ঢাকা থেকে মাত্র প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে হয়েও শরীয়তপুর এতদিন ছিল অনেকটা পথের বাইরে — পদ্মা সেতু সেই দূরত্ব মুছে দিয়েছে। সেতুর দক্ষিণ প্রান্ত জাজিরা এই জেলাতেই। সেই সুবাদে এখন আবিষ্কারের অপেক্ষায় আছে কীর্তিনাশা নদীর তীরের এই ছোট শান্ত শহর — নড়িয়ার সুরেশ্বর দরবার ভ্রমণের ভিত্তি হিসেবেও এটি সেরা।
পালং থেকে শরীয়তপুর
জেলা সদরের পুরনো নাম পালং — শব্দটি নিয়ে এক মত বলে, এটি একটি মারমা শব্দ, অর্থ গ্রাম বা লোকালয় (বাংলাকোষ)। এই অঞ্চল ছিল বৃহত্তর বিক্রমপুর ও প্রাচীন ইদিলপুর পরগনার অংশ; পরে মাদারীপুর মহকুমার অন্তর্গত পালং থানা। ফরায়েজি আন্দোলনের নেতা ও সমাজসংস্কারক হাজী শরীয়তউল্লাহর (১৭৮১–১৮৪০) নামে নামকরণ করে ১৯৭৭ সালের ৩ নভেম্বর এটিকে মহকুমা করা হয়, আর ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ শরীয়তপুর পূর্ণ জেলার মর্যাদা পায় (জেলা প্রশাসনের প্রোফাইল/বাংলাকোষ)। জেলার আয়তন প্রায় ১,১৮২ বর্গকিলোমিটার, উপজেলা ছয়টি (৬৪ জেলার ভ্রমণ)। পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯০ সালে — শহরটি আজও ছোট ও শান্ত স্বভাবের (টপ১০প্লেস)। জেলার বিখ্যাত সন্তানদের তালিকায় আছেন গীতিকার অতুলপ্রসাদ সেন, ঔপন্যাসিক আবু ইসহাক ও ফুটবলার গোষ্ঠ পাল (সববাংলায়)।
কীর্তিনাশা: যে নদীর নামেই সাবধানবাণী
শহর ও জেলার জীবন গড়ে উঠেছে নদী ঘিরে — পদ্মা, মেঘনা, পালং, জয়ন্তী, আর সবচেয়ে চরিত্রবহুল কীর্তিনাশা। নামের অর্থই "কীর্তি ধ্বংসকারী" — ভাঙনের জন্য কুখ্যাত এই নদী শতাব্দী ধরে ঘরবাড়ি-জনপদ গিলে খেয়ে আবার চর জাগিয়েছে (বাংলাকোষ)। জেলার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা চর ও নিচু জমি, বর্ষায় অনেকাংশ ডুবে থাকে (৬৪ জেলার ভ্রমণ) — এই জল-মাটির সঙ্গে বোঝাপড়া করেই এখানকার মানুষের সংস্কৃতি। নদীর পাড়ে দাঁড়ালে পদ্মার চরাঞ্চলের আসল রূপটা দেখা যায়। প্রতিবেশী মাদারীপুরের গল্পের সঙ্গেও মিল আছে — সেখানেও নদীভাঙন শহরকে নতুন করে গড়েছে।
শহরে ও আশপাশে যা দেখবেন
শহরটি ছোট — রিকশায় এক বেলায় ঘুরে ফেলা যায়: কীর্তিনাশা-পালং নদীর ঘাট, পৌর এলাকার বাজার ও প্রশাসনিক প্রাঙ্গণ। জেলাজুড়ে ছড়ানো আকর্ষণগুলোর মধ্যে শহরের কাছে রুদ্রকর মঠ (সদর উপজেলা) ও মহিষার দীঘি; নড়িয়ার দিকে ফতেহজংপুর দুর্গ (মোঘল আমলের বলে কথিত) ও সুরেশ্বর দরবার; ভেদরগঞ্জ-ডামুড্যার পথে হাতুরিয়া ও কার্তিকপুর জমিদার বাড়ি (টপ১০প্লেস/ডিইউ স্পিচ)। আর জেলার সবচেয়ে বড় আধুনিক আকর্ষণ — জাজিরায় পদ্মা সেতুর দক্ষিণ প্রান্ত ও সার্ভিস এলাকা: সেতু পেরিয়ে নামলেই প্রথম যে জনপদ, সেটাই শরীয়তপুরের (৬৪ জেলার ভ্রমণ)। খাবারে স্থানীয় গর্ব — কালোজিরা ফুলের মধু, যা দেশজুড়ে সমাদৃত (সববাংলায়/জেলা প্রোফাইল); পাট, ধান, পেঁয়াজ ও মরিচের এই জেলায় বাজারের তাজা কৃষিপণ্যও ভ্রমণের অংশ।
যাতায়াত
ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে বাসে সরাসরি শরীয়তপুর — সেতু চালুর (২০২২) পর থেকে এটিই প্রধান পথ; জাজিরা প্রান্ত থেকে শহর কাছেই। শহরে রেলপথ নেই; ভেতরের যাতায়াতে রিকশা-ইজিবাইক। বর্ষায় চরাঞ্চলে গেলে নদীর অবস্থা জেনে যান, আর ভাঙনপ্রবণ পাড়ে সতর্ক থাকুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
শরীয়তপুর নাম এলো কার নামে?
ফরায়েজি আন্দোলনের নেতা হাজী শরীয়তউল্লাহর নামে (জেলা প্রোফাইল)।
জেলাটি কবে গঠিত হয়?
মহকুমা ১৯৭৭ সালে; পূর্ণ জেলা ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ (বাংলাকোষ)।
শহরের পুরনো নাম কী?
পালং — জেলা সদর একসময় পালং নামে পরিচিত ছিল (বাংলাকোষ)।
পদ্মা সেতুর কোন প্রান্ত এই জেলায়?
দক্ষিণ প্রান্ত — জাজিরা উপজেলায় (৬৪ জেলার ভ্রমণ)।
এলাকার বিখ্যাত পণ্য কী?
কালোজিরা ফুলের মধু (সববাংলায়)।
শেষকথা
শরীয়তপুর পর্যটন-মানচিত্রে নতুন নাম — কিন্তু ইতিহাসে পুরনো: ফরায়েজির ভূমি, নদীভাঙনের সঙ্গে লড়াই করা মানুষ আর পদ্মা সেতুর প্রবেশদ্বার। সেতু পেরিয়ে একটা দিন এখানে কাটালে দক্ষিণের যাত্রাটা শুধু পথ পেরোনো থেকে হয়ে উঠবে অভিজ্ঞতা।