ঢাকার খাবার-সংস্কৃতির রাজধানী যদি একটাই হয়, তা পুরান ঢাকা। মোঘল আমল থেকে গড়ে ওঠা এই শহরের রান্নাঘরে জন্মেছে বিরিয়ানির নিজস্ব ধারা, বাকরখানির মতো রুটি আর এমন কিছু দোকান, যাদের নাম প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মুখে মুখে ফেরে। আহসান মঞ্জিল ঘুরে এসে নাজিরা বাজারের গলিতে ঢুকলেই শুরু হয়ে যায় সেই আসল ঢাকাই ভোজন-অভিযান।
হাজী বিরিয়ানি: এক হাঁড়ি থেকে কিংবদন্তি (১৯৩৯)
পুরান ঢাকার বিরিয়ানি মানেই প্রথম নাম হাজী বিরিয়ানি। বাংলা উইকিপিডিয়া অনুযায়ী, ১৯৩৯ সালে বাবুর্চি হাজী মোহাম্মদ হোসেন নাজিরা বাজারে মাত্র এক হাঁড়ি বিরিয়ানি দিয়ে রাস্তার ধারের এই ব্যবসা শুরু করেন; আজ তাঁর বংশধররা চালাচ্ছেন নাজিরা বাজার (৭০ কাজী আলাউদ্দিন রোড) ও মতিঝিলের শাখা। এর রহস্য দুটি: ঘি বা মাখনের বদলে রান্না হয় সরিষার তেলে, আর পরিবেশন করা হয় ঐতিহ্যের কাঁঠালপাতার প্লেটে (সাবস্ট্যাক ফুড-রিভিউ/উইমেন্স কর্নার)। মেনু সরল — ছাগলের মাংসের বিরিয়ানি আর সঙ্গে বোরহানি; দোকানে সাইনবোর্ডের বাহার নেই, নামেই ভিড়। এলাকাটি আজ বিরিয়ানি-পাড়া: পাশাপাশি হানিফ, মামুন, বিসমিল্লাহসহ আরও অনেক পুরনো দোকান (প্রথম আলো)।
নান্নার মোরগ পোলাও আর বাকিরা
বেচারাম দেউড়ির হাজী নান্না বিরিয়ানি বিখ্যাত তার মোরগ পোলাওয়ের জন্য — সাবস্ট্যাকের বিরিয়ানি-ধারাবাহিক অনুযায়ী, বাবুর্চি নান্না মিয়া ১৯৬০-এর দশক থেকে এই ধারা গড়েন, আর তাঁর দোকানে প্রতি মাসের ৫ তারিখে বিশেষভাবে মোরগ পোলাও বিক্রি হয়; এমনি দিনে মিলবে বিরিয়ানি, চিকেন পোলাও, রেজালা, ফিরনি আর টিকিয়া। রায়সাহেব বাজারের হাজী মাখন বিরিয়ানি (শুরু ১৯৫০ সালে আব্দুল কাদের মিয়ার হাতে) খ্যাত তার নল্লি বিরিয়ানির জন্য — দোকান খোলা থাকে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত (সাবস্ট্যাক)। আর চকবাজারের শাহ সাহেবের বিরিয়ানি খেতে হলে যেতে হয় সক্কালবেলায় — সকাল ৯টার মধ্যেই হাঁড়ি শেষ হয়ে যায় (সাবস্ট্যাক)। ঢাকাই বিরিয়ানি মূলত "পাক্কি" ধাঁচের — মাংস ও চাল আলাদা রান্না করে মেশানো হয়; তবে কাঁচা মেরিনেট করা মাংস দমে রান্নার কাচ্চির চলও এখানে সমান জনপ্রিয় (সাবস্ট্যাক/উইমেন্স কর্নার)।
বাকরখানি ও চকবাজারের ইফতার
বিরিয়ানির বাইরে পুরান ঢাকার আরেক আইকন বাকরখানি — মোঘল আমল থেকে চলে আসা খাস্তা রুটি, যার নাম নিয়ে প্রচলিত আছে আগা বাকের ও খানি বেগমের প্রেমের জনশ্রুতি। চকবাজার-নাজিরা বাজারের পুরনো বেকারিগুলোতে আজও কাঠের চুলায় বাকরখানি সেঁকা হয়; চা বা কাবাবের সঙ্গে এর জুটি অতুলনীয়। আর রমজান এলেই চকবাজারের ইফতার বাজার হয়ে ওঠে দেশের সবচেয়ে বিখ্যাত খাবারের মেলা — শত বছরের পুরনো এই বাজারে "বড় বাপের পোলাও"সহ অদ্ভুত নামের সব ঐতিহ্যবাহী পদ মেলে। দিঘুবাবু লেনের মানিক চাঁদের পোলাওয়ের কথা আলাদা — সাবস্ট্যাকের বিবরণ অনুযায়ী, এই পোলাও বিক্রি হয় গভীর রাতে; রাত তিনটেয় সেখানে ভিড়, সূর্য ওঠার আগেই শেষ!
খাবার-ভ্রমণের টিপস
একদিনের রুট: আহসান মঞ্জিল-ইসলামপুর সেরে দুপুরে নাজিরা বাজারে হাজী বিরিয়ানি, বিকেলে চকবাজারে বাকরখানি-চা, সুযোগ থাকলে বেচারাম দেউড়িতে নান্না। জনপ্রিয় দোকানগুলোতে দুপুরের পিকে লম্বা লাইন থাকে — একটু আগেভাগে যান। দাম মৌসুম ও বাজারভেদে বদলায়, তাই মেনু দেখে অর্ডার করুন। খাবারের এই সংস্কৃতি বাংলাদেশের অন্য প্রান্তেও ছড়িয়ে — যেমন চট্টগ্রামের মেজবান আর কালা ভুনার ঐতিহ্য; তবে পুরান ঢাকার বিরিয়ানি-বাকরখানির যুগলবন্দি অনন্য।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
হাজী বিরিয়ানি কবে প্রতিষ্ঠিত?
১৯৩৯ সালে, হাজী মোহাম্মদ হোসেনের হাতে; বৈশিষ্ট্য সরিষার তেলের রান্না ও কাঁঠালপাতার প্লেট (বাংলা উইকিপিডিয়া)।
নান্নার মোরগ পোলাও কখন পাওয়া যায়?
বেচারাম দেউড়ির হাজী নান্না বিরিয়ানিতে প্রতি মাসের ৫ তারিখে বিশেষভাবে মোরগ পোলাও বিক্রি হয় (সাবস্ট্যাক)।
কাচ্চি আর পাক্কি বিরিয়ানির তফাত কী?
কাচ্চিতে কাঁচা মেরিনেট মাংস চালের সঙ্গে দমে রান্না হয়; পাক্কিতে মাংস ও চাল আলাদা রান্না করে মেশানো হয় (সাবস্ট্যাক)।
বাকরখানি কোথায় ভালো পাওয়া যায়?
চকবাজার ও নাজিরা বাজার এলাকার পুরনো বেকারিগুলোতে — মোঘল আমলের খাস্তা রুটি এটি।
চকবাজারের ইফতার বাজার কখন বসে?
রমজান মাসে প্রতিদিন ইফতারের আগে; শতবর্ষী এই বাজার ঐতিহ্যবাহী ইফতারির জন্য দেশজুড়ে বিখ্যাত।
শেষকথা
পুরান ঢাকায় খাওয়া মানে শুধু পেট ভরা নয় — তা প্রায় চারশ বছরের রান্নাঘরের ইতিহাস চেখে দেখা। এক প্লেট হাজী বিরিয়ানি, এক টুকরো বাকরখানি আর হয়তো কোনো গভীর রাতে এক থালা পোলাও — এই শহরের স্বাদ ঠিক এখানেই।