• 29 Oct, 2026

চট্টেশ্বরী কালী মন্দির: শহরের অধিষ্ঠাত্রী দেবীর শক্তিপীঠের ইতিহাস ও দর্শন গাইড

চট্টেশ্বরী কালী মন্দির: শহরের অধিষ্ঠাত্রী দেবীর শক্তিপীঠের ইতিহাস ও দর্শন গাইড

চট্টেশ্বরী সড়কের শ্রী শ্রী চট্টেশ্বরী কালী মন্দিরের গাইড — বাংলার অন্যতম শক্তিপীঠ, চট্টগ্রাম নামের উৎপত্তির কিংবদন্তি, নিম কাঠের আদি বিগ্রহ, ১৯৭১-এর ধ্বংস ও পুনর্জন্মের গল্প এবং দর্শনের নিয়ম।

মেহেদীবাগে তিন পাহাড়ের কোণে, চট্টেশ্বরী সড়কের ধারে দাঁড়িয়ে শ্রী শ্রী চট্টেশ্বরী কালী মন্দির — বন্দর নগরীর হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় তীর্থ। বিশ্বাস অনুযায়ী দেবী চট্টেশ্বরী এই শহরের অধিষ্ঠাত্রী দেবী (রক্ষাকর্ত্রী); কথিত আছে, ‘চট্টগ্রাম’ নামটির উৎপত্তিও নাকি ‘চট্টেশ্বরী’ থেকেই। উত্তরের সীতাকুণ্ড: একেক মৌসুমে একেক সাজ-এর চন্দ্রনাথের মতোই এটিও শাক্ত ঐতিহ্যের কেন্দ্র — তবে এটি একেবারে শহরের হৃদয়ে।

শক্তিপীঠ ও প্রাচীনত্ব

মন্দিরটিকে বাংলার অন্যতম শক্তিপীঠ হিসেবে গণ্য করা হয় — পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী শিব সতীর দেহ বহনকালে যেসব স্থানে দেহখণ্ড পতিত হয়েছিল, সেগুলোই শক্তিপীঠ (এখানে ঠিক কোন অঙ্গ পড়েছিল, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না বলেই ভক্তরা বলেন)। জনশ্রুতি অনুযায়ী প্রায় ৩০০–৩৫০ বছর আগে সাধু-সন্ন্যাসীদের মাধ্যমে এখানে দেবীর প্রকাশ ঘটে; বর্তমান মন্দিরের প্রতিষ্ঠা অষ্টাদশ শতকের বলে ধরা হয়। আরেকটি আকর্ষণীয় কিংবদন্তি ত্রিপুরার রাজমালা গ্রন্থে পাওয়া যায়: মহারাজ ধন্যমাণিক্য স্বপ্নাদেশ পেয়ে ষোড়শ শতকের গোড়ায় (১৫০১ খ্রিস্টাব্দে ত্রিপুরাসুন্দরী মন্দির প্রতিষ্ঠার সময়) চট্টগ্রাম থেকে দেবীর বিগ্রহ ত্রিপুরায় নিয়ে পূজা শুরু করেন — অর্থাৎ এই দেবীর খ্যাতি তখনই অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে ছিল।

ধ্বংস আর পুনর্জন্ম

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনারা মন্দিরটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আদি বিগ্রহ ছিল নিম কাঠের তৈরি — যুদ্ধের পর চক্রবর্তী পরিবারের একজন সদস্য তার ঊর্ধ্বাংশ উদ্ধার করেন, যা আজও মন্দিরে সংরক্ষিত আছে। যুদ্ধশেষে চক্রবর্তী পরিবারের উদ্যোগে মন্দির পুনর্নির্মাণ হয়; নতুন বিগ্রহ বেনারসে তৈরি করে বিমানে করে এনে প্রতিষ্ঠা করা হয়। তাই এই মন্দিরে দাঁড়ালে একসঙ্গে দেখা মেলে ভক্তি, ধ্বংস আর পুনরুত্থানের তিনটি গল্প।

দর্শন ও উৎসব

  • প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় আরতির সময় মন্দির প্রাণবন্ত থাকে; কালী পূজা (দীপাবলি) ও শারদীয় দুর্গোৎসবে এখানে বিপুল ভক্তসমাগম হয়।
  • মন্দির চত্বরে মূল গর্ভগৃহ ছাড়াও আরও উপাসনালয় আছে; দর্শনে সাধারণত ৩০–৪৫ মিনিট যথেষ্ট।
  • এটি সক্রিয় মন্দির — শালীন পোশাক, জুতা বাইরে রাখা ও গর্ভগৃহে ছবি তোলার নিয়ম মেনে চলুন।

কীভাবে যাবেন

ঠিকানা: ২০ চট্টেশ্বরী সড়ক, মেহেদীবাগ — জিইসি মোড় বা দামপাড়া থেকে রিকশা/সিএনজিতে কয়েক মিনিট। কাছেই ওয়ার সেমেট্রি ও গরীবুল্লাহ শাহের দরবার এলাকা — এক বিকেলে তিনটি ধর্মীয় ঐতিহ্য একসঙ্গে দেখা সম্ভব।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

চট্টেশ্বরী মন্দির কি শক্তিপীঠ?

হ্যাঁ — ভক্তদের বিশ্বাসে এটি বাংলার অন্যতম শক্তিপীঠ, যদিও কোন অঙ্গ পতিত হয়েছিল তা নির্দিষ্টভাবে জানা যায় না।

সব ধর্মের মানুষ কি ঢুকতে পারেন?

দর্শনার্থীরা সাধারণত চত্বর পর্যন্ত যেতে পারেন; গর্ভগৃহের নিয়ম মন্দির কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুযায়ী মানতে হয়।

কখন সবচেয়ে বেশি ভিড় হয়?

কালী পূজা ও দুর্গাপূজার দিনগুলোতে এবং মঙ্গল-শনিবারের আরতির সময়।

শেষকথা

চট্টেশ্বরী মন্দির শুধু উপাসনালয় নয় — শহরের নামকরণের কিংবদন্তি থেকে মুক্তিযুদ্ধের ক্ষত পর্যন্ত বহন করা জীবন্ত ইতিহাস। শহরের ঐতিহ্যের আরেক অধ্যায় পড়তে দেখুন লালদীঘি: চট্টগ্রামের ঐতিহ্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি। মা চট্টেশ্বরীর আশীর্বাদ সবার ওপর বর্ষিত হোক।