• 29 Oct, 2026

মজু চৌধুরীর হাট ভ্রমণ গাইড: মেঘনার ঘাট, ইলিশের আড়ৎ আর লক্ষ্মীপুরের উপকূলীয় জীবন

মজু চৌধুরীর হাট ভ্রমণ গাইড: মেঘনার ঘাট, ইলিশের আড়ৎ আর লক্ষ্মীপুরের উপকূলীয় জীবন

লক্ষ্মীপুরের মেঘনা-পাড়ের প্রাণকেন্দ্র মজু চৌধুরীর হাটের গাইড — ১৯৬৫ সালের ঘাট-বাজার, দিনে দশ হাজারের বেশি যাত্রীর ফেরি-লঞ্চ যাতায়াত, ইলিশ-অর্থনীতি ও জেলেজীবন, রায়পুর-রামগতির ‘মিনি কক্সবাজার’ পাড় আর ভাঙনের বাস্তবতা; যাতায়াতসহ।

লক্ষ্মীপুর জেলার মানচিত্রে পশ্চিম প্রান্তে মেঘনার সঙ্গে জেলার প্রথম পরিচিতি ঘটে মজু চৌধুরীর হাটে। নিঝুম দ্বীপের মোহনা-জগতের উত্তরের এই ঘাটটা প্রকৃতির চেয়ে বেশি মানুষের গল্প বলে — ভোর থেকে রাত পর্যন্ত লঞ্চ-ফেরির হুইসেল, ইলিশের আড়তের ডাক, আর জেলেপাড়ার অবিরাম জীবন। জেলা শহর থেকে মাত্র ~১২ কিলোমিটার দূরে হলেও, এখানে দাঁড়ালে লক্ষ্মীপুরের আসল চরিত্র — মেঘনানির্ভর জীবিকা — চোখে পড়ে এক নজরে।

নাম ও ইতিহাস

হাটটির নাম শাকচর ইউনিয়নের চৌধুরী পরিবারের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব মজু চৌধুরীর নামে — পানা মিয়া হাজীর পুত্র মজু চৌধুরী রহমতখালি এলাকায় এসে শতাধিক জমি কিনে এখানে প্রতিষ্ঠিত হন; স্বাধীনতার আগেই, ১৯৬৫ সালের দিকে তাঁর নামে ঘাট-বাজারটি পরিচিতি পায় (বাংলা উইকিপিডিয়া)। আজ প্রশাসনিকভাবে এটি সদর উপজেলার চর রমণী মোহন ইউনিয়নের অংশ — এলাকায় কোস্টগার্ড ক্যাম্প ও নদী পুলিশের উপস্থিতি ঘাটটির কৌশলগত গুরুত্বেরই প্রমাণ।

ঘাটের দিনরাত: দক্ষিণ-পূর্বের নৌ-সংযোগ

বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, এই ঘাট দিয়ে দিনে দশ হাজারের বেশি যাত্রী যাতায়াত করেন — দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশের অন্যতম ব্যস্ত নৌ-সংযোগকেন্দ্র। জাতীয় মহাসড়ক এন-৮০৯ এখানে মেঘনায় এসে থামে; ফেরি ও লঞ্চে নদী পেরুলেই ওপারে ভোলার ইলিশা ঘাট — লঞ্চে প্রায় দুই ঘণ্টার পথ (ভাড়া ~২০০ টাকা, স্পিডবোটে ৩৫০–৪০০ টাকা — ভ্রমণকারীদের অভিজ্ঞতাভিত্তিক, যাত্রার আগে ঘাটে মিলিয়ে নিন)। বরিশাল–চট্টগ্রাম যাতায়াতে অনেকেই এই পথকে সংক্ষিপ্ত বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করেন। ঘাটসংলগ্ন রহমতখালি খালের মুখের দুটি স্লুইসগেট বাংলাপিডিয়ায় পর্যটন আকর্ষণ হিসেবেই তালিকাভুক্ত — বিকেলে এখানে দাঁড়িয়ে নদী দেখতে জেলাসদর থেকেও শত শত মানুষ আসেন (অবজারভার)।

ইলিশের রাজ্যে

লক্ষ্মীপুরের মেঘনা-অঞ্চল দেশের অন্যতম সমৃদ্ধ ইলিশ-ক্ষেত্র — মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাব (২০২৫) অনুযায়ী জেলায় বছরে গড়ে ২০,০০০ মেট্রিক টনের বেশি ইলিশ উৎপাদিত হয়, আর জেলায় নিবন্ধিত জেলে পঞ্চাশ হাজারের ওপরে; চট্টগ্রাম ও সাস্টের গবেষকদের ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’-এ প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, সবচেয়ে সুস্বাদু ও পুষ্টিসমৃদ্ধ ইলিশের বড় অংশ আসে এই মেঘনা মোহনা থেকেই। মজু চৌধুরীর হাটের ঘাট-আড়তেই ভোরে উঠে সেই ইলিশের পাইকারি নাটক — ঝুড়ি ঝুড়ি রূপালি মাছ, দর-কষাকষি, তারপর ট্রাকে ঢাকা-চট্টগ্রামের পথে। দর্শনার্থীদের জন্য পরামর্শ: মা ইলিশ রক্ষার নিষেধাজ্ঞা-কালে (সাধারণত অক্টোবরে ~২২ দিন) নদী শান্ত থাকে — যেমন ২০২৬ সালের নিষেধাজ্ঞা শেষ হচ্ছে ২৯ অক্টোবর মধ্যরাতে, তারপরই ঘাটে জেলেদের উৎসবের মতো প্রস্তুতি (ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস)। নিষেধাজ্ঞা মানা জেলেদের প্রতি সম্মান রেখে ঘুরুন, নদীতে নামার আয়োজন দেখাটাই এখানকার সেরা ‘শো’।

মেঘনার অন্য পাড়গুলো

  • রায়পুরের আলতাফ মাস্টার ঘাট ও সাজু মোল্লার ঘাট (চরবংশী): উপজেলা সদর থেকে ~১৪ কিলোমিটার; সরকারি ছুটি ও ঈদে বিশাল জলরাশির সামনে ভিড় জমে।
  • রামগতির চর আলেকজান্ডার: উপজেলা ভবন থেকে একশ গজ গেলেই নদীর পাড়; জোয়ার-ভাটার সঙ্গে বদলানো চর, পালতোলা নৌকা, আর মহিষের দইয়ের খ্যাতি।
  • ‘মিনি কক্সবাজার’: বাসসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে — জেলায় ভালো বিনোদনকেন্দ্র না থাকায় ছুটির দিনে মেঘনার এই পাড়গুলো যেন মিনি কক্সবাজারে রূপ নেয়; পরিবার নিয়ে বিকেলের আড্ডার জন্য ঘাট-পাড়ই লক্ষ্মীপুরবাসীর প্রথম পছন্দ।

জেলেপল্লীর জীবনযাত্রা

ঘাটটা শুধু মজু চৌধুরীর নয় — পুরো উপকূলজুড়ে মেঘনার পাড়ে ছড়িয়ে জেলেপল্লী: সদরের বুড়িরঘাট, কমলনগরের মতিরহাট ও নাছিরগঞ্জ, রায়পুরের পুরান বেড়ির মাথা (একাত্তর টিভি/বাসস প্রতিবেদন)। প্রতিটা পল্লীর ছন্দ একই — রাতে জাল ফেলা, ভোরে আড়তে মাছ, দিনে জাল বোনা আর নৌকা মেরামত। ঋতুচক্রে এই ছন্দ বদলায়: ইলিশের মৌসুমে উৎসব, ঝাটকা-মা ইলিশ নিষেধাজ্ঞার সময়ে ভিজিএফ চালের লাইন আর অপেক্ষা। নদী পুলিশের মজু চৌধুরীর হাট ফাঁড়ি আর কোস্টগার্ডের টহল এই উপকূলে নিয়মিত — সংরক্ষণ-অভিযানকালে (যেমন সদ্য শেষ হওয়া অভিযানে) জব্দ ইলিশ এতিমখানায় বিতরণের মতো ঘটনাও ঘটে (বাংলা ট্রিবিউন, অক্টোবর ২০২৬)।

ঘাটে অর্ধেক দিনের পরিকল্পনা

ভোর ৫:৩০–৭:৩০ — আড়তের সবচেয়ে জীবন্ত সময়; তাজা ইলিশ নিলাম দেখুন, চাইলে বিশ্বস্ত আড়তদারের মাধ্যমে কেজি দরে মাছ কিনে বরফ-প্যাক করান। সকাল ৮–১০ — রহমতখালি খালের পাড় ধরে হাঁটুন, স্লুইসগেটের ওপর দিয়ে নদীর বিস্তার দেখুন, চাইলে ইলিশাগামী লঞ্চে উঠে ওপারের চর-দৃশ্য দেখে পরের লঞ্চে ফিরুন (সময় মিলিয়ে নিন আগেই)। বিকেলের বিকল্প — সূর্যাস্তের সময় স্লুইসগেট-এলাকায় ফিরুন; পথে পড়বে লক্ষ্মীপুরের বিখ্যাত সুপারি-নারকেল বাগান আর দেশের শীর্ষ সয়াবিন-উৎপাদক জেলার সবুজ মাঠ (গবেষণা-সূত্রে)। নৌযান বাছাইয়ে সতর্কতা: যাত্রীবাহী লঞ্চ/ফেরিই বেছে নিন — অতীতে এই রুটের অনিরাপদ নৌযান নিয়ে প্রতিবেদন হয়েছে (ডেইলি স্টার), ঝড়ো আবহাওয়ায় মেঘনা পাড়ি দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।

ভাঙনের ছায়া

সৌন্দর্যের পাশে কঠিন সত্যটাও জানা দরকার — এই ঘাটগুলোর প্রায় সবকটিই অব্যাহত নদীভাঙনের মুখে (বাসস)। পাড় বদলায়, ঘাট সরে, জেলেপাড়া ঘর হারায়। ভ্রমণে গেলে ভাঙন-ঝুঁকির জায়গায় সতর্ক থাকুন, অস্থায়ী খাড়া পাড়ের কিনারে দাঁড়াবেন না, আর স্থানীয়দের এই সংগ্রামের গল্পটুকু শুনলে ভ্রমণটা শুধু ছবিতে আটকে থাকবে না।

কীভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে লক্ষ্মীপুরের সরাসরি বাস চলে (সায়েদাবাদ/আব্দুল্লাহপুর থেকে, ভাড়া ও সময় বাসভেদে বদলায়) — জেলা শহর থেকে অটো/সিএনজিতে ১২ কিলোমিটার পশ্চিমে মজু চৌধুরীর হাট; ভোলা দিক থেকে এলে ইলিশা ঘাট থেকে লঞ্চে সরাসরি। চট্টগ্রাম দিক থেকে স্থলপথে লক্ষ্মীপুর (চৌমুহনী–মাইজদি হয়ে) এসে একই পথ। ঘাট-কেন্দ্রিক ভ্রমণের সেরা সময় ভোর (আড়তের ব্যস্ততা) কিংবা শেষ বিকেল (স্লুইসগেটে সূর্যাস্ত); জোয়ার-ভাটা ও আবহাওয়া দেখে নৌকা ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নিন, লাইফজ্যাকেট ছাড়া নৌকায় উঠবেন না।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

ঘাটে সেরা কী দেখার আছে?

ভোরের ইলিশ-আড়ৎ আর স্লুইসগেট থেকে মেঘনার বিকেল — দুটোই। হাতে সময় থাকলে লঞ্চে ইলিশা ঘুরে ফিরে আসাটাও অভিজ্ঞতা।

মজু চৌধুরীর হাট থেকে ভোলা যাওয়া যায়?

হ্যাঁ — ফেরি ও লঞ্চে ইলিশা ঘাট (ভোলা) সরাসরি; সময়সূচি ঋতুভেদে বদলায়, ঘাটে পৌঁছে যাচাই করুন।

এটা কি নিরাপদ পর্যটন জায়গা?

দিনের বেলা ঘাট-এলাকা ব্যস্ত ও জনবহুল; তবু নদীভ্রমণে আবহাওয়া-সতর্কতা ও ভাঙন-পাড়ের ঝুঁকি মাথায় রাখুন।

শেষকথা

মেঘনার এই একই জলে এক পাড়ে লক্ষ্মীপুরের ঘাট-জীবন, অন্য দিকে ভাটির দ্বীপজগৎ — দুই অভিজ্ঞতা এক সফরে জুড়তে পড়ুন হাতিয়া দ্বীপ ভ্রমণ গাইড।