• 29 Oct, 2026

তিতাস পাড়ের ব্রাহ্মণবাড়িয়া: সুর, মসলিন আর ছানামুখীর শহর

তিতাস পাড়ের ব্রাহ্মণবাড়িয়া: সুর, মসলিন আর ছানামুখীর শহর

ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের পরিচিতি ও ঐতিহ্য গাইড — ১৮৬৮ সালের পৌরসভা ও নদীবন্দর, মুঘল আমলের মসলিন, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সঙ্গীত-ঐতিহ্য, তিতাসের নৌকা বাইচ, কাল ভৈরব মন্দির আর জিআই-স্বীকৃত ছানামুখী মিষ্টিসহ।

পাশের জেলার কুমিল্লা শহরের মতো ব্রাহ্মণবাড়িয়াও নিছক যাতায়াতের থামকাঠি নয় — এই শহরের পরিচয় গড়ে উঠেছে তিনটি স্তম্ভে: নদী, সঙ্গীত আর মসলিন। তিতাসের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রাচীন জনপদকে স্থানীয় গর্বে বলা হয় বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী — দাবিটা শুনতে বড় হলেও নামগুলো শুনলেই ওজনটা বোঝা যায়: ঈসা খাঁর সরাইল (পাশের উপজেলা), ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, অদ্বৈত মল্লবর্মণ, কবি আল মাহমুদ — সবাই এই এক জেলার সন্তান (বণিক বার্তার প্রতিবেদনে এই ধারাবাহিকতাই বিশদে এসেছে)।

শহরের ইতিহাস: বন্দর থেকে পৌরসভা

তিতাস নদী (মেঘনার শাখা, আবার মেঘনাতেই মেশে) ছিল এই জনপদের প্রাণ — নদীবন্দর হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাণিজ্যিক গুরুত্ব বহু পুরনো। মুঘল আমলে এলাকাটি বিখ্যাত ছিল মসলিন কাপড় তৈরির জন্য (বাংলা উইকিপিডিয়া)। ১৮৬৮ সালে গঠিত পৌরসভা দেশের প্রাচীনতমগুলোর একটি (উইকিভয়েজ)। ব্রিটিশ আমলে শহরের বুক চিরে খনন করা দুটি খালের বড়টি — কুড়ুলিয়া খাল — আজও শহরের ল্যান্ডমার্ক; ঢাকা–চট্টগ্রাম রেলপথে যেতে সবাইকে এই খাল পেরোতে হয় (ডেইলি স্টারের স্মৃতিচারণা)। দীর্ঘদিন ত্রিপুরা (কুমিল্লা) জেলার অংশ থাকার পর ১৯৮৪ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৃথক জেলা হয়। আধুনিক পরিচয়ে শহরের পাশেই দেশের বৃহত্তম গ্যাস ক্ষেত্র — তিতাস গ্যাস ফিল্ড — অর্থাৎ এই ছোট শহর দেশের জ্বালানি-মানচিত্রেরও কেন্দ্র।

সুরের তীর্থ: আলাউদ্দিন খাঁর ব্রাহ্মণবাড়িয়া

জেলা প্রশাসনের সংস্কৃতি-পাতার ভাষায়, উপমহাদেশের সঙ্গীতজগতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাম ‘স্বর্ণাক্ষরে খচিত’। শহরের অদূরে শিবপুর গ্রামে জন্ম ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর (১৮৬২) — মাইহার ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা, ভারতের সর্বকালের সেরা বহু-বাদ্যযন্ত্রী সাধকদের অন্যতম; তাঁর ছেলে ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ, ভাই ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ, ওস্তাদ বাহাদুর হোসেন খান — পুরো একটা রাজবংশ যেন এই মাটির। জেলা প্রশাসন শিবপুরকে আখ্যা দিয়েছে ‘সঙ্গীতের তীর্থভূমি’ হিসেবে; শহরে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সঙ্গীতাঙ্গন/একাডেমিতে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের চর্চা ও শিক্ষা চলে, আর শহর জুড়ে নিয়মিত বসে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আসর ও উৎসব (স্থানীয় গাইড)। সঙ্গীতপ্রেমী ভ্রমণকারীর জন্য এই শহর তাই নস্টালজিয়ার ঠিকানা — নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানের তারিখ আগে জেনে গেলে অভিজ্ঞতা পূর্ণ হয়।

তিতাস: নদী যেখানে সাহিত্য আর উৎসব

তিতাস শুধু নদী নয় — অদ্বৈত মল্লবর্মণের কালজয়ী উপন্যাস ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এর প্রাণভূমি এই নদী ও তার মালো পাড়া; লেখক নিজেও গোকর্ণ গ্রামের মালো সম্প্রদায়ের সন্তান, তাই উপন্যাসের জেলে-জীবনের চিত্র এত জীবন্ত। পরে ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্রে তা পৌঁছেছে বিশ্বদরবারে — সাহিত্যপ্রেমী ভ্রমণকারীর জন্য তিতাসের পাড়ে দাঁড়ানো মানে একটা উপন্যাসের পৃষ্ঠায় পা রাখা। নদীর জীবন্ত ঐতিহ্য নৌকা বাইচ: শত বছর ধরে প্রতি বছর ভাদ্র মাসের প্রথম দিনে মনসা পূজা উপলক্ষে তিতাসে সারিবাঁধা নৌকার প্রতিযোগিতা হয় (বাংলা উইকিপিডিয়া) — দুই পাড়ে হাজারো দর্শক, ঢাক-ঢোল আর ‘হেইয়ো’ ধ্বনি; এই এক দিনের জন্য শহর ভ্রমণের পরিকল্পনা করলে সেরা অভিজ্ঞতাটা মিলবে। সাধারণ দিনে পাড়ে বসে জেলে-নৌকা, রাজহাঁসের ঝাঁক আর সূর্যাস্তই যথেষ্ট। শহরের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া কুড়ুলিয়া খালের পাড়ও সকাল-বিকেলের হাঁটার জায়গা।

শহরে যা দেখবেন

  • কাল ভৈরব মন্দির (মেড্ডা): উনবিংশ শতকের শিব মন্দির; প্রাঙ্গণে ~২৮ ফুট উঁচু শিবমূর্তি — স্থানীয়ভাবে বিশ্বের বৃহত্তম বলে দাবি করা হয় (উইকিভয়েজ)। শৈব তীর্থযাত্রীদের ভিড় থাকে উৎসবে।
  • ফারুক পার্ক: সবুজের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ (উইকিভয়েজ); কাছেই আন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশে শহীদ মিনার।
  • পুতুলনাচের ঐতিহ্য: উপমহাদেশে পুতুলনাচের প্রচলনকারী হিসেবে স্বীকৃত নবীনগরের কৃষ্ণনগর গ্রামের বিপিন পাল (বাংলা উইকিপিডিয়া) — শহরে উৎসব-মেলায় পুতুলনাচের দল মিললে থামুন অবশ্যই।
  • ভাদুঘরের বাণ্ণী মেলা: তিতাসের তীরে ঐতিহ্যবাহী এই মেলা জেলার লোকজ সংস্কৃতির আরেক ঝলক (জেলা পরিচিতি)।

ছানামুখী: জিআই-স্বীকৃত মিষ্টি

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সবচেয়ে সুস্বাদু পরিচয় ছানামুখী — ছানার ছোট ছোট ‘মুখ’ আকৃতির এই মিষ্টান্ন দেশের অন্য কোথাও তেমন প্রচলিত নয়, আর ২০২৪ সালে এটি পেয়েছে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি (জেলা পরিচিতি সূত্র)। পাশাপাশি তালের রসের তালের বড়া আর রসমালাইও বিখ্যাত (বাংলা উইকিপিডিয়া)। শহরের পুরনো মিষ্টির দোকান থেকে ছানামুখী না কিনে ফেরা মানে ভ্রমণ অর্ধেক রেখে আসা।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি

মুক্তিযুদ্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছিল ২ ও ৩ নম্বর সেক্টরের অধীনে (জেলা প্রোফাইল); সীমান্তবর্তী কসবা-আখাউড়া অঞ্চলে প্রতিরোধের তীব্র ইতিহাস রয়েছে, আর বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ মোস্তফা কামালের সমাধি আখাউড়ায় (জেলা আকর্ষণ-তালিকা)। শহরের ফারুক পার্কের স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা জানিয়ে যাত্রা শুরু করাটা ইতিহাস-সচেতন ভ্রমণকারীর জন্য অর্থবহ — শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের গ্রাম রামরাইলও সদর এলাকাতেই; ভাষা আন্দোলনের এই নেতার বাড়িটি আজও সেখানে আছে (ডেইলি স্টার), যদিও সংরক্ষণ নিয়ে স্থানীয়দের আক্ষেপের কথা প্রতিবেদনে এসেছে।

কীভাবে যাবেন ও কখন

ঢাকা থেকে দূরত্ব ~১১০ কিলোমিটার — সড়ক (ঢাকা–সিলেট মহাসড়ক) ও রেলে (ঢাকা–চট্টগ্রাম লাইনের প্রধান স্টেশন) দুভাবেই সহজ; দিনে গিয়ে দিনে ফেরা যায়। সেরা সময়: নৌকা বাইচের ভাদ্রের শুরু (আগস্টের মাঝামাঝি), শীতের সকালের নদী, আর সঙ্গীত-উৎসবের দিনগুলো। জেলার বাকি ঐতিহ্য — সরাইলের হাতিরপুল ও আরিফাইল মসজিদ, আখাউড়ার গঙ্গাসাগর — একদিন বাড়তি রাখলে একই সফরে সম্ভব।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে সাংস্কৃতিক রাজধানী বলা হয় কেন?

আলাউদ্দিন খাঁসহ শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একাধিক কিংবদন্তি, পুতুলনাচের প্রচলন আর সাহিত্য-ঐতিহ্যের কারণে।

ছানামুখী কি সত্যিই জিআই পণ্য?

জেলা পরিচিতি সূত্র অনুযায়ী ২০২৪ সালে ছানামুখী ভৌগোলিক নির্দেশক স্বীকৃতি পেয়েছে।

নৌকা বাইচ কখন হয়?

প্রতি বছর ভাদ্র মাসের প্রথম দিনে, মনসা পূজা উপলক্ষে তিতাস নদীতে (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

শেষকথা

ব্রাহ্মণবাড়িয়া দেখতে হলে কানে শুনতে হয় — সঙ্গীতাঙ্গনের তানপুরা, বাইচের ‘হেইয়ো’, মিষ্টির দোকানের ভিড়। মিষ্টি-ভ্রমণের ধারাবাহিকতায় পড়ুন প্রতিবেশী জেলার কুমিল্লার রসমালাইয়ের গল্প — ২০২৪ সালেই জিআই পাওয়া দুই প্রতিবেশীর দুই কীর্তি।