• 30 Oct, 2026

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের ধারে লুকিয়ে থাকা পঞ্চদশ শতকের মসজিদ-শহর মোহাম্মদাবাদ — ১০টি সুলতানি মসজিদ (জোড়বাংলা, ছয় গম্বুজের গলাকাটা, গোড়ার), ১১টি প্রাচীন দীঘি, ১৯৯২–৯৩ সালের খননে আবিষ্কার। বাগেরহাটেরও আগের এই নগরীর পূর্ণ ভ্রমণ-গাইড।

ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক ধরে কালীগঞ্জ পেরিয়ে খানিক দক্ষিণে গেলেই রাস্তার দুই ধারে ছড়িয়ে থাকতে দেখা যাবে লাল ইটের প্রাচীন মসজিদ আর বিরাট বিরাট দীঘি — বারোবাজার। খুব কম ভ্রমণকারীই জানেন, এই শান্ত জনপদের মাটির নিচে ঘুমিয়ে ছিল একটি সম্পূর্ণ সুলতানি যুগের শহর, যার নাম প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ দিয়েছে "শহর মোহাম্মদাবাদ"। এখানকার মসজিদগুলো শৈলীর বিচারে বাগেরহাটের খান জাহান-যুগের স্থাপনারও আগের বলে প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা (ঢাকা ট্রিবিউন) — অর্থাৎ বাংলার মসজিদ-স্থাপত্যের ইতিহাস পড়তে চাইলে বারোবাজার অনিবার্য ঠিকানা।

হারানো শহরের কথা: বারো আউলিয়া থেকে বারোবাজার

ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রচলিত ব্যাখ্যা হলো — এই অঞ্চলের বারোটি বাজারে বারোজন আউলিয়া (সূফি সাধক) বাস করতেন, সেখান থেকেই নাম "বারোবাজার"। সুলতানি আমলে জায়গাটি ছিল ভৈরব নদীর তীরের একটি সমৃদ্ধ নগরকেন্দ্র — তখন গৌড় ও পাটলিপুত্র থেকে পূর্বাঞ্চলে যাওয়ার একমাত্র জলপথ ছিল এই নদী, ফলে বারোবাজার ছিল তার গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। আজকের প্রত্ন-এলাকায় গণনায় আছে সুলতানি যুগের অন্তত ১০টি মসজিদ, ১১টি দীঘি ও ৪টি কবর (ডেইলি স্টার, ২০০৮) — মহাসড়কের দুই পাশে ছড়িয়ে থাকা এই নিদর্শনগুলো মিলিয়ে একটি খোলা-আকাশের প্রত্ন-উদ্যান। একই ভৈরবের নিচের ধারায় দাঁড়িয়ে আছে আরেক বিস্ময়, অভয়নগরের এগারো শিব মন্দির — দুই শতকের ব্যবধানে একই নদীর দুই তীরে দুই ধর্মের দুই স্থাপত্য-সম্পদ।

খননে আবিষ্কার: শিলালিপি যা বলল

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ঢিবির নিচে চাপা থাকা এই শহর আধুনিক চোখে আসে খননের মাধ্যমে। ১৯৮৭ সালে সাতগাছিয়া মসজিদ আবিষ্কারের সময় পাওয়া একটি প্রস্তর শিলালিপিতে সুলতান "মাহমুদ ইবনে হোসেন শাহ"-এর নাম পাওয়া যায় — শিলালিপিটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরে সংরক্ষিত (ডেইলি স্টার)। ১৯৯২–৯৩ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের খননে উঠে আসে জোড়বাংলা ও গলাকাটা মসজিদসহ একাধিক স্থাপনা। বয়স নির্ধারণে সূত্রগুলো পুরোপুরি একমত নয়: জোড়বাংলা-সংক্রান্ত শিলালিপিতে হিজরি ৮০০ সালের উল্লেখ পাওয়া যায় (বাংলা উইকিপিডিয়া) — সেই হিসাবে স্থাপনাগুলো প্রায় ৭০০ বছরের পুরনো; অন্যদিকে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের মূল্যায়নে নিদর্শনগুলো পঞ্চদশ শতাব্দীর, আর গলাকাটার শৈলী-বিশ্লেষণ (ইলিয়াস শাহী যুগের চোটো পাণ্ডুয়া ও হজরত পাণ্ডুয়ার সঙ্গে মিল) সেটিকে খান জাহানের বাগেরহাট-স্থাপত্যের আগের বলে নির্দেশ করে (ঢাকা ট্রিবিউন)। নিরাপদ সিদ্ধান্ত একটাই — মসজিদগুলো বাংলার সুলতানি যুগের প্রারম্ভিক পর্বের, বাগেরহাটের সমসাময়িক বা তার চেয়েও পুরনো।

যেসব মসজিদ দেখবেন

জোড়বাংলা মসজিদ খননের সবচেয়ে পরিচিত ফল — এক গম্বুজের এই মসজিদ ১০–১১ ফুট উঁচু প্ল্যাটফর্মের ওপর দাঁড়িয়ে, প্রবেশপথ থেকে দীঘি পর্যন্ত নেমে গেছে ইটের বিশাল সিঁড়ি; পশ্চিম দেয়ালে পোড়ামাটির নকশায় সজ্জিত তিনটি মেহরাব, কেন্দ্রীয়টিতে ফুল-লতাপাতার কারুকাজ। নামটি এসেছে পাশে থাকা একজোড়া কুঁড়েঘর থেকে — আবার কারো মতে জোড়া দীঘি থেকে (আদার ব্যাপারী)। উত্তর দিকের পুকুরটি "অন্ধপুকুর" নামে পরিচিত, পাশে কয়েকটি প্রাচীন কবর। এর মাত্র ১০০ মিটার পূর্বে গলাকাটা মসজিদ — ধ্বংসস্তূপ থেকে খনন করে ছয় গম্বুজে পুনর্নির্মিত (খান জাহান-শৈলীতে); বাইরের মাপ প্রায় ১১.৮৩ × ৮.২২ মিটার, ভেতরে কষ্টিপাথরের স্তম্ভে শিকল-ঘণ্টার নকশা এই মসজিদের অনন্য বৈশিষ্ট্য। অদ্ভুত নামটি ("গলাকাটা") সম্ভবত এর আগের ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থা থেকেই এসেছে। বেলাট দৌলতপুরের গোড়ার মসজিদ — চার গম্বুজের বর্গাকার কাঠামো, দেয়াল ও মেহরাবে শিকল-নকশা আর পুষ্পশোভিত টেরাকোটার সমৃদ্ধ অলংকরণ, সামনে বিশাল দীঘি। এক গম্বুজের শুকুর মল্লিক মসজিদ অনেকটা ঢাকার বিনত বিবি মসজিদের আদলে। এ ছাড়া পীরপুকুর, চেরাগদানি, সাতগাছিয়া, নুনগোলা, পাঠাগার ও মনোহর মসজিদ — সব মিলিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ঘণ্টাদুয়েকের প্রত্ন-ভ্রমণ। গলাকাটাসহ কয়েকটিতে এখনো নামাজ হয় — পরিদর্শনে সে মর্যাদা মনে রাখুন।

দীঘিগুলো ও বর্তমান অবস্থা

মসজিদগুলোর সঙ্গী এগারোটি প্রাচীন দীঘি — খাড়ের দীঘি, সওদাগর দীঘি, পীর পুকুর, গোড়ার পুকুর, জোড়বাংলা দীঘি, সাতগাছিয়া দীঘি প্রভৃতি; সুলতানি নগর-পরিকল্পনায় মসজিদের পাশে ওজু ও পানীয় জলের জন্য দীঘি খননই ছিল রীতি। সংরক্ষণের চিত্র মিশ্র: জোড়বাংলা ও গলাকাটা পুনরুদ্ধার পেয়ে ভালো অবস্থায় থাকলেও ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন (২০০৮) থেকেই জানা যায় — অনেক ঢিবি ও মসজিদে ফাটল, আগাছা আর টেরাকোটা-ফলক হারানোর ক্ষতি চলমান ছিল; সবগুলো নিদর্শনের যত্ন সমান নয়। তবু মহাসড়কের এত কাছে, এত সহজে পৌঁছানো যায় এমন প্রাচীন নগরী বাংলাদেশে দুটি নেই। যাওয়ার আগে খেয়াল রাখুন — এটি টিকিট-কাউন্টারওয়ালা সাজানো পর্যটনকেন্দ্র নয়; মসজিদগুলো মহাসড়ক ও গ্রামের রাস্তার ধারে ছড়ানো, স্থানীয়দের জিজ্ঞেস করে করে খুঁজে নেওয়াই এখানকার পদ্ধতি।

কীভাবে যাবেন

বারোবাজার ঝিনাইদহ জেলা সদর থেকে প্রায় ২৬–৩০ কিলোমিটার দক্ষিণে, কালীগঞ্জ উপজেলা শহর থেকে প্রায় ১১ কিলোমিটার — ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের ঠিক পাশে। ঝিনাইদহ বা যশোরগামী যেকোনো বাসে বারোবাজার বাজারে নেমে রিকশা/ভ্যানে মসজিদগুলো ঘোরা যায়; নিজের যান থাকলে মহাসড়ক থেকে সরাসরি প্রতিটি ঢিবিতে পৌঁছানো সহজ। একদিনের সফরে বারোবাজারের সঙ্গে বাগেরহাট অভিমুখী রুটে এগিয়ে যাওয়া বা একই দিনে কালীগঞ্জের মল্লিকপুর বটগাছ যোগ করা যায় — তবে বারোবাজার একাই অর্ধেক দিনের গভীর অভিজ্ঞতা। থাকার ব্যবস্থা ঝিনাইদহ বা কালীগঞ্জ শহরে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

বারোবাজার নাম এলো কীভাবে?

প্রচলিত ব্যাখ্যা: বারোটি বাজারে বারোজন আউলিয়ার বাস ছিল বলে "বারোবাজার" (ডেইলি স্টার)।

মসজিদগুলো কত পুরনো?

সুলতানি যুগের — প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের মতে পঞ্চদশ শতাব্দী; হিজরি ৮০০ সালের শিলালিপির উল্লেখে আরও আগের হওয়ার কথাও ওঠে। বাগেরহাটের খান জাহান-স্থাপত্যের আগের বা সমসাময়িক বলে শৈলী-বিশ্লেষণে জানা যায়।

কয়টি মসজিদ আছে, প্রধান কোনগুলো?

অন্তত ১০টি — জোড়বাংলা, গলাকাটা, গোড়ার, শুকুর মল্লিক, পীরপুকুর, সাতগাছিয়া প্রভৃতি। জোড়বাংলা ও ছয় গম্বুজের গলাকাটা সবচেয়ে পরিচিত।

শহরটির প্রাচীন নাম কী?

মোহাম্মদাবাদ — প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ খনন-এলাকাটির নাম দিয়েছে "শহর মোহাম্মদাবাদ"।

টিকিট বা গাইড লাগে?

আনুষ্ঠানিক টিকিট-ব্যবস্থা নেই; মসজিদগুলো মহাসড়কের ধারে ছড়ানো — স্থানীয় কেয়ারটেকার বা বাসিন্দাদের জিজ্ঞেস করে ঘোরাই সহজ পথ। সক্রিয় মসজিদে নামাজের সময় এড়িয়ে ভেতর দেখুন।

শেষকথা

বারোবাজার শেখায়, ইতিহাস সবসময় গম্বুজের উচ্চতায় মাপা যায় না — কখনো কখনো তা ঘুমিয়ে থাকে মহাসড়কের ধারের লাল ঢিবিতে, যার পাশ দিয়ে হাজার হাজার যান প্রতিদিন ছুটে যায় অজান্তে। একদিন থেমে এই মসজিদগুলোর সামনে দাঁড়ালে বোঝা যায়, বাগেরহাটের আগেও বাংলার দক্ষিণে ফুলে উঠেছিল আরেকটি মসজিদের শহর — মোহাম্মদাবাদ।