• 30 Oct, 2026

নরসিংদীর শিবপুর-বেলাব-রায়পুরার লটকন বাগান — ২০২৫ সালে জিআই স্বীকৃতি, লাল মাটির বাগান, মরজালের পাইকারি হাট, জুন-জুলাইয়ের পাকা মৌসুম, বাগানে ঢোকার নিয়ম ও যাতায়াতসহ পূর্ণ গাইড।

বাংলাদেশে এমন ফল কমই আছে, যার জন্য একটি পুরো জেলার নামডাক — টক-মিষ্টি লটকন আর নরসিংদী এখন প্রায় সমার্থক। শিবপুর, বেলাব ও রায়পুরা উপজেলার লাল মাটির গ্রামগুলোতে বর্ষার শুরুতেই গাছের গোড়া থেকে ডালপালাজুড়ে থোকা থোকা পাকা লটকন ঝুলতে থাকে — আর সেই দৃশ্য দেখতে ও গাছ থেকে পেড়ে খেতে যাওয়াটাই এখন একটা মৌসুমী ভ্রমণ। নরসিংদীর আরেক গন্তব্য উয়ারী-বটেশ্বরের প্রত্ন-ভ্রমণের সঙ্গে এটিকে জুড়ে দিলে একদিনে ইতিহাস আর স্বাদ দুটোই পাওয়া যায়।

একশ বছরের চারা থেকে জিআই স্বীকৃতি

কথিত আছে, প্রায় একশ বছর আগে শিবপুরের আজকিটোলা এলাকায় হাজী হাকিম আব্দুল আজিজ নামের এক ব্যক্তি তিনটি লটকনের চারা রোপণ করেছিলেন (দ্য ডেইলি স্টার)। বাণিজ্যিক বিস্তার ঘটে ১৯৯০-এর দশক থেকে, যখন শিবপুর-বেলাবের লাল মাটির উঁচু জমিতে পরীক্ষামূলক বাগান অসাধারণ সাফল্য পায় (কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর)। লটকন গাছ (Baccaurea motleyana) ফল দেয় অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে — ডালের বদলে কাণ্ড ও মোটা শাখাজুড়ে থোকায়। বর্তমানে জেলায় প্রায় ১,৮০০ হেক্টর জমিতে লটকনের চাষ হয়, সবচেয়ে বেশি শিবপুরে (কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, ডেইলি স্টার ২০২৫)। আর সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি এসেছে সম্প্রতি: ২০২৫ সালের ২৫ এপ্রিল নরসিংদীর লটকন পেয়েছে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের মর্যাদা (দ্য ডেইলি স্টার, জুন ২০২৫) — কুমিল্লার রসমালাইয়ের মতোই এখন এটিও বাংলাদেশের জিআই-তালিকার গর্ব। তবে জলবায়ুর মারপ্যাঁচ আছে: ২০২৫ মৌসুমেই প্রতিকূল আবহাওয়ায় ফলন আগের বছরের তুলনায় প্রায় অর্ধেক কমে গিয়েছিল (দ্য ডেইলি স্টার) — অর্থাৎ বছরভেদে বাগানের রূপ বদলায়।

বাগানে ঘোরা ও মরজালের হাট

কোথায় যাবেন: শিবপুরের ছোটাবান্দা গ্রামের রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধ অসংখ্য লটকন বাগান; এছাড়া উয়ারী-বটেশ্বর, রায়পুরা, যশোর (নরসিংদীর গ্রাম), আগরপুরসহ প্রায় সব কাছাকাছি গ্রামেই বাগান ছড়িয়ে আছে (ভ্রমণগাইড)। সবচেয়ে জরুরি নিয়ম: এগুলো ব্যক্তিমালিকানাধীন বাণিজ্যিক বাগান — মালিকের অনুমতি ছাড়া কোনো বাগানে ঢুকবেন না। সুখের বিষয়, অধিকাংশ মালিকই আন্তরিক; কথা বললে তাঁরা নিজেরাই বাগান ঘুরিয়ে দেখান, আর অনুমতি পেলে গাছ থেকে নিজ হাতে পেড়ে খাওয়ার অভিজ্ঞতাও মেলে (ভ্রমণগাইড)। ফল কিনতে চাইলে মৌসুমে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে মরজাল বাজারে বসে বিশাল পাইকারি হাট — ভোর থেকে চাষি-ব্যাপারীদের জমজমাট বেচাকেনা দেখাটাও ভ্রমণের অংশ; এছাড়া সৃষ্টিগড়, কামারটেক, চৈতন্য ও গাবতলী বাজারেও লটকনের হাট বসে (ভ্রমণগাইড)।

কখন যাবেন, কীভাবে যাবেন

মৌসুম: গাছে ফুল আসে মাঘ-ফাল্গুনে, ফল পাকে জ্যৈষ্ঠের শেষ থেকে আষাঢ়-শ্রাবণ — অর্থাৎ বাগান-ভ্রমণের আসল সময় জুন-জুলাই (দ্য ডেইলি স্টার)। মৌসুমের বাইরে গেলে বাগান সবুজ থাকলেও থোকা ধরা ফল মিলবে না — তারিখ মিলিয়ে যান। খুচরা দাম মৌসুম ও ফলনভেদে ওঠানামা করে (২০২৫-এর কম ফলনের বছরে স্থানীয় বাজারে কেজিপ্রতি ৮০–১৩০ টাকা পর্যন্ত গিয়েছিল — দ্য ডেইলি স্টার), বাগান থেকে কিনলে সাধারণত হাটের চেয়ে সুবিধা মেলে। যাওয়া: গুলিস্তান/সায়েদাবাদ/আব্দুল্লাহপুর থেকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বাসে মরজাল বা সৃষ্টিগড় নেমে অটো/রিকশায় বাগান-এলাকা (ভ্রমণগাইড); চাইলে ট্রেনে নরসিংদী স্টেশন নেমে ভেলানগর হয়েও আসা যায়। ঢাকা থেকে দিনে গিয়ে দিনেই ফেরা যায় — সকালের হাট আর দুপুরের বাগান মিলিয়ে রুট সাজান।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

লটকন বাগান দেখার সেরা সময় কখন?

জুন-জুলাই — ফল পাকার মৌসুমে গাছজুড়ে থোকা থোকা লটকন ঝোলে (দ্য ডেইলি স্টার)।

নরসিংদীর লটকন কি জিআই পণ্য?

হ্যাঁ — ২০২৫ সালের ২৫ এপ্রিল জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে (দ্য ডেইলি স্টার)।

বাগানে ঢুকতে কি টিকিট লাগে?

আনুষ্ঠানিক টিকিট নেই, তবে ব্যক্তিগত বাগান বলে মালিকের অনুমতি আবশ্যক (ভ্রমণগাইড)।

কোন এলাকায় বাগান সবচেয়ে বেশি?

শিবপুর উপজেলায় — বিশেষত ছোটাবান্দা, চৈতন্য, জয়নগর এলাকায়; বেলাব ও রায়পুরাতেও প্রচুর (ভ্রমণগাইড/ডেইলি স্টার)।

লটকন কিনতে কোথায় যাবেন?

মরজাল বাজারের পাইকারি হাটে, অথবা বাগান-মালিকের কাছ থেকে সরাসরি (ভ্রমণগাইড)।

শেষকথা

কাণ্ডজুড়ে সোনালি থোকা ঝোলা লটকন গাছের সারি বর্ষার বাংলাদেশের সবচেয়ে অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্যগুলোর একটি। জিআই স্বীকৃতির পর নরসিংদীর এই বাগান-ভ্রমণ এখন শুধু ফল কেনা নয় — একটি সফল কৃষি-রূপান্তরের গল্প ছোঁয়ার অভিজ্ঞতা। মৌসুম থাকতেই ঘুরে আসুন।