বরগুনার তালতলী উপজেলার সোনাকাটা ইউনিয়নে, বঙ্গোপসাগরের তীরে দাঁড়িয়ে আছে টেংরাগিরি — সুন্দরবনের পর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্বাসমূলীয় (ম্যানগ্রোভ) বন (বাংলা উইকিপিডিয়া/প্রথম আলো)। স্থানীয়দের কাছে এই বনের পরিচিত নাম ফাতরার বন — কুয়াকাটা থেকে নৌপথে যাওয়া ফাতরার চর আসলে এই একই বনবলয়ের অংশ। এই সংরক্ষিত বনের সখিনা বিটেই গড়ে তোলা হয়েছে সোনাকাটা ইকোপার্ক, আর বনের দক্ষিণ প্রান্তে বিস্তৃত ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ নির্জন সোনাকাটা সৈকত।
১৯৬০-এর সংরক্ষিত বন, ২০১০-এর অভয়ারণ্য
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা এই বন অতীতে সুন্দরবনেরই অংশ ছিল; ১৯৬০ সালের ১২ জুলাই টেংরাগিরিকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষণা করা হয় — মোট সংরক্ষিত এলাকা প্রায় ১৩,৬৩৪ একর (প্রথম আলো/ডেইলি স্টার)। পরবর্তীতে ২০১০ সালের ২৪ অক্টোবর বনের ৪,০৪৮.৫৮ হেক্টর এলাকা ঘোষিত হয় টেংরাগিরি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে (বাংলা উইকিপিডিয়া)। বনের প্রধান গাছ কেওড়া, গরান, গেওয়া ও ওড়া; এছাড়া সিংরা, হেতালসহ নানা শ্বাসমূলীয় প্রজাতি, মিঠাপানির পুকুর আর ছোট ছোট খাল মিলিয়ে সমৃদ্ধ বাস্তুতন্ত্র (আদার ব্যাপারী)। বনটি শকুনের নিরাপদ এলাকা হিসেবেও ঘোষিত (ভ্রমণপ্রিয়)। বন্য অবস্থায় হরিণ, বানর, বন্য শুকরসহ নানা প্রাণীর দেখা মেলে খাল-পাড়ে। এই একই উপকূলীয় বনবলয়ের পশ্চিমের প্রতিবেশী পাথরঘাটার হরিণঘাটা — দুটি মিলিয়ে তালতলী-পাথরঘাটা উপকূলে একটি পূর্ণাঙ্গ ম্যানগ্রোভ সফর সাজানো যায়।
ইকোপার্ক ও চার কিলোমিটারের সৈকত
বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ইকো-ট্যুরিজম কর্মসূচির আওতায় ২০১০-১১ ও ২০১১-১২ অর্থবছরে প্রায় ২.৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে সখিনা বিটের ৬৩৪ একর এলাকাজুড়ে গড়ে তোলা হয় সোনাকাটা ইকোপার্ক — পিকনিক স্পট, খালের ওপর ১৬টি কাঠের সেতু, নলকূপ, বিশ্রামাগার ও সাড়ে চার কিলোমিটার ইটের রাস্তা (ভয়েস সেভেন নিউজ/ডেইলি স্টার)। শুরুতে ইকোপার্কে কুমির প্রজনন কেন্দ্রসহ আবদ্ধ প্রাণীর সংগ্রহও ছিল — হরিণ, বানর, অজগর, কুমির প্রভৃতি (ভ্রমণপ্রিয়)। বনের ভেতর দিয়ে দক্ষিণে এগিয়ে গেলেই সোনাকাটা সমুদ্র সৈকত — প্রায় ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ, যেখানে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দুটোই দেখা যায়; ট্রলারে করে বনের খাল ও সাগরের ঢেউ উপভোগের ব্যবস্থাও আছে (আদার ব্যাপারী)। তালতলী উপজেলা সদর থেকে ইকোপার্কের দূরত্ব প্রায় ২৪ কিলোমিটার (আদার ব্যাপারী)।
বাস্তব অবস্থা ও প্রাণের সতর্কতা
হরিণঘাটার মতোই এখানেও সৎ চিত্রটা জানা জরুরি। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এক দশকের বেশি সময়ে ইকোপার্কে দৃশ্যমান সংস্কার হয়নি — ভাঙা রাস্তা ও ক্ষতিগ্রস্ত সেতুর কারণে পর্যটকদের আগ্রহ কমেছে (ভয়েস সেভেন নিউজ)। ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সালেই ওয়াকওয়ের কাঠের সেতুগুলোর স্লিপার খসে পড়েছিল; একই বছর জলোচ্ছ্বাসে হরিণের ঘেরের প্রাচীর ভেঙে কয়েকটি হরিণ বনে পালিয়ে যায় (ডেইলি স্টার, ২০১৭)। পরের বছরগুলোতে তহবিল সংকটে আবদ্ধ প্রাণীদের খাবার জোগানোই কঠিন হয়ে পড়ে — শুরুতে প্রায় ২০০টি প্রাণী থাকলেও পরে অবশিষ্ট ছিল মুষ্টিমেয় হরিণ ও কুমির (ডেইলি স্টার)। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা: ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী এক পর্যটক কুমিরের ঘেরের আট ফুট উঁচু প্রাচীর টপকে ভেতরে হাত ঢোকাতে গিয়ে কুমিরের আক্রমণে প্রাণ হারান — কোনো অবস্থাতেই ঘেরের প্রাচীর টপকানো বা বেড়া পেরিয়ে প্রাণীর কাছে যাওয়া যাবে না; শিশুদের সর্বক্ষণ নজরে রাখুন। বনের ওপর কাঠচোরদের চাপের কথাও পুরনো প্রতিবেদনে এসেছে (প্রথম আলো, ২০১৪) — অভয়ারণ্যের নিয়ম মেনে চলুন, বন বিভাগের অনুমতি ছাড়া গভীর বনে ঢুকবেন না। মোদ্দাকথা: এখানে আসুন বন আর সৈকতের জন্য; ইকোপার্কের কৃত্রিম সুবিধার ওপর ভরসা করে পরিকল্পনা করবেন না।
কীভাবে যাবেন ও টিপস
ঢাকা থেকে লঞ্চে/বাসে বরগুনা, সেখান থেকে তালতলী; তালতলী সদর থেকে স্থানীয় যানে (মোটরসাইকেল/অটো) সোনাকাটা ইকোপার্ক প্রায় ২৪ কিলোমিটার (আদার ব্যাপারী)। কুয়াকাটা থেকেও তালতলী হয়ে আসা যায় — দুটো গন্তব্য এক সফরে জোড়া দেওয়া সুবিধাজনক। টিপস: সৈকতের জন্য ভাটার সময় সূর্যোদয়/সূর্যাস্ত মিলিয়ে যান; খাবার-পানি সঙ্গে রাখুন; সেতুগুলোর অবস্থা দেখে সতর্কভাবে চলুন, ক্ষতিগ্রস্ত সেতু এড়িয়ে চলুন; কুমিরের ঘের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন — এটি আবশ্যিক, ঐচ্ছিক নয়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
টেংরাগিরি বন কত বড়?
সংরক্ষিত বনাঞ্চল প্রায় ১৩,৬৩৪ একর; এর মধ্যে ৪,০৪৮.৫৮ হেক্টর বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য (২০১০) — সুন্দরবনের পর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন (প্রথম আলো/বাংলা উইকিপিডিয়া)।
সোনাকাটা ইকোপার্কে কী কী আছে?
পিকনিক স্পট, খালের ওপর কাঠের সেতু, বিশ্রামাগার, কুমির প্রজনন কেন্দ্র এবং বনের প্রান্তে ৪ কিমি দীর্ঘ সোনাকাটা সৈকত (ভয়েস সেভেন/আদার ব্যাপারী) — তবে সুবিধাগুলোর অনেকটাই এখন জরাজীর্ণ।
ফাতরার বনের সঙ্গে সম্পর্ক কী?
টেংরাগিরিরই স্থানীয় নাম ফাতরার বন — কুয়াকাটা-পাশের ফাতরার চর এই একই বনবলয়ের অংশ (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
কুমির নিয়ে সতর্কতা কেন?
ইকোপার্কের কুমির ঘেরে প্রাচীর টপকাতে গিয়ে এক পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনা রিপোর্ট হয়েছে (ডেইলি স্টার) — ঘেরের সীমানা কোনোভাবেই অতিক্রম করবেন না।
তালতলী থেকে কত দূর?
প্রায় ২৪ কিলোমিটার (আদার ব্যাপারী); বরগুনা শহর থেকে তালতলী হয়ে আসতে হয়।
শেষকথা
সোনাকাটা-টেংরাগিরি সেই গন্তব্য, যেখানে প্রকৃতি এখনো রাজকীয় — শুধু মানুষের গড়া সুবিধাগুলোই হেরে যাচ্ছে সময় আর অবহেলার কাছে। চার কিলোমিটার নির্জন সৈকতে সূর্যাস্ত আর প্রাচীন ম্যানগ্রোভের নীরবতা সেই ক্ষতিপূরণ দিয়েই দেয়; শর্ত একটাই — চোখ-কান খোলা রেখে, নিরাপত্তা মেনে ঘুরতে হবে।