্মাণ শেষ হতে আরও কয়েক বছর লেগেছিল। অধিদপ্তরের ভাষায়, সঠিক তারিখ সংবলিত এ অঞ্চলের মুসলিম আমলের সবচেয়ে প্রাচীন কীর্তি এটি (বাসস)। প্রেক্ষাপটটাও নাটকীয়: ১৫৮০ সালে আকবরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে কাকশাল জায়গীরদাররা মাসুম খান কাবুলীর সঙ্গে যোগ দেন (বাসস/আবুল কালাম যাকারিয়া) — অর্থাৎ চাটমোহরের শাহী মসজিদের (১৫৮১) ঠিক পরের বছর, একই বিদ্রোহের যুগে গড়া এই মসজিদ। আরব থেকে আসা আব্দুস সামাদ ফকিরের মসজিদ-পরিকল্পনার কথাও বর্ণনায় আছে (বাসস)।
স্থাপত্য: সুলতানি ছাঁচে মুঘল যুগের শুরু
আয়তাকার মসজিদটি বাইরে প্রায় ১৭.৩ × ৭.৫ মিটার, দেয়াল ~১.৮৩ মিটার পুরু (এশিয়ান এজ); ছাদে সারিবদ্ধ তিনটি অর্ধগোল গম্বুজ, পশ্চিম দেয়ালে তিনটি অলংকৃত মেহরাব, পূর্বে তিনটি প্রবেশপথ, চার কোণে অষ্টভুজ বুরুজ এবং ধনুকের মতো বাঁকা কার্নিশের নিচে টেরাকোটা-প্যানেলের অলংকরণ (অবজারভার/ভ্রমণগাইড)। শৈলীতে সুলতানি ও মুঘল ধারার মিশেল — বাংলার প্রাচীন মুঘল-যুগীয় মসজিদের অন্যতম নিদর্শন (এশিয়ান এজ)। কেন্দ্রীয় দরজার দুই পাশে দুটি শিলালিপি ছিল; একটি এখনো গায়ে আছে, অন্যটি করাচি জাদুঘরে সংরক্ষিত (এশিয়ান এজ)। নামের উৎপত্তি নিয়ে নিশ্চিত ইতিহাস নেই; যাকারিয়ার আলোচনায় ফারসি "খায়ের গাহ" থেকে আসার ধারণা আছে (অবজারভার)। সৎ নোট: প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর তিন দশকের বেশি আগে দায়িত্ব নিলেও বড় ধরনের সংস্কার এখনো হয়নি (অবজারভার, জানুয়ারি ২০২৬) — মসজিদে নিয়মিত নামাজ চলে (ভ্রমণগাইড), দর্শনার্থীরা সেই মর্যাদা রেখে ঘুরবেন।
ভ্রমণ তথ্য
ভাসু বিহার মহাস্থানগড়ের সঙ্গে একই যাত্রায় (৬ কিমি পশ্চিমে, শিবগঞ্জ); খেরুয়া শেরপুরে — বগুড়া-ঢাকা মহাসড়ক ধরে শেরপুর শহর থেকে ~১.৫ কিমি দক্ষিণে। দুটো মিলিয়ে পুরো দিনের প্রত্ন-সার্কিট: সকালে মহাস্থান দুর্গ-জাদুঘর, তারপর ভাসু বিহার, বিকেলে শেরপুরের খেরুয়া (পথে শেরপুরের দই-বিরতি)। প্রত্নস্থলে আরোহণ ও ছোঁয়ার ক্ষেত্রে সংরক্ষণ-নিয়ম মানুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ভাসু বিহারের স্থানীয় নাম কী?
নরপতির ধাপ — শিবগঞ্জের বিহার গ্রামে (তিব্বতি বিশ্বকোষ)।
হিউয়েন সাংয়ের সঙ্গে যোগ কতটা নিশ্চিত?
কানিংহাম "পো-শি-পো" বলে শনাক্ত করেন; পণ্ডিতদের মধ্যে বিতর্ক আছে — অমীমাংসিত (তিব্বতি বিশ্বকোষ)।
খননে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাওয়া কী?
২৫০টির বেশি লিপিযুক্ত টেরাকোটা সিলমোহর ও ব্রোঞ্জমূর্তি (তিব্বতি বিশ্বকোষ)।
খেরুয়া মসজিদ কবে, কে গড়েন?
শিলালিপি অনুযায়ী ১৫৮২ সালে নির্মাণ শুরু, মির্জা মুরাদ খান কাকশালের পৃষ্ঠপোষকতায় (বাসস)।
খেরুয়ার গম্বুজ কয়টি?
তিনটি অর্ধগোল গম্বুজ এক সারিতে (অবজারভার)।
শেষকথা
এক জেলায় দুই ধর্মের দুই যুগ: নাগর নদীর পাড়ে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের নীরব বিহার, আর শেরপুরে বিদ্রোহের আগুনের যুগে গড়া তারিখ-খোদাই মসজিদ। বগুড়া ভ্রমণে এই দুটো যোগ করলে পুণ্ড্রনগরের গল্পটা পুরো হয় — এই পোস্টের সঙ্গে বগুড়া জেলা সম্পূর্ণ (৪/৪) হলো।