পদ্মা সেতু চালুর পর ঢাকা থেকে সবচেয়ে কাছে চলে আসা জেলা শহরগুলোর একটি ফরিদপুর — "সোনালী আঁশ" পাটের দেশ, কুমার নদের পাড়ে সাজানো পুরনো শহর। রাজধানীর ভিড় ছেড়ে একদিনের শহর-ভ্রমণের জন্য এর ঝিলটুলি-টেপাখোলার প্রাণচাঞ্চল্য, শতবর্ষী কলেজ ক্যাম্পাস আর নদীর পাড়ের প্রশান্তি যথেষ্ট। আর শহরতলীর গোবিন্দপুরে জসীমউদ্দীনের বাড়ি তো আছেই — ফরিদপুর সফর মানেই সাহিত্যতীর্থ দর্শন।
ফতেহাবাদ থেকে ফরিদপুর
প্রাচীনকালে এই জনপদের নাম ছিল ফতেহাবাদ; পরে সুফি সাধক শাহ ফরিদউদ্দিনের নাম অনুসারে এর নাম হয় ফরিদপুর বলে ঐতিহাসিক বিবরণে পাওয়া যায় (মোতাহারুল)। নবাবী আমলে এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র। জেলার আয়তন প্রায় ২,০৭২ বর্গকিলোমিটার (উইকিভ্রমণ); পদ্মা, কুমার, মধুমতিসহ নদীঘেরা এই অঞ্চল চিরকালই পাট ও কৃষির জন্য খ্যাত — ভ্রমণে শহর ছাড়িয়ে এগোলেই চোখে পড়বে সবুজ-সোনালি মাঠ।
রাজেন্দ্র কলেজ: শতবর্ষের ক্যাম্পাস
শহরের প্রাণকেন্দ্র ঝিলটুলিতে অবস্থিত সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ — দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম প্রাচীন বিদ্যাপীঠ। অম্বিকাচরণ মজুমদারের প্রচেষ্টা আর বাইশরশির জমিদার রমেশ চন্দ্র রায় চৌধুরীর অর্থায়নে ১৯১৮ সালে কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়; নামকরণ হয় তাঁর পিতা রাজেন্দ্র চন্দ্র রায় চৌধুরীর নামে (প্রথম আলো)। এই কলেজের ছাত্র তালিকাটাই বাংলার সাহিত্য-ইতিহাস: পল্লীকবি জসীমউদ্দীন নিজে এই কলেজে পড়েছেন — ছাত্রদের গর্বের সঙ্গে বলা কথা (প্রথম আলো); কথাসাহিত্যিক নরেন্দ্রনাথ মিত্র ও আবু ইসহাকও এই ক্যাম্পাসের ছাত্র ছিলেন। কলেজ লেক আর সবুজ চত্বরসহ পুরো ক্যাম্পাসটি শহরের সবচেয়ে মনোরম প্রাঙ্গণগুলোর একটি (মোতাহারুল)।
শহরে আরও যা দেখবেন
শহরের জনপ্রিয় অবকাশ-ঠিকানা টেপাখোলা লেকপাড় — লেকের পাড়ে হাঁটা আর বসার জন্য সাজানো এলাকা (ফরিদপুর সিটি)। শহরের প্রাণে অম্বিকা ময়দান (জুবলী ট্যাংক) ও শেখ রাসেল শিশু পার্ক। গোয়ালচামট এলাকায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র শ্রীধাম শ্রীঅঙ্গন — প্রভু জগদ্বন্ধু সুন্দরের আশ্রম, এর স্থাপত্য ও ধর্মীয় গাম্ভীর্য সব ধরনের দর্শনার্থীকে টানে (জিলাইভ২৪/উইকিভ্রমণ); পাশেই গৌর গোপাল আঙ্গিনা। হারুকান্দিতে দেশের একমাত্র নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশাল সবুজ ক্যাম্পাস (জিলাইভ২৪) — গবেষণা প্রতিষ্ঠান হলেও এর শান্ত পরিবেশ দেখার মতো। শহর থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে ঐতিহাসিক গেরদা মসজিদ (ফরিদপুর সিটি), আর বিকেলের জন্য সেরা — ধলার মোড়ে পদ্মার পাড়। ফরিদপুর জেলা জাদুঘর ও ময়েজ মঞ্জিল জমিদার বাড়িও শহরের তালিকায় রাখা যায় (ফরিদপুর সিটি)। জেলার অন্য শহর-গাইডের মধ্যে কুমিল্লা শহরের ধর্মসাগরকেন্দ্রিক ভ্রমণও পাঠকের প্রিয়।
খাবার আর যাতায়াত
ফরিদপুরের মিষ্টির খ্যাতি দুটো নামে — তেতুলতলার রসগোল্লা (খোকা মিয়ার দোকান — ফরিদপুর সিটি) আর বাগাটের দই (ডেইলি স্টার)। ঢাকা থেকে সড়কপথে বাস ছাড়াও পদ্মা সেতু হয়ে ট্রেনে এখন ফরিদপুর সহজে পৌঁছানো যায় (ফরিদপুর সিটি)। শহরের ভেতরে রিকশা-ইজিবাইকই প্রধান বাহন; সারাদিনের জন্য ইজিবাইক রিজার্ভ করে শহর ও আশপাশ একসঙ্গে ঘোরা সবচেয়ে সুবিধাজনক (ফরিদপুর সিটি)।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ফরিদপুর নাম এলো কোথা থেকে?
পুরনো নাম ফতেহাবাদ; সুফি সাধক শাহ ফরিদউদ্দিনের নামে পরে ফরিদপুর নামকরণ হয় বলে জানা যায় (মোতাহারুল)।
রাজেন্দ্র কলেজ কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
১৯১৮ সালে, রমেশ চন্দ্র রায় চৌধুরীর অর্থায়নে — তাঁর পিতা রাজেন্দ্র চন্দ্রের নামে (প্রথম আলো)।
শহরে একদিনে কী দেখবেন?
রাজেন্দ্র কলেজ, টেপাখোলা লেকপাড়, শ্রীঅঙ্গন, জসীমউদ্দীনের বাড়ি আর বিকেলে ধলার মোড়ে পদ্মার পাড় (ফরিদপুর সিটি)।
ফরিদপুরের বিখ্যাত খাবার কী?
তেতুলতলার রসগোল্লা আর বাগাটের দই (ডেইলি স্টার/ফরিদপুর সিটি)।
ঢাকা থেকে কীভাবে যাবেন?
বাসে পদ্মা সেতু বা পাটুরিয়া পথে; রেলে পদ্মা সেতু হয়ে সরাসরি ফরিদপুর (ফরিদপুর সিটি)।
শেষকথা
ফরিদপুর বড় ল্যান্ডমার্কের শহর নয় — এটি আবহের শহর: শতবর্ষী কলেজের ছায়া, লেকপাড়ের বিকেল, আশ্রমের ঘণ্টাধ্বনি আর রসগোল্লার মিষ্টি। পদ্মা সেতুর যুগে ঢাকাবাসীর জন্য এটি এখন সপ্তাহান্তের সবচেয়ে সহজ পালানো — জসীমউদ্দীনের বাড়ির সঙ্গে মিলিয়ে একদিনের নিখুঁত সফর।