পাবনা শহর থেকে প্রায় ৩০–৩৫ কিলোমিটার উত্তরে চাটমোহর — চলন বিলের দক্ষিণ প্রান্তের এই পুরনো বাণিজ্যকেন্দ্রে লুকিয়ে আছে দুটি অসাধারণ নিদর্শন: ষোড়শ শতকের শাহী মসজিদ, যার পেছনে এক বিদ্রোহী সেনাপতির রাজধানী গড়ার গল্প, আর হান্ডিয়াল গ্রামের জগন্নাথ মন্দির, যেখানে রথযাত্রা চলছে শতাব্দীর পর শতাব্দী। দুটো মিলে এই পোস্ট।
চাটমোহর শাহী মসজিদ: বিদ্রোহীর রাজধানীর মসজিদ
চাটমোহর বাজারের কেন্দ্রে কাজীপাড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা তিন গম্বুজের এই মসজিদের শিলালিপি অনুযায়ী নির্মাণকাল ১৫৮১ খ্রিস্টাব্দ (বাংলা উইকিপিডিয়া/দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট)। অর্থায়ন করেন আবুল ফতেহ মোহাম্মদ মাসুম খাঁ — ইতিহাসে পরিচিত মাসুম খাঁ কাবুলি নামে, সম্রাট আকবরের পাঁচহাজারী মনসবদার; নির্মাণ করেন তাঁর ভাই খান মুহাম্মদ বিন তুকি খান কাকশাল (বাংলা উইকিপিডিয়া)। গল্পটা এখানেই শেষ নয়: মুঘলদের বাংলা দখলের পর মাসুম খাঁ আকবরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে পাবনা অঞ্চলে স্বাধীন রাজ্য গড়েন, যার রাজধানী ছিল চাটমোহর; এখানে তিনি প্রাসাদ, দুর্গ (আজ আর নেই), সেনাছাউনি ও বড় দীঘিসহ নানা স্থাপনা করেন — এই মসজিদ তারই অংশ (দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট)। মসজিদের তুঘরা লিপির ফারসি শিলালিপিটি এখন রাজশাহীর বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরে সংরক্ষিত (বাংলা উইকিপিডিয়া)। ছোট পাতলা জাফরি ইটের গায়ে ভেতর-বাইরে টেরাকোটার লতাপাতার নকশা এখনো টিকে আছে; যুগ মুঘল হলেও নির্মাণশৈলীতে সুলতানি ধারার ছাপ স্পষ্ট (দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট/ভ্রমণপ্রিয়)। উচ্চতা প্রায় ৪৫ ফুট। সতর্ক নোট: একসময় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া মসজিদটি ১৯৮০-র দশকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর পুনর্নির্মাণ করে; পরে ছাদ-গম্বুজে আবার ক্ষতি হলে পুনরায় সংস্কার হয় — বর্তমানে এটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ও সক্রিয় জামে মসজিদ (বাংলা উইকিপিডিয়া/ভ্রমণপ্রিয়)।
হান্ডিয়াল জগন্নাথ মন্দির: তারিখে ধোঁয়াশা, ঐতিহ্যে স্পষ্ট
চাটমোহর সদর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে হান্ডিয়াল গ্রামে, চলন বিল অঞ্চলের সবুজে ঘেরা ১.১৯ একর জমিতে জগন্নাথ মন্দির কমপ্লেক্স (ডেইলি স্টার)। মন্দিরের বয়স নিয়ে সূত্রগুলো একমত নয়, সেটা স্বীকার করে নেওয়াই সৎ পথ: ক্যালকাটা গেজেটের পুরনো নথির ধারণায় প্রতিষ্ঠা ১৩০০–১৪০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে (ডেইলি স্টার); প্রত্নতত্ত্ববিদদের কারও মতে পঞ্চদশ শতকের শুরু, কারও মতে ১৫৫০ সাল (বাংলা উইকিপিডিয়া)। নিশ্চিত তথ্য একটিই — মন্দিরের গায়ের টেরাকোটা ফলক অনুযায়ী ১৫৯০ সালে ভবানীপ্রসাদ এটি সংস্কার করেন (ডেইলি স্টার/বাংলা উইকিপিডিয়া)। প্রাচীন মন্দিরটি এক দরজার ছোট ইটের কাঠামো, ওপরের দিকে ক্রমশ সরু হওয়া চূড়া আর সম্মুখ দেয়ালে টেরাকোটার কাজ (বাংলা উইকিপিডিয়া)। কমপ্লেক্সে জগন্নাথের পাশাপাশি মহাপ্রভু, লক্ষ্মী-বিষ্ণু, দুর্গা ও রথ মন্দির আছে; এখানে প্রায় ছয়শো বছর ধরে রথযাত্রা উদ্যাপিত হচ্ছে বলে মন্দিরের সেবায়েত ও ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন জানায়। ১৯৭১ সালে মন্দির ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল; পরে ভক্তদের অর্থে সংস্কার হয়, প্রাচীন এক-দরজা কাঠামোটি টিকে আছে; প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর শেষ সংস্কার করে ২০০৯–১০ সালে (ডেইলি স্টার)। সতর্কতা: মাটির লবণাক্ততা মন্দিরের ভিত ও টেরাকোটার ক্ষতি করছে — ২০০৮ সালের ডেইলি স্টার প্রতিবেদনের শিরোনামই ছিল "Temple awaits repair" (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)। একই গ্রামে আছে বুড়াপীর খ্যাত শাহ মোখলেছুর রহমানের মাজারও (বাংলা উইকিপিডিয়া) — হিন্দু-মুসলিম ঐতিহ্যের এই পাশাপাশি অবস্থান গ্রামটির চরিত্র। চলন বিলের বর্ষার রূপের সঙ্গে হান্ডিয়াল মিলিয়ে নিলে দিনটা পুরো হয়।
চাটমোহরের আরও টুকরো
উপজেলার আরও নিদর্শনের মধ্যে আছে সমাজ শাহী মসজিদ (শিক্ষক বাতায়ন তালিকায় ৯৫৮ হিজরির উল্লেখ) ও হরিপুর গ্রামে সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরীর পৈতৃক বাড়ি — তবে সংরক্ষণের অভাবে বাড়িটি ধ্বংস হয়ে গেছে বলে ইত্তেফাকের প্রতিবেদন জানায়; গেলে ধ্বংসাবশেষ দেখার প্রস্তুতি রাখুন।
ভ্রমণ তথ্য
পাবনা শহর থেকে বাস/সিএনজিতে চাটমোহর; শাহী মসজিদ বাজার এলাকাতেই। হান্ডিয়ালের জন্য চাটমোহর থেকে স্থানীয় যান নিতে হবে (~১৮ কিমি)। রথযাত্রার সময় (আষাঢ়) হান্ডিয়ালে সবচেয়ে বেশি ভিড় ও উৎসবের আমেজ। মন্দিরটি সক্রিয় পূজার স্থান — পোশাক ও আচরণে সংযম রাখুন। একদিনের পরিকল্পনা: সকালে শাহী মসজিদ ও বাজার, দুপুরে হান্ডিয়াল, বিকেলে ফেরা।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
চাটমোহর শাহী মসজিদ কবে নির্মিত?
১৫৮১ খ্রিস্টাব্দে, মাসুম খাঁ কাবুলির অর্থায়নে তাঁর ভাই কাকশাল নির্মাণ করেন (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
মাসুম খাঁ কাবুলি কে ছিলেন?
আকবরের পাঁচহাজারী সেনাপতি, যিনি বিদ্রোহ করে চাটমোহরে রাজধানীসহ স্বাধীন রাজ্য গড়েছিলেন (দি ইন্ডিপেন্ডেন্ট)।
মসজিদের শিলালিপি কোথায়?
রাজশাহীর বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরে সংরক্ষিত (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
হান্ডিয়াল মন্দির কত পুরনো?
তারিখ বিতর্কিত (১৪শ–১৬শ শতক); নিশ্চিত তথ্য ১৫৯০ সালে ভবানীপ্রসাদের সংস্কার (ডেইলি স্টার)।
রথযাত্রা কখন হয়?
প্রতি বছর আষাঢ় মাসে, প্রায় ছয়শো বছরের ধারাবাহিকতায় (ডেইলি স্টার)।
শেষকথা
চাটমোহর-হান্ডিয়াল জুটি বাংলাদেশের ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক বহুস্তরতার গল্প: এক বিদ্রোহী মুসলিম সেনাপতির মসজিদ আর কয়েক মাইল দূরে হিন্দু তীর্থের ছয়শো বছরের রথ। তারিখের ধোঁয়াশা যেখানে আছে, সেখানে সেটা স্বীকার করেই এই ঐতিহ্য সবচেয়ে ভালো উপভোগ করা যায়।