ফেনী জেলাটা ভ্রমণকারীদের কাছে এখন মূলত মুহুরী প্রজেক্টের জন্যই পরিচিত, কিন্তু জেলার ইতিহাসের পাতা উল্টালে পাবেন হাজার বছরের পুরনো দীঘি আর এক কিংবদন্তি কৃষক-নায়কের ভূমিরূপ। একদিনের এই রুটে শহরের কাছে দুটি ঐতিহাসিক দীঘি, আর সীমান্ত-ঘেঁষা ছাগলনাইয়ায় ‘ভাটির বাঘ’ শমসের গাজীর স্মৃতিচিহ্ন — ফেনীর অন্য একটা চেহারা দেখার গাইড এটি।
বিজয় সিংহ দীঘি: সেন আমলের স্মৃতি
ফেনী শহর থেকে মাত্র ২–৩ কিলোমিটার পশ্চিমে, সার্কিট হাউসের সামনে, বিজয় সিংহ গ্রামে ছড়িয়ে আছে প্রায় ৩৭.৫৭ একর আয়তনের বিশাল এই দীঘি (কোনো কোনো সূত্রে ৩৬.৫৭ একর)। জনশ্রুতি ও স্থানীয় ঐতিহ্যমতে, এর খননকার্য সেন বংশের প্রতিষ্ঠাতা বিজয় সেনের (একাদশ–দ্বাদশ শতক) কীর্তি — সেখান থেকেই দীঘি ও গ্রামের নাম। দীঘির চৌপাড় (উঁচু পাড়) জুড়ে সারি সারি গাছ — ১৯৯৫ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক এ. এইচ. এম. নূরুল ইসলামের উদ্যোগে এই বৃক্ষরোপণ হয়েছিল বলে জানা যায়। প্রতিদিন বিকেলে পাড়জুড়ে বসে মানুষের আড্ডা, মনে হয় উৎসবের মাঠ। সাম্প্রতিক এক পরিকল্পনায় দীঘিটিকে ইকো-ট্যুরিজম পার্ক হিসেবে গড়ে তোলার কথা ভাবছে জেলা প্রশাসন (ঢাকা পোস্ট, ২০২৫) — তবে আপাতত এখানকার সবচেয়ে বড় সম্পদ তার অকৃত্রিম, শান্ত জল-ছবিটাই। প্রবেশে কোনো টিকিট লাগে না।
বোনাস: শহরের প্রাণ রাজাঝির দীঘি
শহরের ঠিক জিরো পয়েন্টেই রাজাঝির দীঘি (১০.৩২ একর) — ফেনীর প্রাচীনতম নগর-স্মৃতি। জনশ্রুতি বলে, ৫–৭ শতক আগে ত্রিপুরার এক রাজকন্যার (‘ঝি’ অর্থাৎ কন্যা) অন্ধত্ব সারানোর মানসে এই দীঘি খনন করা হয়েছিল। ঊনবিংশ শতকে ফেনী মহকুমার সদর দপ্তর গড়ে উঠেছিল এই দীঘির পাড়েই; আজ পাড়জুড়ে সদর থানা, কোর্ট মসজিদ, অফিসার্স ক্লাব, জেলা পরিষদ শিশু পার্ক ও ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন — শহরের প্রশাসনিক প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠেছে প্রাচীন দীঘিটির চারপাশ। শেষ বিকেলে পাড়ে হাঁটাটা ফেনী-বাসের ‘শহর দেখা’র সেরা ভূমিকা।
ছাগলনাইয়া: ভাটির বাঘের দেশে
ফেনী শহর থেকে উত্তর-পূর্বে, ভারত সীমান্তের গা ঘেঁষে ছাগলনাইয়া — এখানকার নাম শুনলেই ইতিহাসপ্রেমীদের চোখে ভাসে শমসের গাজী। অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি চাকলা রোশনাবাদের এই শাসক কৃষকদের খাজনা মওকুফ করে, অনেককে বিনা খাজনায় জমি দিয়ে হয়ে উঠেছিলেন জনমনে নায়ক; ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধে তিনি পরিচিত ‘ভাটির বাঘ’ নামে — নবাব সিরাজুদ্দৌলার পর ঔপনিবেশিক শক্তির হাতে নিহত প্রথম দিকের প্রতিরোধ-নায়কদের একজন হিসেবে তাঁর নাম বলা হয়। বলা হয়, পালক পিতা জগন্নাথ সেনের স্মৃতিতে তিনি এলাকায় জগন্নাথ কালী মন্দিরও নির্মাণ করেছিলেন।
শমসের গাজীর স্মৃতিচিহ্ন যা আজও আছে
- দীঘি ও সুড়ঙ্গ পথ (শুভপুর): বাগান বাড়ির পাশে প্রায় ৪.৩৬ একর জায়গাজুড়ে দীঘি, আর তার পাশের সুড়ঙ্গ পথ — দুর্গ ও রাজধানী রক্ষার রণকৌশলের অংশ হিসেবে নির্মিত বলে ধারণা করা হয়। সুড়ঙ্গটি এখন জরাজীর্ণ, তবু এই একটি স্থাপনাই গাজীর সামরিক বুদ্ধির জীবন্ত প্রমাণ।
- গাজীর কেল্লা এলাকা (চম্পকনগর–জগন্নাথ সোনাপুর): প্রাচীন বাড়ির ধ্বংসাবশেষ ও সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ডের দিকে থাকা শমসের গাজীর দীঘি (এককুইল্লা দীঘি) — মাটি খুঁড়লেই যেখানে মেলে পুরনো ইটের টুকরো। সীমান্ত এলাকা বলে স্থানীয়দের পরামর্শ ও নির্ধারিত পথ মেনে চলুন।
- বাঁশের কেল্লা রিসোর্ট: গাজীর স্মৃতিকে কেন্দ্র করে উত্তরসূরিদের গড়া প্রায় ৫ একরের এই রিসোর্টে বাঁশের স্থাপত্য, মাচাং ঘর, লেকে নৌভ্রমণ, রেস্টুরেন্ট ও অনুষ্ঠান-আয়োজনের ব্যবস্থা আছে — ইতিহাস-দর্শনের পর পরিবার নিয়ে বিশ্রামের ভালো ঠিকানা (প্রবেশ ও সুবিধার ফি রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের নিয়ম অনুযায়ী)।
- সাত মঠ, বাঁশপাড়া: ছাগলনাইয়া বাজারের পশ্চিমে জমিদার বিনোদ বিহারীর বাড়ি ও সংলগ্ন সাতটি মঠের সমাহার — প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত এই স্থাপনা দেশে একমাত্র বলে স্থানীয়ভাবে দাবি করা হয়; প্রতিটি মঠের চূড়া ভিন্ন, গায়ে সূক্ষ্ম কারুকাজ। ১৯৪৮-এর দিকে জমিদার কলকাতা চলে যাওয়ার পর বাড়িটি পরিত্যক্ত, তবু কারুকাজ এখনো চোখে পড়ে।
- চাঁদ খাঁ মসজিদ (চাঁদগাজী): উপজেলা সদরের কাছে চাঁদগাজী বাজারে মোঘল আমলের গাজী বংশীয় চাঁদ গাজী ভুঁইঞার নামে পরিচিত প্রাচীন মসজিদ — সময় থাকলে রুটে রাখুন।
কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে বাসে (শ্যামলী, এনা, সৌদিয়াসহ বহু পরিবহন) বা ট্রেনে (মহানগর গোধূলি, তূর্ণা এক্সপ্রেস) ফেনী; ঢাকা–ফেনী বাস ভাড়া ৪৫০–৬০০ টাকা (এসি/নন-এসি ভেদে)। বিজয় সিংহ দীঘি: ট্রাংক রোড জিরো পয়েন্ট বা রেলস্টেশন থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা/রিকশায় সার্কিট হাউস রোড ধরে পৌঁছানো যায়। ছাগলনাইয়ার জন্য ফেনী শহর থেকে লোকাল বাস বা সিএনজিতে উপজেলা সদর, সেখান থেকে শুভপুর ও বাঁশপাড়ার দিকে স্থানীয় পরিবহন নিন — গাজীর দীঘি-সুড়ঙ্গ এলাকায় প্রবেশে সামান্য ফি (৫ টাকার মতো) থাকতে পারে বলে ভ্রমণ-গাইডগুলোতে উল্লেখ আছে।
থাকা ও খাওয়া
রাত কাটাতে হলে ফেনী শহরই ভরসা — বিভিন্ন মানের আবাসিক হোটেল (হোটেল মিড নাইট, গাজী ইন্টারন্যাশনাল, বিলাস, আল করিম প্রভৃতি) শহরে পাওয়া যায়। খাওয়ার জন্য শহরের রেস্তোরাঁ ও মিষ্টির দোকানই নির্ভর; ছাগলনাইয়া-শুভপুরে সাধারণ স্থানীয় হোটেল নির্ভর করতে হবে, তাই দিনের ট্রিপে শহর থেকেই সকালের নাশতা ও পানীয় গুছিয়ে নিন।
একদিনে পুরো রুটটা
সকালে ফেনী শহরে নেমে প্রথমে জিরো পয়েন্টের রাজাঝির দীঘির পাড়ে ঘণ্টাখানেক — তারপর সিএনজিতে বিজয় সিংহ দীঘি (দুপুরের আগে পৌঁছালে গাছের ছায়ায় পাড়ের হাওয়া সবচেয়ে ভালো); দুপুরের খাবার শহরে ফিরে। বিকেলের পর্বটা ছাগলনাইয়ার — বাঁশপাড়ার সাত মঠ দেখে শুভপুরের গাজীর দীঘি ও সুড়ঙ্গ, শেষ বিকেলে বাঁশের কেল্লা রিসোর্টে চা। ছাগলনাইয়ার পর্বে হাতে অন্তত ৩ ঘণ্টা রাখুন — সীমান্ত-ঘেঁষা জায়গাগুলোতে হুড়ো করে ঘোরা যায় না।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজয় সিংহ দীঘি দেখতে কতক্ষণ লাগবে?
পাড় ধরে পুরো চক্কর ও আড্ডা মিলিয়ে ১–১.৫ ঘণ্টা যথেষ্ট; রাজাঝির দীঘিসহ শহরের পর্বটা রাখলে আরও আধ ঘণ্টা।
সুড়ঙ্গ পথে কি ভেতরে ঢোকা যায়?
সুড়ঙ্গটি জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ — বাইরে থেকে দেখাই নিরাপদ। সংরক্ষিত অংশে প্রবেশের আগে স্থানীয় তত্ত্বাবধায়কের অনুমতি নিন।
ছাগলনাইয়ার সীমান্ত এলাকায় ঘোরার নিয়ম কী?
সীমান্তের কাছের জায়গাগুলোতে নির্ধারিত পথের বাইরে যাবেন না, ছবি তোলার ক্ষেত্রে বিজিবির নির্দেশনা মানুন, আর জাতীয় পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখুন।
শেষকথা
দীঘির পাড়ে সেন আমলের গল্প, সুড়ঙ্গে গাজীর প্রতিরোধ — ফেনীর এই মুখটা ধীরে ঘুরলেই ধরা দেয়। জেলার বাইরে পা বাড়ালে পড়ুন মিরসরাই ভ্রমণ গাইড — ঝর্ণা-পাহাড়ের ভিন্ন স্বাদ পাশের জেলাতেই।