বরগুনা জেলা শহর পায়রা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রাণবন্ত বন্দর-শহর — দক্ষিণের উপকূলীয় এই জেলার প্রশাসনিক সদর, বাণিজ্য কেন্দ্র এবং হরিণঘাটা-সোনাকাটা-কুয়াকাটামুখী সব সফরের প্রাকৃতিক ঘাঁটি। ছয় উপজেলার এই জেলার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর; অর্থনীতির প্রাণ ধানক্ষেত আর মাছের ঘাট (আদার ব্যাপারী)। এই শহরেই রাত কাটিয়ে ভোরে উপজেলাগুলোর পথে বেরোনো দক্ষিণ ভ্রমণের সবচেয়ে সুবিধাজনক ছক। আর জেলার সবচেয়ে বড় ঐতিহ্য — বেতাগীতে সাড়ে তিনশ বছরের পুরনো বিবিচিনি শাহী মসজিদ — এই শহর থেকেই এক সফরে দেখে আসা যায়।
সিডরের পরেও দাঁড়িয়ে থাকা শহর
বরগুনার সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ছাপ ঘূর্ণিঝড় সিডর — ২০০৭ সালের সেই প্রলয়ংকরী ঝড়ে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলা ছিল বরগুনা (আদার ব্যাপারী)। সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়ানো শহরটিতে আজ লঞ্চঘাটের ভিড়, মাছের আড়তের হইচই আর বাজারের প্রাণচাঞ্চল্যই প্রধান দৃশ্য। পায়রা তীরের লঞ্চঘাট থেকে ভোরে-সন্ধ্যায় নদীর জীবনযাত্রা দেখা শহর ভ্রমণের সহজ আনন্দ; শহরের কেন্দ্রে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকাটি স্থানীয়দের আড্ডা-বিশ্রামের জায়গা (দেশ আমার)। শহর থেকে দিনের সফরে যাওয়া যায় জেলার খ্যাতনামা জায়গাগুলোতে — পাথরঘাটার হরিণঘাটা ইকোপার্ক আর তালতলীর সোনাকাটা ইকোপার্ক দুটোই এই শহরকে ঘাঁটি করেই সবচেয়ে সুবিধাজনক।
বিবিচিনি শাহী মসজিদ: ১৬৫৯ সালের একগম্বুজ স্থাপনা
বরগুনা শহর থেকে বেতাগী উপজেলা হয়ে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে বিবিচিনি গ্রামে, একটি ছোট টিলার ওপর দাঁড়িয়ে আছে জেলার প্রাচীনতম মসজিদটি (বাংলা উইকিপিডিয়া/বাসস)। একাধিক সূত্রের বিবরণ অনুযায়ী, পারস্য থেকে আগত ইসলাম প্রচারক হযরত শাহ নেয়ামত উল্লাহ তৎকালীন বাংলার সুবেদার শাহ সুজার অনুরোধে ১৬৫৯ সালে এই একগম্বুজ মসজিদটি নির্মাণ করেন; তাঁর কন্যা চিনি বিবির নামানুসারেই গ্রামের নাম "বিবিচিনি" (শিক্ষক বাতায়ন/পর্যটন বিচিত্রা)। স্থাপত্যের হিসাবটি লক্ষণীয়: মসজিদটি দৈর্ঘ্য-প্রস্থে ৩৩ ফুট করে, উচ্চতায়ও প্রায় ততটাই, দেয়াল প্রায় ৬ ফুট পুরু, তিনটি প্রবেশপথ — খিলানকাঠামোয় নির্মিত মোগল আমলের ইটের কাজ আজও চেনা যায় (বাংলা উইকিপিডিয়া)। শাহ নেয়ামত উল্লাহর মৃত্যু হয় ১৭০০ সালে; মসজিদের পাশে থাকা দীর্ঘ কবরগুলো আজ বিলীন হওয়ার পথে (একই সূত্র)। সংরক্ষণের ধারাটাও নথিভুক্ত: ১৯৮৫ সালে বেতাগী উপজেলা প্রশাসন প্রথম সংস্কার করে; ১৯৯২ সালে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ মসজিদটির দায়িত্ব নিয়ে এটিকে প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান হিসেবে তালিকাভুক্ত করে (বাংলা উইকিপিডিয়া)। সাম্প্রতিক বছরেও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে মসজিদটির প্রতি মনোযোগ দেখা গেছে — বাসসের প্রতিবেদনে পররাষ্ট্র উপদেষ্টার মসজিদ পরিদর্শন ও সংরক্ষণে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাসের কথা এসেছে।
কীভাবে যাবেন, কোথায় থাকবেন ও টিপস
ঢাকা সদরঘাট থেকে লঞ্চে সরাসরি বরগুনা যাওয়া যায় — ভ্রমণগাইডের হিসাবে ডেক ভাড়া প্রায় ৩৫০–৫০০ টাকা, সিঙ্গেল কেবিন ১,২০০–১,৫০০ টাকা (বর্তমান ভাড়া যাচাই করুন); সড়কপথে পদ্মা সেতু হয়ে বাসেও আসা যায়। বরগুনা শহরে ভালো মানের বেশ কয়েকটি আবাসিক হোটেল ও সরকারি রেস্ট হাউস আছে (ভ্রমণগাইড) — জেলার অন্যান্য গন্তব্যের তুলনায় থাকা-খাওয়ার সুবিধা এখানেই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য। বিবিচিনির জন্য: বরগুনা বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে/মোটরসাইকেলে বেতাগী সদর, সেখান থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার মোটরসাইকেল/রিকশায় বিবিচিনি (বিউটিফুল বাংলাদেশ, পর্যটন কর্পোরেশন)। টিপস: মসজিদটি সক্রিয় উপাসনালয় ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান — ভেতরে প্রবেশে শালীনতা ও নামাজের সময়ের ব্যাপারে স্থানীয়দের নির্দেশনা মানুন; টিলার ওপরের চারপাশের গাছপালা-ঘেরা পরিবেশে ছবি তোলার সেরা সময় সকালের আলো; একই দিনে হরিণঘাটা বা সোনাকাটার সঙ্গে জোড়া দিলে বরগুনা সফর পূর্ণাঙ্গ হয়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বরগুনা শহর কোন নদীর তীরে?
পায়রা নদীর তীরে — জেলা সদর ও লঞ্চবন্দর শহর (দেশ আমার)।
বিবিচিনি মসজিদ কে, কবে নির্মাণ করেন?
পারস্য থেকে আগত হযরত শাহ নেয়ামত উল্লাহ শাহ সুজার অনুরোধে ১৬৫৯ সালে মসজিদটি নির্মাণ করেন (শিক্ষক বাতায়ন/বাংলা উইকিপিডিয়া)।
মসজিদটির নাম "বিবিচিনি" কেন?
শাহ নেয়ামত উল্লাহর কন্যা চিনি বিবির নামানুসারে গ্রামের নাম বিবিচিনি, আর সেই গ্রামের মসজিদ বলেই এই নাম (পর্যটন বিচিত্রা)।
মসজিদটির স্থাপত্যের বিশেষত্ব কী?
একগম্বুজ, ৩৩ ফুট × ৩৩ ফুট, প্রায় ৬ ফুট পুরু দেয়াল ও তিনটি প্রবেশপথ — মোগল আমলের ইটের খিলানকাঠামো (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
বরগুনা থেকে আর কোথায় যাওয়া যায়?
পাথরঘাটার হরিণঘাটা, তালতলীর সোনাকাটা ও শুভসন্ধ্যা সৈকত, পাশাপাশি কুয়াকাটা — সবই দিনের সফরে সম্ভব।
শেষকথা
বরগুনা শহর হয়তো গন্তব্য হিসেবে কম পরিচিত, কিন্তু এই শহরই দক্ষিণ উপকূলের দরজা — সিডরের ক্ষত পেরিয়ে ওঠা জনপদ, পায়রার ঘাটের জীবন আর সাড়ে তিনশ বছরের মসজিদের নীরব মহিমা মিলিয়ে এখানে থামাটা যেকোনো দক্ষিণ সফরের প্রাপ্য অংশ।