মহাস্থানগড় বাসস্ট্যান্ড থেকে মাত্র ~২ কিলোমিটার দক্ষিণে গোকুল গ্রামে যে ইটের টিলাটি দাঁড়িয়ে, তার নাম নিয়ে বাংলার সবচেয়ে মজার দ্বন্দ্ব: লোকের মুখে এটি বেহুলার বাসরঘর, প্রত্নতত্ত্বের খাতায় এটি একটি প্রাচীন বৌদ্ধ স্তূপের ভিত্তি। বাংলা উইকিপিডিয়া নিজেই সোজাসুজি লিখেছে — "আসলে এটি বেহুলার বাসর ঘর নয়, একটি প্রাচীন বৌদ্ধ মঠ।" দুই গল্পই এই পোস্টে, আলাদা করে চিহ্নিত করে।
লোককাহিনি: মনসামঙ্গলের বাসররাত
মনসামঙ্গল কাব্যে চাঁদ সদাগর মনসার অভিশাপ থেকে ছেলে লক্ষ্মীন্দরকে বাঁচাতে লোহার বাসরঘর বানিয়েছিলেন; তবু বাসররাতে সুতোর মতো সরু ছিদ্র দিয়ে ঢুকে সাপের দংশনে লক্ষ্মীন্দরের মৃত্যু হয়, আর বেহুলা মৃত স্বামীকে ভেলায় নিয়ে ছয় মাস ভেসে দেবলোকে গিয়ে মনসাকে তুষ্ট করে স্বামীর প্রাণ ফিরিয়ে আনেন (লোককাহিনি; ঘুরুঞ্চি)। গোকুলের এই টিলার পশ্চিমাংশে সেই বাসরঘরের "প্রবাদ স্মৃতিচিহ্ন" দেখানো হয় (ভ্রমণগাইড) — গল্পটি বাংলার সবচেয়ে প্রিয় লোককথাগুলোর একটি বলেই টিলাটি এই নামে অমর হয়ে আছে।
প্রত্নতত্ত্ব: ১৭২ কুঠুরির স্তূপ-ভিত্তি
বাস্তব কাঠামোটি অন্যরকম চমকপ্রদ। ১৯৩৪–৩৬ সালে প্রত্নতত্ত্ববিদ এন জি মজুমদারের খননে বেরিয়ে আসে একটি স্তূপ/মন্দিরের সোপান-ভিত্তি: ১৭২টি ঘন সাজানো অন্ধ আয়তাকার কুঠুরি স্তরে স্তরে ওপরে উঠে বহুভুজ মন্দিরকে ধারণ করত (অসমীয়া/বাংলা উইকিপিডিয়া, ভ্রমণগাইড)। কাল নির্ধারণে গবেষকদের হিসাব চতুর্থ থেকে একাদশ শতকের মধ্যে ঘোরে (বাংলা উইকিপিডিয়া); কারও কারও মতে এটি পাল রাজা দেবপালের (৮০৯–৮৪৭) আমলের বৌদ্ধ মঠ (অচিনদেশে/ঘুরুঞ্চি — গবেষক-মত হিসেবে)। এখানে গুপ্ত যুগের (ষষ্ঠ–সপ্তম শতক) টেরাকোটা ফলক পাওয়া গেছে; পরে সেন যুগে একটি বর্গাকার মন্দির যুক্ত হয়, আর খননে পাওয়া ছিদ্রযুক্ত প্রস্তরফলক ও ষাঁড়ের আকৃতির স্বর্ণপত্র থেকে ধারণা করা হয় কোনো এক পর্বে এটি শিব মন্দির হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছিল (ভ্রমণগাইড/অসমীয়া উইকিপিডিয়া)। পূর্বাংশে আছে ২৪ কোণবিশিষ্ট চৌবাচ্চা-আকৃতির স্নানঘর, যার ভেতরে ছিল ৮ ফুট গভীর কূপ (অচিনদেশে)। বৌদ্ধ পাহাড়পুরের ক্রুশাকার স্তূপের সঙ্গে এই সোপান-গঠনের তুলনাটা প্রত্ন-রসিকদের জন্য বাড়তি আনন্দ।
বারী পান: প্রবেশমুখের ছোট্ট কিংবদন্তি
গোকুল মেধের প্রবেশমুখেই বারী পানের দোকান — ১৯৮৯ সাল থেকে চলা এই দোকানের মিষ্টি পান দর্শনার্থীদের কাছে এতটাই জনপ্রিয় যে বাংলা উইকিপিডিয়ার নিবন্ধেও তার উল্লেখ আছে। টিলা দেখে এসে এক খিলি পান মুখে দেওয়াটা এখন গোকুল ভ্রমণের অনানুষ্ঠানিক সমাপনী অনুষ্ঠান।
ভ্রমণ তথ্য
মহাস্থানগড় থেকে রিকশা/হেঁটেই যাওয়া যায় (~২ কিমি); বগুড়া শহর থেকে ~১০ কিমি উত্তরে। মহাস্থানগড়ের সঙ্গেই একই ভ্রমণে দেখুন — আলাদা করে আসার দরকার পড়ে না। টিলার ওপরে ওঠা যায়; গ্রীষ্মে গরমে ছাতা-পানি সঙ্গে রাখুন। একদিনের পরিকল্পনা: মহাস্থান দুর্গ ও জাদুঘর সকালে, দুপুরের পর গোকুল মেধ ও বারী পান।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
গোকুল মেধ আসলে কী?
খননে পাওয়া বৌদ্ধ স্তূপ/মন্দিরের সোপান-ভিত্তি — বাসরঘর নয় (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
তাহলে বেহুলার নাম এলো কেন?
মনসামঙ্গলের বাসরঘরের লোককাহিনি এই টিলার সঙ্গে যুগ যুগ ধরে জড়িয়ে গেছে (ঘুরুঞ্চি)।
খনন কে করেন?
এন জি মজুমদার, ১৯৩৪–৩৬ সালে (ভ্রমণগাইড)।
কুঠুরি কতটি?
১৭২টি অন্ধ আয়তাকার কুঠুরি স্তরে স্তরে সাজানো (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
মহাস্থানগড় থেকে কত দূর?
প্রায় ২ কিলোমিটার দক্ষিণে, গোকুল গ্রামে (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
শেষকথা
গোকুল মেধ শেখায় কীভাবে একটা জায়গা দুটো সত্য একসঙ্গে বহন করতে পারে — পণ্ডিতের খাতায় স্তূপ, মানুষের হৃদয়ে বাসরঘর। কোনোটাকেই ছোট না করে দুটো জানলেই এই টিলার ভ্রমণ পূর্ণ হয়।