• 31 Oct, 2026

হিলি স্থলবন্দর ও বিরামপুর ভ্রমণ গাইড — হাকিমপুরের সীমান্ত বন্দরের ইতিহাস (১৯৪৭-এর বিভাজন, ১৯৮৬ শুল্ক স্টেশন, ২০০৭ বেসরকারি পরিচালনা), ২০২৫ সালে ফের শুরু হওয়া রপ্তানি এবং বিরামপুর হয়ে যাওয়ার তথ্য।

দিনাজপুর শহর থেকে প্রায় ৭১ কিলোমিটার দক্ষিণে, হাকিমপুর উপজেলায় হিলি স্থলবন্দর — দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থলবন্দর (বাসস)। কিন্তু হিলির আসল গল্প বাণিজ্যের আগে বিভাজনের: ১৯৪৭ সালে একটি গ্রামই কাঁটাতারের দুই পাশে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। এই পোস্টে সেই সীমান্তের ইতিহাস ও আজকের রূপ, আর যাতায়াতের ঘাঁটি বিরামপুরের কথা।

দ্বিখণ্ডিত হিলি: একটি গ্রাম, দুটি দেশ

১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগের সময় হিলি গ্রামটি দ্বিখণ্ডিত হয় — পূর্ব অংশ পড়ে পাকিস্তানে (আজকের বাংলাদেশে), পশ্চিম অংশ ভারতে (বাংলা উইকিপিডিয়া)। ওপারেও নাম হিলিই, পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলায়, বালুরঘাটের দিকে (বাংলা উইকিপিডিয়া/আদার ব্যাপারী)। সীমান্তের দুই পাশে একই নামের গ্রাম, একই ভাষা, মাঝখানে শুধু আন্তর্জাতিক সীমানা — বাংলাদেশের হাতেগোনা এমন জায়গার একটি হিলি।

শুল্ক স্টেশন থেকে পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দর

ধাপে ধাপে গড়ে উঠেছে আজকের বন্দর: ১৯৮৫–৮৬ সালে হিলি শুল্ক স্টেশন প্রতিষ্ঠা পায় ভারত-বাংলাদেশ আমদানি-রপ্তানির জন্য; ১৯৯৬ সালে পূর্ণাঙ্গ শুল্ক স্টেশন ঘোষিত হয় (বাংলা/ইংরেজি উইকিপিডিয়া)। ডেইলি স্টারের তথ্যে, ২০০২ সালের জানুয়ারিতে স্থলবন্দর ঘোষণা হয়; ২০০৫ সালে বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ পানামা হিলি পোর্ট লিঙ্ক লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি করে এবং ২০০৭ সালের নভেম্বরে প্রতিষ্ঠানটি ২৫ বছরের ইজারায় পরিচালনা শুরু করে (ডেইলি স্টার/উইকিপিডিয়া)। শুরুতে মাত্র ১০ একরের কমপ্লেক্স পরে বেড়ে ২২ একর হয়েছে; কর্মকর্তাদের দাবি, দৈনিক প্রায় ২,০০০ টন আমদানি পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা আছে (ডেইলি স্টার)।

বাণিজ্যের চিত্র: আমদানিনির্ভর, রপ্তানি ফিরছে

হিলি মূলত আমদানিনির্ভর বন্দর — আমদানি-রপ্তানির অনুপাতে প্রায় ৭০ শতাংশই আমদানি (বাসস)। ভারত থেকে আসে চাল, পেঁয়াজ, পাথর (হার্ড রক), ফলমূল ও রাসায়নিক; ২০২০–২১ অর্থবছরে আমদানি ছিল ২১ লাখ টনের বেশি (ডেইলি স্টার/স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ)। উল্লেখযোগ্য খবর: দীর্ঘদিন রপ্তানি বন্ধ থাকার পর ২০২৫ সালের জুন থেকে এই বন্দর দিয়ে আবার ভারতে পণ্য রপ্তানি শুরু হয়েছে — রাইস ব্র্যান (তুষের তেল), টোস্ট বিস্কুট, ম্যাংগো জুস, ঝুট কাপড়, নুডলসসহ বেকারি পণ্য যাচ্ছে; জুন থেকে ২০ আগস্ট ২০২৫ পর্যন্ত রপ্তানি হয়েছে ২,০৯১ টন পণ্য, আয় প্রায় ১৭ লাখ ডলার (বাসস, আগস্ট ২০২৫)। সৎ সীমাবদ্ধতাও আছে: সব ধরনের পণ্য হিলি দিয়ে আনা যায় না — যেমন গাড়ির যন্ত্রাংশের জন্য অনেক ব্যবসায়ীকে আজও বেনাপোল ঘুরতে হয়, আর বন্দরের পূর্ণ সম্ভাবনা এখনও কাজে লাগেনি বলে ২০২২ সালেও মূল্যায়ন করেছে ডেইলি স্টার।

বিরামপুর: বন্দরের ঘাঁটি-শহর

হিলির পাশের উপজেলা শহর বিরামপুর — বন্দর-যাত্রী ও ব্যবসায়ীদের খাওয়া-থাকার বাস্তব ঘাঁটি। বিরামপুরের আরও একটি পরিচয়: আশুরার বিলের পূর্বাংশ এই উপজেলায় পড়ে, আর এখান থেকে অটো-ভ্যানে মিনিট বিশেকে নবাবগঞ্জ জাতীয় উদ্যান ও স্বপ্নপুরী এলাকায় পৌঁছানো যায় (উইকিভ্রমণ/আমার হাওর)। অর্থাৎ দক্ষিণ দিনাজপুরের সার্কিট — হিলি সীমান্ত, বিরামপুর, আশুরার বিল, স্বপ্নপুরী — এক ঘাঁটি থেকেই ঘোরা যায়। দিনাজপুর জেলার বাকি অংশ দেখতে হলে উত্তরের লিচু-কান্তজিউ সার্কিট আলাদা দিনে রাখুন।

ভ্রমণকারীর জন্য: সীমান্ত দেখার নিয়ম

হিলি পর্যটনকেন্দ্র নয়, কর্মরত সীমান্ত বন্দর — এটি আগেই মনে রাখুন। বন্দর এলাকা ও চেকপোস্টে অনুমতি ছাড়া ছবি তোলা যাবে না; ট্রাক-কাস্টমসের এলাকায় সাধারণ দর্শনার্থীর প্রবেশ সীমিত। সীমান্তের পরিবেশ দেখতে চাইলে বন্দরের বাইরের জনপথ থেকে দেখুন, বিজিবি-বিএসএফ পোস্টের নিয়ম মানুন, স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা অনুসরণ করুন। ভিসা-পাসপোর্ট ছাড়া যাত্রী পারাপারের কোনো সুযোগ নেই — হিলি দিয়ে সাধারণ যাত্রী যাতায়াত হয় না, এটি মূলত পণ্যবাহী বন্দর।

ভ্রমণ তথ্য

দিনাজপুর শহর থেকে সড়কপথে ~৭১ কিমি (ডেইলি স্টার)। যাওয়ার পথ: দিনাজপুর/ফুলবাড়ী থেকে বাসে বিরামপুর, সেখান থেকে হিলি। কাছাকাছি দেখার জায়গা মিলিয়ে একদিনের ছন্দ: সকালে হিলি সীমান্ত এলাকা (বাইরে থেকে), দুপুরে বিরামপুর, বিকেলে আশুরার বিলের কাঠের সেতু। বন্দর এলাকায় গরম ও ধুলো বেশি — সকালটা বেছে নিন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

হিলি স্থলবন্দর কোথায়?

দিনাজপুরের হাকিমপুর উপজেলায়, ভারতের দক্ষিণ দিনাজপুরের হিলির বিপরীতে (উইকিপিডিয়া)।

হিলি কেন "দ্বিখণ্ডিত গ্রাম"?

১৯৪৭ সালের দেশভাগে গ্রামটির পূর্বাংশ পাকিস্তানে ও পশ্চিমাংশ ভারতে পড়ে (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

হিলি দেশের কততম বড় স্থলবন্দর?

দ্বিতীয় বৃহত্তম (বাসস)।

হিলি দিয়ে যাত্রী ভারত যাওয়া যায়?

না — এটি পণ্যবাহী বন্দর; সাধারণ যাত্রী পারাপার হয় না।

রপ্তানি কি হচ্ছে হিলি দিয়ে?

দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৫ সালের জুন থেকে আবার শুরু হয়েছে (বাসস)।

শেষকথা

ট্রাকের সারি আর কাস্টমসের ব্যস্ততার মাঝেও হিলি দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে — যে গ্রাম একদিন এক ছিল। সীমান্ত ভ্রমণে এই উপলব্ধিটাই হিলির আসল পাওনা। দিনাজপুর জেলার পাঁচটি পোস্ট এখানেই শেষ — দক্ষিণের বন্দর থেকে উত্তরের লিচু বাগান পর্যন্ত, এই জেলা উত্তরের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় গন্তব্যগুলোর একটি।