• 29 Oct, 2026

হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদ: জুমাতুল বিদার দেশসেরা জামাত আর এক দানবীরের স্বপ্ন

হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদ: জুমাতুল বিদার দেশসেরা জামাত আর এক দানবীরের স্বপ্ন

চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে ঐতিহাসিক বড় মসজিদের গাইড — সুফি মকিম উদ্দিনের মোকিমাবাদ থেকে হাজী আহমদ আলী পাটোয়ারীর ১৯৩১–৩৭ নির্মাণ, প্রথম জুমায় শেরে বাংলা ও সোহরাওয়ার্দী, ১৯৫৩ সালের মিনার, কাচ ও চিনামাটির কারুকাজ আর জুমাতুল বিদার বিখ্যাত জামাত; দর্শনবিধিসহ।

বজরা শাহী মসজিদের মতোই এই অঞ্চলের আরেক বিখ্যাত মসজিদের গল্প শুরু হয় ব্যক্তিগত ধর্মভক্তি থেকে — তবে হাজীগঞ্জের ক্ষেত্রে স্কেলটা অনেক বড়। চাঁদপুর শহর থেকে ~২০ কিলোমিটার পূর্বে, চাঁদপুর–কুমিল্লা আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদ — আয়তনে দেশের ষষ্ঠ বৃহৎ মসজিদ (ভ্রমণগাইড/কুহুডাক), আর খ্যাতি ছড়িয়ে আছে এক অসাধারণ কারণে: বাংলাদেশে জুমাতুল বিদার সবচেয়ে বড় জামাত হয় এই মসজিদেই।

গভীর শিকড়: মোকিমাবাদ থেকে হাজীগঞ্জ

স্থানীয় ইতিহাস অনুযায়ী, বাংলা একাদশ শতকের দিকে আরব থেকে ইসলাম প্রচারে আসেন সুফি মকিম উদ্দিন (রঃ) — তাঁর গোলপাতার ইবাদতখানাকে ঘিরেই গড়ে ওঠে ‘মোকিমাবাদ’। বংশের শেষ পুরুষ হাজী মনিরুদ্দিন (মনাই হাজী) মসজিদের পাশে ‘হাজীর দোকান’ খুললে জায়গাটা পরিচিত হয় হাজীর বাজার, তারপর হাজীগঞ্জ নামে (ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস) — অর্থাৎ শহরের নামটাই এসেছে এই ইবাদতখানার ধারাবাহিকতা থেকে। প্রায় আড়াই শতক ধরে এখানে কোনো না কোনো রূপে মসজিদ ছিল — প্রথমে গোলপাতা, পরে টিনের ছাউনি।

পাকা মসজিদ: এক দানবীরের ছয় বছরের সংগ্রাম

মনাই হাজীর প্রপৌত্র হাজী আহমদ আলী পাটোয়ারী নিজের বাড়ি না গড়ে মসজিদ গড়ায় মন দেন — বিস্তীর্ণ নিজ জমি, পুকুর-খালসহ প্রায় সবকিছুই তিনি মসজিদের জন্য ওয়াকফ করে দেন। ১৭ আশ্বিন ১৩৩৭ বঙ্গাব্দে (১৯৩১ খ্রি.) ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন মাওলানা আবুল ফরাহ জৈনপুরী (রঃ)। নির্মাণের গল্পটা আজও কিংবদন্তি: এলাকায় তখন ইটভাটাই ছিল না — পাটোয়ারী প্রথমে ইটভাটা গড়েন, তারপর জাহাজ ভাড়া করে কলকাতা থেকে লোহার বীম ও মর্মর পাথর আনান (বাংলা উইকিপিডিয়া)। ১৯৩৫ সালে তৎকালীন মহকুমা প্রশাসকের উদ্যোগে ব্যবস্থাপনা-বিধি তৈরি হয়; ২১ জানুয়ারি ১৯৩৬-এ ওয়াকফ দলিল সম্পাদিত হয় বঙ্গীয় ওয়াকফ আইনে। ছয় বছর পর ১৯৩৭ সালে (১০ অগ্রহায়ণ ১৩৪৪ বঙ্গাব্দ) প্রথম জুমার আজানের মধ্য দিয়ে উদ্বোধন — সেই ঐতিহাসিক জুমায় অতিথি ছিলেন অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, নবাব মোশাররফ হোসেন প্রমুখ (ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস/সরকারি নথি)। পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মাওলানা ভাসানীও এখানে জুমার নামাজ আদায় করেছেন বলে উল্লেখ আছে একই প্রতিবেদনে। স্থানীয়ভাবে বলা হয়, পাটোয়ারী মেহরাব থেকে মিনার পর্যন্ত পুরো নকশা-নির্মাণ তত্ত্বাবধান করেন কোনো প্রকৌশলীর সাহায্য ছাড়াই।

যা দেখবেন

  • আয়তন ও ধারণক্ষমতা: মসজিদ ভবন ~২৮,৪০৫ বর্গফুট, পুরো কমপ্লেক্স ~১০ একর (ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস)। দোতলা ভবন ও প্রাঙ্গণ মিলিয়ে জুমার দিনে ১৫,০০০–২০,০০০ মুসল্লি নামাজ আদায় করেন; শুধু ভবনের ভেতরে ধারণক্ষমতা ~১০,০০০।
  • মিনার: ১৯৫৩ সালে চার স্তম্ভের ওপর নির্মিত মিনারটির উচ্চতা নিয়ে সূত্রে ভিন্নতা আছে — ১২১ ফুট থেকে ১৮৮ ফুট পর্যন্ত উল্লেখ মেলে (বাংলা উইকিপিডিয়া বনাম সরকারি নথি/গাইড)। ভেতরে সর্পিল সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠা যায়; সেখানকার লণ্ঠন-আকৃতির চূড়া আর বৃত্তাকার মঞ্চ থেকে হাজীগঞ্জ শহরের প্যানোরামা দেখা যায়। প্রতিদিন প্রায় ২০টি মাইকে এই মিনার থেকেই আজান প্রচারিত হয় (চাঁদপুর টাইমস)।
  • কারুকাজ: মেহরাব সাজানো কাচের টুকরোর কাজে, ভেতরের দেয়ালে বৃত্তাকারে আরবি ক্যালিগ্রাফিতে সূরা ইয়াসিন ও সূরা জুমা লেখা; প্রধান প্রবেশফটকে চীনা মাটির বাসনের টুকরো (চিনি-টিকরি ধাঁচে) বসিয়ে গড়া কালিমা-অলংকরণ; তারকাখচিত পাথরের বড় গম্বুজগুলো এই মসজিদের স্বাক্ষর-সৌন্দর্য।
  • কমপ্লেক্স: একই ওয়াকফ এস্টেটের অধীনে আহমাদিয়া দারুল উলুম কামিল মাদ্রাসা (১৯৩১-এ প্রতিষ্ঠিত), কওমি, হাফেজিয়া ও নূরানি মাদ্রাসা আর ইসলামিয়া পাঠাগার; নারীদের জন্য আলাদা নামাজের ব্যবস্থা আছে। কমপ্লেক্সে সংস্কারকাজ চলমান রয়েছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে (চাঁদপুর টাইমস)।

জুমাতুল বিদা: বছরের বড় দিন

রমজানের শেষ জুমায় এই মসজিদে জমায়েত হয় দেশের নানা প্রান্তের লাখো মুসল্লি বলে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত — বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জুমাতুল বিদা জামাত (একাধিক সূত্র)। সেই দিন পুরো হাজীগঞ্জ শহরজুড়ে বিশেষ ভিড়, যানজট ও আয়োজনের চাপ থাকে — দর্শনার্থী হলে হয় খুব সকালে পৌঁছান, নয়তো ভিন্ন দিন বেছে নিন। সাধারণ শুক্রবারেও দূরদূরান্ত থেকে মুসল্লিরা আসেন। দর্শনার্থী হিসেবে শুক্রবার গেলে নামাজের সময়ের ভিড় ও আবেগঘন পরিবেশ মাথায় রেখে পরিকল্পনা করুন; শুধু স্থাপত্য দেখতে চাইলে নামাজের বাইরের সময় বেছে নেওয়াই ভালো।

দর্শনবিধি ও ব্যবহারিক তথ্য

এটি একটি সক্রিয়, ঐতিহ্যবাহী ইবাদতখানা — পরিমিত পোশাক পরুন, নামাজের সময় ভেতরে নীরবতা বজায় রাখুন, ছবি তোলার আগে কর্তৃপক্ষ/মুসল্লিদের অনুমতি নিন। ওজু ও অজু-ব্যবস্থার সুব্যবস্থার কথা দর্শনার্থীরা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। মসজিদটি ব্যস্ত হাজীগঞ্জ বাজারের মাঝখানে, মহাসড়কের গায়ে — গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা সীমিত (দর্শনার্থীদের অভিজ্ঞতা), তাই স্থানীয় যানবাহনই সুবিধাজনক। ঢাকা থেকে দূরত্ব ~১০২ কিলোমিটার (কুহুডাক)। হাজীগঞ্জে এলে পাশের রূপসা জমিদার বাড়িটাও অনেকে তালিকায় রাখেন — তবে যাওয়ার আগে স্থানীয়ভাবে অবস্থা জেনে নিন।

কীভাবে যাবেন

চাঁদপুর শহর থেকে হাজীগঞ্জগামী বাস/সিএনজিতে ~২০ কিলোমিটার পূর্বে, মহাসড়কের পাশেই মসজিদ — আলাদা করে খুঁজতে হয় না। কুমিল্লা দিক থেকেও একই মহাসড়কে আসা যায়। চাঁদপুর শহরে রাত কাটিয়ে সকালে হাজীগঞ্জ ঘুরে দুপুরে ফেরা সহজ; শুক্রবার হলে জুমা এখানেই পড়ার অভিজ্ঞতাটা অনন্য হবে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

মসজিদটি কবে তৈরি?

বর্তমান পাকা ভবনের ভিত্তি ১৯৩১, উদ্বোধন ১৯৩৭ — তবে এই স্থানে ইবাদতখানার ইতিহাস আরও প্রায় দুই শতক পুরনো।

অমুসলিম দর্শনার্থী কি দেখতে পারবেন?

সাধারণত নামাজের সময়ের বাইরে, কর্তৃপক্ষের অনুমতি ও শৃঙ্খলা মেনে বাইরের স্থাপত্য দেখা যায় — ভেতরে প্রবেশের ক্ষেত্রে স্থানীয় নিয়মই চূড়ান্ত।

মিনারে ওঠা যায়?

ঐতিহ্যগতভাবে সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সুযোগ ছিল — বর্তমান নিয়ম কর্তৃপক্ষের কাছে জেনে নিন।

শেষকথা

একজনের সর্বস্ব দান, একটা শহরের নামের উৎস আর দেশের সবচেয়ে বড় জুমাতুল বিদা — হাজীগঞ্জ বড় মসজিদ ধর্মীয় ভ্রমণের বাইরেও একটা প্রাণবন্ত ইতিহাস-পাঠ। চাঁদপুরের বাকি রূপ দেখতে ফিরুন তিন নদীর মোহনায় — সূর্যাস্তের মোলহেড দিয়ে শেষ হোক দিনটা।