ঢাকার এত কাছে এত বড় জলাভূমি থাকা সত্ত্বেও আড়িয়ল বিল অনেকের কাছেই অচেনা। মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলায় পদ্মা ও ধলেশ্বরী নদীর মাঝখানে ছড়িয়ে থাকা এই বিল দেশের তৃতীয় বৃহত্তম জলাভূমি এবং মধ্যাঞ্চলের সবচেয়ে বড় ও প্রাচীন বিল (বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ড/বাংলা উইকিপিডিয়া)। বর্ষায় এটি দেখতে অকূল জলরাশি, আবার শীতে একই জায়গা বিস্তীর্ণ সবুজ ফসলের মাঠ — এক ঠিকানায় দুটি সম্পূর্ণ আলাদা ভ্রমণ। মুন্সীগঞ্জের ঐতিহ্য-ভ্রমণে সোনারং জোড়া মঠের সঙ্গে দিনের বাকি অর্ধেকটা এখানে কাটানো যায়।
১৩৬ বর্গকিলোমিটারের অবভূমি
বিলটির আয়তন প্রায় ১৩৬ বর্গকিলোমিটার (দৈর্ঘ্যে সর্বোচ্চ ২৬ কিমি, প্রস্থে ১২ কিমি) — শ্রীনগর ও সিরাজদিখান ছাড়াও ঢাকার দোহার-নবাবগঞ্জ পর্যন্ত এর বিস্তার, তবে সিংহভাগ মুন্সীগঞ্জে (ভ্রমণগাইড/বাংলা উইকিপিডিয়া)। ধারণা করা হয়, প্রাচীনকালে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের মিলিত প্রবাহের পথ শুকিয়ে এই অবভূমির সৃষ্টি (ভ্রমণগাইড)। বিলের ভেতরে ছোট-বড় অসংখ্য পুকুর ও খাল (স্থানীয় নাম "দেঙ্গা") — সাগরদিঘি সবচেয়ে বড়, লালদিঘি দ্বিতীয় (বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ড)। শুষ্ক মৌসুমেও বিলের বেশিরভাগ অংশ আর্দ্র থাকে ও পানি জমে থাকে (বাংলা উইকিপিডিয়া)। এটি বহু প্রজাতির মাছের প্রজননক্ষেত্র; বিখ্যাত মাছের মধ্যে বোয়াল, চিতল, গজার ও কৈ (পর্যটন বোর্ড)। পরিবেশবিদ ও স্থানীয়দের দীর্ঘ আন্দোলনের ফলে পরিকল্পিত নানা প্রকল্প থেকে বিলটি বারবার রক্ষা পেয়েছে।
দুই ঋতু, দুই রূপ
বর্ষা (জুন–অক্টোবর): পানিতে টইটুম্বুর বিল তখন সাগরসম — পালতোলা নৌকা, শাপলা আর কচুরিপানার ফুল, জেলেদের মাছ ধরা (বাংলা উইকিপিডিয়া/ভ্রমণগাইড)। নৌকা ভাড়া করে সারা দিন ঘোরাটাই এই মৌসুমের আসল আনন্দ; শাপলা-বিলের এই আবহ বরিশালের সাতলা শাপলা গ্রামের কথা মনে করিয়ে দেয়। শীত (নভেম্বর–ফেব্রুয়ারি): পানি নামলে বিলজুড়ে শীতের সবজি, মাঠে মাঠে সরষে ফুলের হলুদ, আর এই বিলের সবচেয়ে খ্যাতনামা ফসল — বিশাল আকৃতির মিষ্টিকুমড়া, কোনো কোনোটির ওজন দুই মণেরও বেশি হয় (আদার ব্যাপারী)। শীতের ভোরে খাবারের খোঁজে আসে নানা জাতের অতিথি পাখি (পর্যটন বোর্ড)। শীতে শুকিয়ে যাওয়া খাল দিয়ে গুণ টেনে কুমড়া-বোঝাই নৌকা আনার দৃশ্য এখন বাংলাদেশে বিরল — আড়িয়ল বিলে তা এখনো দেখা যায় (আদার ব্যাপারী)।
যাতায়াত ও ঘাটের তথ্য
ঢাকা থেকে বিলের দূরত্ব প্রায় ৪২ কিলোমিটার (বাংলা উইকিপিডিয়া)। গুলিস্তান থেকে বাসে শ্রীনগর বাজার, সেখান থেকে রিকশায় গাদিঘাট — বিলের মূল প্রবেশঘাট; পথে পড়বে শ্যামসিদ্ধি গ্রাম (ভ্রমণগাইড/পর্যটন বোর্ড)। গাদিঘাট থেকে হাতে-টানা বা ইঞ্জিনচালিত নৌকা দরদাম করে ঘণ্টা বা সারাদিনের জন্য ভাড়া করা যায় (ভ্রমণগাইড — ভাড়া মৌসুমভেদে বদলায়, আগের অঙ্কের গাইডের ওপর ভরসা না করে ঘাটে দর করুন)। ফেরার পথে দেখে নিতে পারেন শ্যামসিদ্ধি মঠ — বাংলা শিলালিপি অনুযায়ী ১৮৩৬ সালে ধনাঢ্য শম্ভুনাথ মজুমদারের নির্মাণ (আদার ব্যাপারী)। সকালে রওনা দিলে সন্ধ্যার মধ্যে ঢাকায় ফেরা যায়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
আড়িয়ল বিল কত বড়?
প্রায় ১৩৬ বর্গকিলোমিটার — দেশের তৃতীয় বৃহত্তম জলাভূমি (পর্যটন বোর্ড/বাংলা উইকিপিডিয়া)।
কোন ঋতুতে যাওয়া ভালো?
নৌকা ও শাপলার জন্য বর্ষা; সরষে, কুমড়ো ও পাখির জন্য শীত — দুই ঋতুর অভিজ্ঞতা আলাদা।
বিলে ঢোকার ঘাট কোনটি?
শ্রীনগর বাজার থেকে গাদিঘাট — সেখান থেকে নৌকা ছাড়ে (ভ্রমণগাইড)।
বিলের বিখ্যাত ফসল কোনটি?
বিশাল আকৃতির মিষ্টিকুমড়া — কোনো কোনোটি দুই মণের বেশি ওজনের (আদার ব্যাপারী)।
ঢাকা থেকে একদিনে ঘুরে আসা যায়?
হ্যাঁ — প্রায় ৪২ কিলোমিটার; সকালে গিয়ে সন্ধ্যায় ফেরা যায় (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
শেষকথা
হাওরের বিশালত্ব উপভোগ করতে যাদের সুনামগঞ্জ যাওয়া হয় না, তাদের জন্য আড়িয়ল বিল ঢাকার দোরগোড়ায় সেই স্বাদের প্রায় পুরোটাই দিয়ে দেয়। বর্ষার এক সকালে গাদিঘাটের নৌকায় উঠে পড়ুন — দিগন্তজোড়া পানির মাঝে শহরের কোলাহল মুছে যাবে মিনিটের মধ্যে।