বরগুনার পাথরঘাটায় বলেশ্বর ও বিষখালী নদীর মিলনের কাছে, বঙ্গোপসাগরের প্রায় কোলঘেঁষে বিস্তৃত এক ম্যানগ্রোভ বন — হরিণঘাটা। নামের মানেই "হরিণের নদীতীর" — আর সত্যিই, এখানকার চিত্রা হরিণের পালই এই বনের প্রাণ। প্রায় ৩,৬৮৫ একর (১,৪৯১ হেক্টর) আয়তনের এই বন পটুয়াখালী উপকূলীয় বন বিভাগের পাথরঘাটা রেঞ্জের অন্তর্গত (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)। সুন্দরবনের পূর্ণাঙ্গ যাত্রা ছাড়াই যারা একদিনে ম্যানগ্রোভ বনের স্বাদ চান, তাদের জন্য হরিণঘাটা দক্ষিণের অন্যতম সহজ গন্তব্য — তবে যাওয়ার আগে বর্তমান অবস্থাটা জেনে নেওয়া জরুরি, সেটাও এই লেখায় স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।
বাঁধ রক্ষার বনায়ন থেকে ইকোপার্ক
হরিণঘাটার শুরুটা পর্যটনের জন্য নয়, ছিল উপকূল রক্ষার জন্য। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, বন বিভাগ ১৯৬৭ সালে নবগঠিত কাদামাটির চর স্থিতিশীল করতে ও ঘূর্ণিঝড়ের জলোচ্ছ্বাসের বিরুদ্ধে সবুজ বলয় গড়তে এখানে কেওড়া রোপণের উপকূলীয় বনায়ন কর্মসূচি শুরু করে। কয়েক দশকে সেই রোপণ প্রাকৃতিক উত্তরাধিকারের মাধ্যমে পরিণত হয় জটিল ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্রে, যেখানে আশ্রয় নেয় বিশাল চিত্রা হরিণের জনগোষ্ঠী — আনুমানিক সংখ্যা প্রায় ৫,০০০ বলে ধারণা করা হয় (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)। বানর, বন্য শুকর, শিয়াল আর নানা পাখিও এই বনের বাসিন্দা। ২০১১ সালে সরকার এলাকাটিকে ইকোপার্ক ঘোষণা করে (একই সূত্র); ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে জানা যায়, ২০১৫ সালের দিকে পরিবেশ মন্ত্রণালয় এখানে হাঁটার ট্রেইল, বিশ্রাম ছাউনি, রেস্ট হাউস, ওয়াচ টাওয়ার ও ওয়াশরুমসহ ইকো-ট্যুরিজম অবকাঠামো গড়ে তোলে। মজার তথ্য — এখানকার চিত্রা হরিণ সুন্দরবনের হরিণের তুলনায় আকারে কিছুটা বড় জাতের (দ্য ডেইলি স্টার)। সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার করমজল-হাড়বাড়িয়ার সঙ্গে তুলনায় হরিণঘাটা আয়তনে ছোট, কিন্তু হরিণ দেখার সম্ভাবনায় অনেকের কাছে এগিয়ে।
ট্রেইল, চার সৈকত ও ওয়াচ টাওয়ার
ইকোপার্কের প্রধান আকর্ষণ বনের ভেতর দিয়ে যাওয়া প্রায় ৯৫০ মিটার দীর্ঘ ট্রেইল (উঁচু হাঁটাপথ/ওয়াকওয়ে), যার শেষে পৌঁছানো যায় চারটি নির্জন সৈকতে — লালদিয়া, রুহিতা, পদ্মা ও চর লাঠিমারা (দ্য ডেইলি স্টার)। পাঁচতলা ওয়াচ টাওয়ার থেকে বন আর সাগরের প্যানোরামা দেখা যায়; বনে ঝুলন্ত সেতুও রয়েছে বলে ভ্রমণকারীদের অভিজ্ঞতায় জানা যায় (লোকাল গাইডস কানেক্ট)। লালদিয়া প্রান্তে বন যেখানে সৈকতে মেশে, সেখানকার ভূদৃশ্য অনেকটা পটুয়াখালীর ফাতরার চরের মতো — "দ্বিতীয় সুন্দরবন" জাতীয় অনুভূতি। জোয়ারের সময় বনের খালগুলো পানিতে ভরে যায়, ভাটায় কর্দমাক্ত হয়ে পড়ে — জোয়ার-ভাটার সময় মিলিয়ে গেলে দুই রূপই দেখা যায় (পর্যটন বিচিত্রা)। সরকারি ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রটি "হরিণবাড়িয়া পর্যটন কেন্দ্র" নামেও পরিচিত; প্রবেশে টিকিট কাটতে হয় (লোকাল গাইডস কানেক্ট) — বর্তমান ফি ঘাটে/গেটে যাচাই করুন।
যাওয়ার আগে জেনে নিন: রিমালের ক্ষত এখনো মেরামত হয়নি
এই অংশটা পড়া সবচেয়ে জরুরি। দ্য ডেইলি স্টারের জানুয়ারি ২০২৬-এর সম্পাদকীয় অনুযায়ী, অবহেলা ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ইকোপার্কটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে: ২০২৪ সালের মে মাসে ঘূর্ণিঝড় রিমালের ক্ষতির দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও কর্তৃপক্ষ এখনো মেরামতের উদ্যোগ নেয়নি। ৯৫০ মিটার ট্রেইলের অনেক স্ল্যাব ভাঙা বা অনুপস্থিত — ফলে বেশিরভাগ পর্যটক এখন চার সৈকতে পৌঁছাতেই পারেন না; পাঁচতলা ওয়াচ টাওয়ারের সিঁড়িও অনিরাপদ হয়ে উঠেছে; ছাউনি ও ওয়াশরুমগুলো ধ্বংসপ্রায় (দ্য ডেইলি স্টার)। অর্থাৎ বন ও হরিণ আগের মতোই আছে, কিন্তু পর্যটক-অবকাঠামো ভেঙে পড়েছে — প্রত্যাশা সেই অনুযায়ী ঠিক করে যান; বনের ভেতরের অভিজ্ঞতা নিন, সুবিধা আশা করবেন না। সংরক্ষণের চাপও বাস্তব — ২০২৬ সালের অক্টোবরে চরলাঠিমারা এলাকায় বন বিভাগের টহল দল শিকারিদের ফেলে যাওয়া জবাইকৃত একটি চিত্রা হরিণ উদ্ধার করে (প্রেস বরিশাল); হরিণ সংরক্ষিত প্রাণী, শিকার আইনত দণ্ডনীয় — অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়লে বন বিভাগকে জানান।
কীভাবে যাবেন ও টিপস
ঢাকা থেকে লঞ্চে বা বাসে বরগুনা; সেখান থেকে বাসে পাথরঘাটা উপজেলা শহর, তারপর স্থানীয় যানে বনকেন্দ্রের দিকে — পর্যটন বিচিত্রার হিসাবে উপজেলা সদর থেকে বনকেন্দ্রের দূরত্ব সড়কপথে প্রায় ১২ কিলোমিটার। টিপস: ভোরে বা সকালে গেলে হরিণ দেখার সম্ভাবনা বেশি; জোয়ারের সময়সূচি জেনে নিন; ট্রেইলের ভাঙা অংশে অতিরিক্ত সতর্কতা — ওয়াচ টাওয়ারের সিঁড়ি অনিরাপদ মনে হলে উঠবেন না (ডেইলি স্টার); খাবার-পানি সঙ্গে রাখুন, কারণ ভেতরের সুবিধা প্রায় অকার্যকর; হরিণের কাছাকাছি যেতে চাইলে নীরবতা বজায় রাখুন ও বন বিভাগের নির্দেশনা মানুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
হরিণঘাটা কোথায়?
বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলায়, বলেশ্বর-বিষখালীর মিলনের কাছে সাগর-সংলগ্ন ম্যানগ্রোভ বন — আয়তন প্রায় ৩,৬৮৫ একর (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)।
বনটি গড়ে উঠল কীভাবে?
১৯৬৭ সালে বন বিভাগের উপকূলীয় বনায়নে কেওড়া রোপণ থেকে শুরু; পরে প্রাকৃতিকভাবে ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্রে পরিণত হয় (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)।
কত হরিণ আছে?
আনুমানিক প্রায় ৫,০০০ চিত্রা হরিণ বলে ধারণা করা হয় (ইংরেজি উইকিপিডিয়া); এখানকার হরিণ আকারে সুন্দরবনের চেয়ে কিছুটা বড় জাতের (ডেইলি স্টার)।
ট্রেইলে কি এখন যাওয়া যায়?
আংশিক — রিমালের ক্ষতির পর ট্রেইলের অনেক স্ল্যাব ভাঙা, বেশিরভাগ পর্যটক সৈকত পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেন না; ওয়াচ টাওয়ারের সিঁড়িও অনিরাপদ (ডেইলি স্টার, জানু ২০২৬)। যাওয়ার আগে স্থানীয়ভাবে হাল অবস্থা জেনে নিন।
ইকোপার্ক কবে ঘোষিত হয়?
২০১১ সালে ইকোপার্ক ঘোষণা; ২০১৫ সালের দিকে পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়ন করা হয় (ইংরেজি উইকিপিডিয়া/ডেইলি স্টার)।
শেষকথা
হরিণঘাটা একই সঙ্গে আনন্দের আর আক্ষেপের গন্তব্য — অর্ধশতকের বনায়ন যে সমৃদ্ধ বন গড়ে তুলেছে, অবহেলা তাকেই পর্যটকের কাছে দুর্গম করে ফেলছে। তবু ভোরের আলোয় কেওড়া বনের ফাঁকে চিত্রা হরিণের পাল চরতে দেখার মুহূর্তটি অমূল্য। সতর্ক প্রত্যাশা নিয়ে গেলে হরিণঘাটা হতাশ করবে না; আর কর্তৃপক্ষের মেরামতের হাত পড়লে এই বন আবারও দক্ষিণের গর্ব হয়ে উঠতে পারে।