• 31 Oct, 2026

যশোরের শার্শায় একই সফরে দুই জগৎ — বেনাপোল-পেট্রাপোল এশিয়ার বৃহত্তম স্থলবন্দর করিডোর (স্থলবাণিজ্যের এক-তৃতীয়াংশ, বছরে ২২ লাখ যাত্রী), আর পাশের কাশিপুর গ্রামে ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭১-এর বয়রা যুদ্ধের বীর বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের সমাধি ও বার্ষিক শ্রদ্ধা-অনুষ্ঠান।

যশোর শহর থেকে যশোর রোড ধরে পশ্চিমে গেলেই সীমান্ত-শহর বেনাপোল — বাংলাদেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর, যার ওপারে ভারতের পেট্রাপোল। আর এই বন্দর-শহরের পাশের কাশিপুর গ্রামে ঘুমিয়ে আছেন সাত বীরশ্রেষ্ঠের একজন, নূর মোহাম্মদ শেখ — যাঁর যুদ্ধক্ষেত্র ছিল এই সীমান্তের মাটিই। এক দিনের এই সফরে তাই মিলে যায় দুই অভিজ্ঞতা: চলমান বাণিজ্যের হৃদস্পন্দন, আর সেই বাণিজ্যপথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা নীরব শ্রদ্ধার ঠিকানা। পথে পড়বে গদখালীর ফুলের বাজারও — ভোরে বের হলে তিনটিই এক রুটে সাজানো যায়।

বেনাপোল-পেট্রাপোল: এশিয়ার বৃহত্তম স্থলবন্দর করিডোর

বণিক বার্তার প্রতিবেদন অনুযায়ী বেনাপোল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় স্থলবন্দর, ওপারের পেট্রাপোলকে বলা হয় এশিয়ার সবচেয়ে বড় স্থলবন্দর — দুটো মিলে এশিয়ার বৃহত্তম স্থলবন্দর করিডোর। দুই দেশের মোট স্থলবাণিজ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ সম্পাদিত হয় এই করিডোর দিয়ে; আমদানি হয় সুতি কাপড়, যানবাহনের চেসিস, কাঁচা তুলা, ইস্পাত ও রাসায়নিক, রপ্তানি হয় তৈরি পোশাক, পাটের সুতাসহ নানা পণ্য। শুধু পণ্য নয় — সমন্বিত চেকপোস্ট দিয়ে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২২ লাখ যাত্রী যাতায়াত করেন; সাম্প্রতিক হিসাবে দৈনিক ৩–৪ হাজার যাত্রী পারাপার হয়, যাঁদের বড় অংশ চিকিৎসা ও ব্যবসার কাজে ভারত যান। ঢাকা থেকে এখানকার দূরত্ব ~২৪০ কিলোমিটার, কলকাতা থেকে মাত্র ~৮০ কিলোমিটার — এই ভূগোলই বেনাপোলের গুরুত্বের কারণ। রেল যোগাযোগও পুরনো: ২৪ বছর বন্ধ থাকার পর ২০০১ সালে পেট্রাপোল-বেনাপোল রেল সংযোগ পুনরায় চালু হয়, ২০১৭ সালে শুরু হয় খুলনা-কলকাতা বন্ধন এক্সপ্রেস (বর্তমান সময়সূচি যাত্রার আগে যাচাই করে নেওয়া জরুরি)। একটি বাস্তব খেয়াল: দুই দেশের ছুটির ক্যালেন্ডার মিলে গেলে পণ্য-পরিবহন এক সপ্তাহের বেশি বন্ধ থাকার নজিরও আছে (যেমন ২০২৬ সালের অক্টোবরে ছুটির অধিক্রমণে আট দিনের স্থগিতাদেশ) — সীমান্তে ভিড় বা স্থবিরতা এড়াতে তারিখ দেখে যাওয়া বুদ্ধিমানের।

দর্শনার্থীর বাস্তবতা: বন্দরে কী দেখা যায়

সৎ তথ্য আগেই: বেনাপোল বন্দর ও চেকপোস্ট নিরাপত্তা-সংবেদনশীল কর্মক্ষেত্র — পর্যটকের জন্য সাজানো দর্শনীয় স্থান এখানে নেই, আর যাত্রী না হলে ভেতরের এলাকায় ঢোকা সাধারণত সম্ভব নয়। তাহলে দেখবেন কী? চেকপোস্টের বাইরে থেকে সীমান্ত-শহরের অনন্য ছন্দটা — সারিবাঁধা ট্রাকের কিলোমিটারজুড়ে অপেক্ষা, কুলি-শ্রমিক-দালাল-ব্যবসায়ীর মুখর বাজার, দুই দেশের পতাকার দিকনির্দেশ আর দূর থেকে সীমান্ত-রেখার দৃশ্য। বিশেষ জাতীয় দিবসগুলোতে এখানে বিজিবি-বিএসএফের যৌথ সীমান্ত অনুষ্ঠান (পতাকা অবনমন অনুষ্ঠান) অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে — সেই দিনগুলোতে গেলে অভিজ্ঞতাটা অন্যরকম হয়। বেনাপোলের কাছেই স্থানীয়দের কাছে পরিচিত হরিদাস ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত পাতবাড়ি আশ্রম — প্রবেশপথের "সিদ্ধ গাছ" তমাল-মধুমঞ্জরি ভক্তদের কাছে আকর্ষণের (ভ্রমণ-বর্ণনাভিত্তিক তথ্য)। সব মিলিয়ে বেনাপোল পর্যটন মানে এখানে "দৃশ্য" নয়, একটি সীমান্ত-অর্থনীতিকে কাছ থেকে পড়া।

কাশিপুর: বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের সমাধি

বেনাপোলের পাশের শার্শা উপজেলার কাশিপুর গ্রামে অবস্থিত বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের সমাধি। তাঁর জন্ম ১৯৩৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি নড়াইলের মহিষখোলা গ্রামে (বর্তমান নাম নূর মোহাম্মদ নগর) — জন্মভূমির স্মৃতি-কমপ্লেক্স সেখানেই; কিন্তু তাঁর যুদ্ধ ও মৃত্যু এই যশোর সীমান্তে, সমাধিও এখানে। ১৯৫৯ সালে তদানীন্তন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসে (বর্তমান বিজিবি) যোগ দিয়ে দিনাজপুর সীমান্তে দায়িত্ব শেষে ১৯৭০ সালে তিনি যশোর সেক্টরে বদলি হন, পদোন্নতি পান ল্যান্স নায়েকে। মুক্তিযুদ্ধে ৮ নম্বর সেক্টরে ক্যাপ্টেন নাজমুল হুদার নেতৃত্বে কাশিপুর সীমান্তের বয়রা এলাকায় তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে একের পর এক যুদ্ধে অংশ নেন।

৫ সেপ্টেম্বরের যুদ্ধ: কাঁধে আহত সহযোদ্ধা, হাতে এলএমজি

১৯৭১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর গোয়ালহাটি-ছুটিপুর এলাকায় পাকবাহিনীর অতর্কিত আক্রমণে ঘেরাও হয়ে পড়ে নূর মোহাম্মদের টহল দল। সহযোদ্ধা নান্নু মিয়া গুরুতর আহত হলে তিনি তাঁকে কাঁধে তুলে নিয়ে এক হাতে লাইট মেশিনগান চালিয়ে এগিয়ে যান; মর্টারের আঘাতে নিজে গুরুতর আহত হয়েও তিনি গুলি চালিয়ে যান, যাতে তাঁর দলের সদস্যরা নিরাপদে পিছু হটতে পারে — সেই আড়াল-যুদ্ধেই তিনি শহীদ হন (বাসস ও টিবিএসের বার্ষিক প্রতিবেদনসমূহে এই বিবরণ ধারাবাহিকভাবে এসেছে)। মরদেহ উদ্ধার করে কাশিপুরে দাফন করা হয়। সর্বোচ্চ সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ভূষিত হন "বীরশ্রেষ্ঠ" খেতাবে। সমাধিস্থলটি শুধু স্মৃতি নয়, জীবন্ত রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধার জায়গা: প্রতি বছর ৫ সেপ্টেম্বর বিজিবির যশোর ব্যাটালিয়ন এখানে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও গার্ড অব অনার প্রদান করে (বাসস, সেপ্টেম্বর ২০২৫) — ওই দিনে গেলে অনুষ্ঠানটি দেখার সুযোগ মেলে; অন্য সময়ে জায়গাটি শান্ত, গ্রামীণ পরিবেশে একটি সংযত স্মৃতিস্তম্ভ। দর্শনে পোশাক ও আচরণে সংযম রাখা এবং ছবি তোলায় স্থানীয় পরিবেশের প্রতি সম্মান দেখানো আবশ্যক।

কীভাবে যাবেন ও কী খেয়াল রাখবেন

যশোর শহর থেকে বেনাপোল বাসে প্রায় ৩০ কিলোমিটারের পথ (যশোর রোড) — পথে গদখালী। বেনাপোল শহর থেকে কাশিপুরের সমাধি স্থানীয় যানে (ইজিবাইক/ভ্যান) অল্প পথ; বন্দর এলাকার যে কোনো স্থানীয়ই পথ চেনে। সীমান্ত এলাকায় পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখুন এবং ছবি তোলার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাহিনীর নির্দেশনা মানুন — চেকপোস্ট ও সীমান্ত-স্থাপনার ছবি না তোলাই নিরাপদ। অন্য দেশে যাওয়ার পরিকল্পনা না থাকলে বেনাপোল এক দিনেই ঘুরে যশোরে ফেরা যায়; থাকার দরকার হলে বেনাপোল শহরে সাধারণ মানের হোটেল আছে, যশোর শহরে বিকল্প বেশি।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

বেনাপোল কি দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর?

হ্যাঁ — ওপারের পেট্রাপোলসহ এই করিডোর এশিয়ার বৃহত্তম স্থলবন্দর করিডোর হিসেবে পরিচিত; দুই দেশের স্থলবাণিজ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এখান দিয়ে হয় (বণিক বার্তা)।

পর্যটক হিসেবে বন্দরের ভেতরে ঢোকা যাবে?

সাধারণত না — চেকপোস্ট ও বন্দর এলাকা যাত্রী ও অনুমোদিত ব্যক্তিদের জন্য। দর্শনার্থীর অভিজ্ঞতা বাইরের সীমান্ত-শহর ও অনুমোদিত এলাকা থেকে।

নূর মোহাম্মদ শেখের সমাধি কোথায়?

শার্শা উপজেলার কাশিপুর গ্রামে — বেনাপোলের কাছে। তাঁর জন্মভূমি ও স্মৃতি-কমপ্লেক্স নড়াইলের নূর মোহাম্মদ নগরে।

তিনি কোন সেক্টরে, কোথায় শহীদ হন?

৮ নম্বর সেক্টরে; ১৯৭১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর গোয়ালহাটি-ছুটিপুরের (বয়রা এলাকা) যুদ্ধে, আহত সহযোদ্ধাকে বাঁচাতে আড়াল-গুলি চালাতে চালাতে।

বিশেষ দিনে গেলে কী দেখা যায়?

৫ সেপ্টেম্বর সমাধিতে বিজিবির পুষ্পার্ঘ্য ও গার্ড অব অনার হয়; জাতীয় দিবসগুলোতে বেনাপোলে যৌথ সীমান্ত অনুষ্ঠান হয়ে থাকে।

শেষকথা

বেনাপোল-কাশিপুরের এই জোড়া ভ্রমণ মনে করিয়ে দেয়, সীমান্ত শুধু বাণিজ্যের রেখা নয় — মুক্তির মূল্য দেওয়া মাটিও। ভোরে গদখালীর ফুল, দুপুরে বন্দরের কোলাহল, বিকেলে কাশিপুরের নীরব সমাধির পাশে এক মুহূর্ত দাঁড়ানো — যশোর রোডের শেষ প্রান্তের এই দিনটি অনেক দিন মনে থাকার মতো।