বাংলাদেশে খুব কম শহরের জন্ম এমন নাটকীয় — পুরনো শহরটিকে আড়িয়াল খাঁ নদ গিলে খাচ্ছিল বলে একেবারে নতুন জায়গায় শহর বানানো হলো, আর সেই শহরের মাটি জোগাতে খনন করা দীঘিটাই হয়ে উঠল শহরের প্রাণ: মাদারীপুরের শকুনি লেক। প্রতিবেশী গোপালগঞ্জ থেকে একদিনে ঘুরে আসা যায় এই হ্রদ-শহর।
শাহ মাদারের নামে মাদারীপুর
জেলার নামকরণ সুফি সাধক হযরত বদিউদ্দিন জিন্দা শাহ মাদারের নামে — চতুর্দশ শতকে তিনি এই অঞ্চলে ইসলাম প্রচারে এসেছিলেন বলে জানা যায় (টুরিস্ট প্লেসেস)। আড়িয়াল খাঁ নদীর পাড়ে তাঁর দরগাহ শরীফ জেলার সবচেয়ে বেশি দর্শন করা স্মৃতিস্থান; পাশে মসজিদ ও মাদরাসা (টুরিস্ট প্লেসেস)। এই জেলার মাটিতে আরেক ঐতিহাসিক অধ্যায় — ফরায়েজি আন্দোলন: এর নেতা হাজী শরীয়তুল্লাহর (১৭৮১–১৮৪০) বাড়ি এই জেলার বাহাদুরপুরে, আন্দোলনের কেন্দ্রভূমি ছিল মাদারীপুর অঞ্চল (টুরিস্ট প্লেসেস)। মাদারীপুর মহকুমা হয় ১৮৫৪ সালে, জেলা হয় ১৯৮৪ সালে (টুরিস্ট প্লেসেস)।
শকুনি লেক: যে দীঘির মাটিতে শহর
প্রমত্তা আড়িয়াল খাঁর ভাঙনে পুরনো শহর বিলীন হওয়ার মুখে ১৯৪৩ সালে দক্ষিণে নতুন শহর স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়; শকুনি এলাকার মাটি কেটে শহরের ভিত উঁচু করা হয় — আর সেই খননেই জন্ম নেয় বিশাল এই কৃত্রিম দীঘি (বাংলা উইকিপিডিয়া/ডেইলি স্টার আর্কাইভ)। তটভূমিসহ আয়তন ১,০১,১৭২ বর্গমিটার — দৈর্ঘ্য ৪৮৬ মিটার, প্রস্থ ১৯৮ মিটার, প্রায় ২০ একর (বাংলা উইকিপিডিয়া)। স্থানীয় শ্রমিকের অভাবে বিহার ও উড়িষ্যা থেকে আনা হয়েছিল প্রায় ২,০০০ শ্রমিক, নয় মাসে খনন শেষ হয় (বাংলা উইকিপিডিয়া)। মাঝের দশকগুলোতে লেকটি অবহেলা ও দখলে ভুগলেও (ডেইলি স্টার, ২০০৪) ২০১৩ সালে পৌরসভা প্রায় ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে এর সৌন্দর্যবর্ধন করে: শহীদ কানন, শিশু পার্ক, স্বাধীনতা অঙ্গন, এমপি থিয়েটার মঞ্চ, শান্তি ঘাটলা, কৃত্রিম ঝর্ণা আর "মাদারীপুর ঘড়ি" নামের ওয়াচ টাওয়ার (বাংলা উইকিপিডিয়া/ভ্রমণট্রিপস)। লেকের উত্তর পাড়ে মাদারীপুর জাদুঘর (বাংলা উইকিপিডিয়া)। আজ ঈদ-ছুটিতে এই লেকপাড়েই শহরের সবচেয়ে বড় ভিড় জমে (টাইমস অব বাংলাদেশ, ২০২৬)। শহরের বুকে বড় জলাশয় ঘিরে জীবন — এই অভিজ্ঞতায় এর সবচেয়ে কাছের তুলনা কুমিল্লার ধর্মসাগর।
আরও যা দেখবেন
শহর থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে চরমুগরিয়া — প্রাচীন নদীবন্দর, আজ যা পরিচিত মুক্তভাবে ঘুরে বেড়ানো বানরের অভয়ারণ্য হিসেবে; বানরগুলো নির্ভয়ে পথে-ঘাটে ঘোরে, স্থানীয়রা খাবারও দেয় (আলোনলি ট্রাভেলার/উইকিভ্রমণ)। বানরকে খাওয়াতে গিয়ে বিরক্ত করবেন না, প্লাস্টিকের প্যাকেট ফেলবেন না। লেক থেকে আড়িয়াল খাঁ নদীর ওপরের সেতু (আসমত আলী খান সেতু — আদারব্যাপারী) পর্যন্ত সন্ধ্যার হাঁটাটাও উপভোগ্য। জেলার অন্যত্র ছড়িয়ে আছে মিঠাপুর জমিদার বাড়ি, রাজারাম মন্দির (খালিয়া), আলগী কাজি বাড়ি মসজিদ — সময় থাকলে তালিকায় রাখা যায় (উইকিভ্রমণ)।
যাতায়াত
ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে সড়কপথে মাদারীপুর এখন সহজ গন্তব্য (দূরত্ব প্রায় ১০০ কিলোমিটার); সদরঘাট থেকে লঞ্চপথেও মাদারীপুর যাতায়াত চলে (উইকিভ্রমণ)। শহরে রেল যোগাযোগ নেই। শকুনি লেক শহরের একদম প্রাণকেন্দ্রে — ডিসি অফিস, সার্কিট হাউসসহ প্রশাসনিক এলাকার পাশে বলে এলাকাটি নিরাপদ ও প্রাণবন্ত (আদারব্যাপারী)। লেকে টিকিট কেটে মাছ ধরার ব্যবস্থাও আছে (ভ্রমণট্রিপস)।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
শকুনি লেক কবে, কেন খনন করা হয়?
১৯৪৩ সালে — আড়িয়াল খাঁর ভাঙনে ধ্বংসপ্রায় পুরনো শহর সরিয়ে নতুন শহর গড়ার মাটির জন্য (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
লেকটি কত বড়?
দৈর্ঘ্য ৪৮৬ মিটার, প্রস্থ ১৯৮ মিটার — তটসহ প্রায় ২০ একর (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
মাদারীপুর নাম এলো কার নামে?
সুফি সাধক হযরত বদিউদ্দিন জিন্দা শাহ মাদারের নামে (টুরিস্ট প্লেসেস)।
চরমুগরিয়ায় কী আছে?
প্রাচীন বন্দর এলাকা ও মুক্ত বানরের অভয়ারণ্য, শহর থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার (আলোনলি ট্রাভেলার)।
ঢাকা থেকে কীভাবে যাবেন?
পদ্মা সেতু হয়ে বাসে, অথবা সদরঘাট থেকে লঞ্চে (উইকিভ্রমণ)।
শেষকথা
মাদারীপুরের গল্পটা টিকে থাকার — নদী শহর খেয়ে ফেলল, মানুষ মাটি কেটে হ্রদ বানিয়ে তার চারপাশে আবার শহর গড়ল। বিকেলে শকুনি লেকের পাড়ে বসে ওয়াচ টাওয়ারের ঘড়ির দিকে তাকালেই এই শহরের ছন্দটা ধরা যায়।