• 30 Oct, 2026

উত্তরা গণভবন (দিঘাপতিয়া রাজবাড়ি) ভ্রমণ গাইড — ১৭৩৪ সালে দয়ারাম রায়ের প্রতিষ্ঠা, ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পের পর প্রমদানাথ রায়ের পুনর্নির্মাণ, ফ্লোরেন্সের ঘড়ি, ইতালীয় উদ্যান ও দর্শনার্থীদের জন্য বাস্তব তথ্য।

নাটোর শহর থেকে মাত্র দুই-তিন কিলোমিটার উত্তরে, উঁচু প্রাচীর আর পরিখার আড়ালে বসে আছে উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে সুসংরক্ষিত রাজপ্রাসাদ — দিঘাপতিয়া রাজবাড়ি, বর্তমান নামে উত্তরা গণভবন। এটি কেবল জমিদারবাড়ি নয়: ১৯৭২ সাল থেকে এটি প্রধানমন্ত্রীর উত্তরাঞ্চলীয় সরকারি বাসভবন। একই দিনে শহরের নাটোর রাজবাড়ি দেখে এখানে এলে নাটোরের দুই রাজবংশের গল্প একসূত্রে গাঁথা হয়ে যায়।

দয়ারাম রায় ও দিঘাপতিয়া বংশ

বংশের প্রতিষ্ঠাতা দয়ারাম রায় ছিলেন নাটোরের রাজা রামজীবনের বিশ্বস্ত দেওয়ান। ১৭১৬ সালে তিনি রামজীবনের সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে বিদ্রোহী ভূষণা-জমিদার রাজা সীতারাম রায়কে পরাজিত করতে ভূমিকা রাখেন (ডেইলি এশিয়ান এজ)। দান হিসেবে পাওয়া জমিতে ১৭৩৪ সালে তিনি দিঘাপতিয়া জমিদারির ও প্রাসাদের গোড়াপত্তন করেন (ডেইলি এশিয়ান এজ/লোকাল গাইডস)। পরের দুই শতকে এই বংশের রাজারা শাসন করেন এই অঞ্চল; বংশের রাজকন্যা ইন্দুপ্রভা দেবী ছিলেন কবি — তাঁর কবিতা, দিনলিপি ও চিঠিপত্র আজ সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত (লোকাল গাইডস)। ১৮৯৭ সালের জুনে নাটোরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের অধিবেশন বসে, আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও (নিউইনফোবিডি)।

১৮৯৭-এর ভূমিকম্প ও প্রমদানাথের পুনর্নির্মাণ

অধিবেশনের শেষ দিন, ১২ জুন ১৮৯৭ — প্রায় ১৮ মিনিট স্থায়ী ভয়াবহ ভূমিকম্পে প্রাসাদটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় (ডেইলি এশিয়ান এজ)। বংশের ষষ্ঠ রাজা প্রমদানাথ রায় বিদেশি বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী, শিল্পী ও স্থানীয় কারিগরদের দিয়ে ১৮৯৭ থেকে ১৯০৮ — ১১ বছর ধরে পুরো কমপ্লেক্স নতুন করে গড়েন (ডেইলি এশিয়ান এজ/নিউইনফোবিডি)। প্রায় ৪১.৫ একর জমিতে মূল প্রাসাদ, কুমার প্যালেস, প্রধান কাছারি ভবন, তিনটি রানীর বাড়ি, খাজাঞ্জিখানা, সেন্ট্রি বক্সসহ ১২টি ভবন (লোকাল গাইডস)। আকর্ষণগুলোর মধ্যে সেরা: প্রধান ফটকের ওপরে ফ্লোরেন্স, ইতালি থেকে আনা বিশাল ঘড়ি — আজও সঠিক সময় দেয়, ঘণ্টাধ্বনি শোনা যায় বহুদূর থেকে (লোকাল গাইডস/মনেররঙ); প্রাসাদের দক্ষিণে ইতালীয় উদ্যান — শ্বেতপাথরের গ্রিক-ধাঁচের ভাস্কর্য আর দেশি-বিদেশি দুর্লভ গাছের সংগ্রহ; প্রধান ভবনের সামনে ছয়টি কামান (দুটি ব্রিটিশ-নির্মিত, ১৮৫৪ সালের); আর উত্তর পাশে রাজার নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের চিহ্ন, যা দিয়ে একসময় প্রাসাদ আলোকিত হতো (লোকাল গাইডস)।

গভর্নর হাউস থেকে উত্তরা গণভবন

১৯৪৭-এ দেশভাগের পর শেষ রাজা প্রতিভানাথ রায় কলকাতা চলে যান; ১৯৫০-এ জমিদারি বিলুপ্ত হয়। ১৯৬৭ সালের ২৪ জুলাই পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আবদুল মোনেম খান এটিকে গভর্নর হাউস হিসেবে উদ্বোধন করেন (ডেইলি এশিয়ান এজ/নিউইনফোবিডি)। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এখানে মন্ত্রিসভার বৈঠক করে প্রাসাদটির নাম দেন "উত্তরা গণভবন" — প্রধানমন্ত্রীর উত্তরাঞ্চলীয় সরকারি বাসভবন (নিউইনফোবিডি)।

দর্শনার্থীর বাস্তবতা

স্পষ্ট করে বলা দরকার: এটি একটি সক্রিয় সরকারি বাসভবন ও উচ্চ-নিরাপত্তার এলাকা — সাধারণ দর্শনার্থীর প্রবেশ সবসময় খোলা থাকে না; জেলা প্রশাসনের অনুমতি বা তৎকালীন ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে ভেতরে ঢোকা যায় কি না, আর মূল ভবনটির ভেতরভাগ প্রায়শই তালাবদ্ধ থাকে (ভ্রমণ-অভিজ্ঞতার বর্ণনায়ও এর প্রমাণ মেলে)। কোনো কোনো ভ্রমণ-তথ্যে নির্দিষ্ট সময়-টিকিটের কথা থাকলেও ব্যবস্থা বদলায় — যাওয়ার আগে নাটোর জেলা প্রশাসন বা স্থানীয় পর্যটন তথ্য থেকে সর্বশেষ অবস্থা জেনে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। অনুমতি না মিললেও প্রাচীর-পরিখা ঘেরা সবুজ চত্বর ও প্রধান ফটকের ফ্লোরেন্সের ঘড়ি বাইরে থেকে দেখা যায়, আর একই দিনের নাটোর রাজবাড়ি (জনসাধারণের জন্য খোলা উদ্যান) ভ্রমণটা পূর্ণ করে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

দিঘাপতিয়া রাজবাড়ি কে প্রতিষ্ঠা করেন?

দেওয়ান দয়ারাম রায়, ১৭৩৪ সালে (ডেইলি এশিয়ান এজ)।

বর্তমান প্রাসাদটি কে গড়েন?

ষষ্ঠ রাজা প্রমদানাথ রায় — ১৮৯৭-এর ভূমিকম্পের পর ১৮৯৭–১৯০৮ সালে পুনর্নির্মাণ করেন (ডেইলি এশিয়ান এজ)।

"উত্তরা গণভবন" নাম কে দেন, কবে?

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ১৯৭২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি (নিউইনফোবিডি)।

ফ্লোরেন্সের ঘড়ি কোথায়?

প্রধান ফটকের ওপরে — আজও চলে, ঘণ্টা বহুদূর থেকে শোনা যায় (লোকাল গাইডস)।

পর্যটক কি ভেতরে ঢুকতে পারে?

এটি প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন — প্রবেশ অনুমতি-নির্ভর ও সীমিত; আগে খোঁজ নিন।

শেষকথা

উত্তরা গণভবন বাংলাদেশের বিরল প্রাসাদগুলোর একটি, যেখানে জমিদারি ইতিহাস আর রাষ্ট্রীয় বর্তমান একই প্রাচীরের ভেতরে বাস করে। দেখা হোক বা ফটক থেকে ফেরা — ফ্লোরেন্সের ঘড়ির ঘণ্টাধ্বনি শুনলেই সফরটা সার্থক।