গ্রামের চাষের জমির নিচে লুকিয়ে থাকতে পারে আড়াই হাজার বছরের একটি পুরো শহর — নরসিংদীর বেলাব উপজেলার উয়ারী ও বটেশ্বর গ্রাম দুটি ঠিক সেই বিস্ময়ের নাম। বিশেষজ্ঞদের মতে এটি বাংলাদেশের প্রাচীনতম নগর-বসতির ধ্বংসাবশেষ: সুরক্ষিত দুর্গ-নগর, বন্দর, পাকা রাস্তা আর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ছাপ নিয়ে মাটির নিচে ঘুমিয়ে থাকা এক সভ্যতা। প্রত্ন-ইতিহাসে আগ্রহীদের জন্য এটি দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খোলা পাঠশালা।
স্কুলশিক্ষকের মুদ্রা-ভান্ডার থেকে জাতীয় আবিষ্কার
গল্পের শুরু ১৯৩৩ সালের ডিসেম্বরে: উয়ারী গ্রামে মাটি কাটার সময় শ্রমিকরা পেয়ে যান একটি কলসিতে সঞ্চিত ছাপাঙ্কিত রৌপ্য মুদ্রার ভান্ডার। স্থানীয় স্কুলশিক্ষক মুহম্মদ হানিফ পাঠান সেখান থেকে ২০–৩০টি মুদ্রা সংগ্রহ করে পত্রিকায় খবর ছাপিয়ে বিষয়টি সুধী সমাজের নজরে আনেন (শিক্ষক বাতায়ন/ট্যুরিজম বাংলা)। তাঁর ছেলে হাবিবুল্লাহ পাঠান ১৯৫০-এর দশক থেকে দীর্ঘ ছয় দশক ধরে এলাকার প্রত্নবস্তু সংগ্রহ ও গবেষণা চালিয়ে যান — অনেক দিন প্রাতিষ্ঠানিক পণ্ডিতেরা তাঁর কথায় কান না দিলেও শেষ পর্যন্ত তিনিই সঠিক প্রমাণিত হন (প্রতিদিনের বাংলাদেশ)। ১৯৯৬ সাল থেকে প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ এবং ২০০০ সাল থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের উদ্যোগে অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে নিয়মিত খনন শুরু হয় (শিক্ষক বাতায়ন)।
খ্রিষ্টপূর্ব ৪৫০ অব্দের দুর্গ-নগরী
খননে উয়ারীতে আবিষ্কৃত হয়েছে ৬০০ মিটার × ৬০০ মিটার আয়তনের চারদিকে মাটির দুর্গ-প্রাচীর — যার ৫–৭ ফুট উঁচু ধ্বংসপ্রাপ্ত অংশ এখনো দৃশ্যমান (শিক্ষক বাতায়ন)। দুর্গের পশ্চিম ও দক্ষিণ দিক ঘিরে প্রায় ৫.৮ কিলোমিটার দীর্ঘ বিশাল মাটির বাঁধ — স্থানীয়ভাবে "অসম রাজার গড়" নামে পরিচিত (শিক্ষক বাতায়ন)। প্রাপ্ত নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে পাকা রাস্তা ও পার্শ্ব-রাস্তা, বন্দরের চিহ্ন, পোড়ামাটির ফলক, স্বল্পমূল্যের পাথর ও কাচের পুঁতি, লোহার সামগ্রী এবং উপমহাদেশের প্রাচীনতম ছাপাঙ্কিত রৌপ্য মুদ্রা (ট্যুরিজম বাংলা)। যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ডের পরীক্ষাগারে কার্বন-১৪ পরীক্ষায় উয়ারীর বসতিকে খ্রিষ্টপূর্ব ৪৫০ অব্দের বলে নিশ্চিত করা হয়েছে (বাংলা উইকিপিডিয়া-ভিত্তিক বিবরণ)। সুফি মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, এই জনপদই হতে পারে টলেমির ভূগোলে উল্লেখিত "সৌনাগড়া" বাণিজ্যকেন্দ্র — গবেষকদের একাংশ একে প্রাচীন "সুবর্ণবীথি" জনপদের সঙ্গেও যুক্ত করেন (ট্যুর এভরিহোয়্যার/ইতিহাসের গল্প) — অবশ্য এগুলো এখনো গবেষণাধীন ধারণা। মধুপুর গড়ের পূর্ব প্রান্তে, প্রাচীন ব্রহ্মপুত্রের তীরে বন্যামুক্ত উঁচু ভূমিতে গড়া এই নগরের বিস্তার শুধু দুই গ্রামেই সীমিত নয় — শিবপুর, রায়পুরা ও মনোহরদীসহ আশেপাশে এ পর্যন্ত প্রায় ৫০টি প্রত্নপীঠ শনাক্ত হয়েছে (প্রতিদিনের বাংলাদেশ)। প্রাচীন নগরসভ্যতার এই ধারারই পরের অধ্যায় কুমিল্লার ময়নামতী — দুটো মিলিয়ে বাংলার নগরায়ণের হাজার বছরের ধারাবাহিকতা ধরা পড়ে।
দর্শনার্থীদের জন্য বাস্তব তথ্য
উয়ারী-বটেশ্বর কোনো টিকিট-কাটা পর্যটন পার্ক নয় — এটি জীবন্ত গ্রামের মাঝে ছড়িয়ে থাকা সংরক্ষিত প্রত্নক্ষেত্র। দেখার মূল বিষয় হলো দুর্গ-প্রাচীরের ধ্বংসাবশেষ, অসম রাজার গড়ের উঁচু বাঁধ, খনন-এলাকা ও সাইনবোর্ড, আর চারপাশের সবুজ গ্রামবাংলা। যশোরের ভরত ভায়না দেউলের মতো প্রাচীন স্থানগুলোর মতোই এখানেও প্রত্যাশা রাখতে হবে "ঐতিহাসিক ভূখণ্ড" দেখার, ঝকঝকে স্থাপনার নয়। নিয়ম: খনন-গর্তে নামবেন না, মাটি খুঁড়বেন না, কোনো প্রত্নবস্তু পেলে নিজে না তুলে স্থানীয় প্রশাসন/কর্তৃপক্ষকে জানান — প্রত্নবস্তু সংগ্রহ আইনত দণ্ডনীয়। যাওয়া: ঢাকা থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে — বাসে নরসিংদী হয়ে বেলাব, সেখান থেকে রিকশা/অটোতে উয়ারী-বটেশ্বর (বেলাব বাজার থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার)। বর্ষার পর পাথরের নিদর্শন মাটির ওপরে চকচকে হয়ে ওঠে বলে স্থানীয়রা বলেন (প্রতিদিনের বাংলাদেশ) — তবে ভ্রমণের সেরা সময় শুষ্ক মৌসুম।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
উয়ারী-বটেশ্বর কত পুরনো?
কার্বন-১৪ পরীক্ষায় বসতির বয়স খ্রিষ্টপূর্ব ৪৫০ অব্দ পর্যন্ত নিশ্চিত — প্রায় আড়াই হাজার বছর (বাংলা উইকিপিডিয়া-ভিত্তিক বিবরণ)।
কে প্রথম এই স্থানের গুরুত্ব তুলে ধরেন?
স্কুলশিক্ষক মুহম্মদ হানিফ পাঠান (১৯৩০-এর দশক); পরে তাঁর ছেলে হাবিবুল্লাহ পাঠান গবেষণা চালিয়ে যান (শিক্ষক বাতায়ন)।
খনন কারা পরিচালনা করছেন?
২০০০ সাল থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, নেতৃত্বে অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমান (ট্যুরিজম বাংলা)।
অসম রাজার গড় কী?
দুর্গ-নগরের পশ্চিম-দক্ষিণে প্রায় ৫.৮ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রাচীন মাটির প্রতিরক্ষা বাঁধ (শিক্ষক বাতায়ন)।
এখানে কি জাদুঘর বা টিকিট আছে?
এটি খোলা প্রত্নক্ষেত্র — টিকিটের ব্যবস্থা নেই; খনন-এলাকার নিয়ম মেনে ঘুরতে হয়।
শেষকথা
মহাস্থানগড়ের পাশাপাশি উয়ারী-বটেশ্বর প্রমাণ করে, বাংলার সভ্যতার শেকড় কত গভীরে। মাটির প্রাচীরের ওপর দাঁড়িয়ে ভাবুন, আড়াই হাজার বছর আগে ঠিক এখানেই জাহাজঘাটে ভিড়ত বাণিজ্যতরী — বাংলাদেশের ইতিহাস-ভ্রমণে এর চেয়ে বড় অনুভূতি কমই আছে।