চা বাগানের সবুজ যেখানে গিয়ে ঠেকে ভারত সীমান্তে, সেখানে কমলগঞ্জের ধলইয়ে দাঁড়িয়ে একটি স্মৃতিসৌধ — সাত বীরশ্রেষ্ঠের সর্বকনিষ্ঠ জনের আত্মদানের মাটিতে। ব্যাচ ৫-এর অন্য মুক্তিযুদ্ধ-কেন্দ্র তেলিয়াপাড়া ছিল যুদ্ধের পরিকল্পনার স্থান; ধলাই যুদ্ধের নিজের মাটি।
ছেলেটি: জন্ম ১৯৫৩, যোগদান ১৯৭১
- পরিচয়: সিপাহী মোহাম্মদ হামিদুর রহমান — জন্ম ২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৩, তৎকালীন যশোর জেলার মহেশপুরের খোরদা খালিশপুর গ্রামে (বর্তমান ঝিনাইদহ); পিতা আক্কাস আলী মণ্ডল, মাতা কায়মুন্নেসা (সিলেট ভয়েস; জীবনী-বিবরণ)।
- সেনাজীবন:১৯৭১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দেন (ইংরেজি উইকিপিডিয়া) — জন্মদিনেই সৈনিক হওয়ার এই সমাপতন তাঁর জীবনকাহিনির অদ্ভুত সুন্দর একটি তথ্য। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর কর্মক্ষেত্র হয় সিলেট অঞ্চলের সীমান্ত — ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্য হিসেবে।
২৮ অক্টোবর ১৯৭১: ধলাইয়ের যুদ্ধ
- পরিস্থিতি: কমলগঞ্জের ধলই সীমান্ত ফাঁড়ি (বিওপি) দখলের অভিযানে ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অগ্রযাত্রা আটকে যায় ফাঁড়ির দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ থেকে অবিরাম গুলি ছোড়া পাকিস্তানি মেশিনগান পোস্টে (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)।
- আত্মদান: গ্রেনেড নিক্ষেপের দায়িত্ব নেন হামিদুর। পাহাড়ি খাল-নালা বেয়ে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে তিনি দুটি গ্রেনেড ছোড়েন; গুলিবিদ্ধ হয়েও ঝাঁপিয়ে পড়েন মেশিনগান পোস্টে, দুই পরিচালকের সঙ্গে হাতাহাতি যুদ্ধে নিষ্ক্রিয় করে দেন মেশিনগানটি। তাঁর এই আত্মত্যাগেই রেজিমেন্ট ফাঁড়ির প্রথম সারি দখল করে নেয় — যুদ্ধক্ষেত্রেই পাওয়া যায় তাঁর মরদেহ (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)। স্থানীয় ভ্রমণ-বিবরণে ঘটনাটিকে কখনো কখনো ‘দুটি মেশিনগান পোস্ট ধ্বংস’ বলে বলা হয়; মূল ঘটনাপ্রবাহ একই — এক কিশোর সিপাহীর একক বীরত্বে ফাঁড়ি দখল, কয়েক দিনের মধ্যেই ধলই ফাঁড়ি পুরোপুরি মুক্তিযোদ্ধাদের অধীনে আসে (আদারবেপারী)।
- স্বীকৃতি: মরণোত্তর বীরশ্রেষ্ঠ — বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বীরত্ব সম্মান; মাত্র ১৮ বছর বয়সে শহীদ হয়ে তিনি সাতজনের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ। গত ২৮ অক্টোবর ২০২৬ ছিল তাঁর ৫৫তম শাহাদাত বার্ষিকী (সিলেট ভয়েস) — প্রতি বছর এই দিনে ধলই সৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে উপজেলা প্রশাসন, মুক্তিযোদ্ধা সংগঠন ও বিজিবি (নিউজবাংলা)।
৩৬ বছর পরের প্রত্যাবর্তন
- যুদ্ধের পর সহযোদ্ধারা তাঁকে সমাধিস্থ করেন সীমান্তের ওপারে — ত্রিপুরার আমবাসার কাছে হাতিমারাছড়া গ্রামের এক পরিবারের পারিবারিক কবরস্থানে (নিউজবাংলা; ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস)।
- ২০০৭ সালের ১০ ডিসেম্বর দেহাবশেষ দেশে আনা হয় (গার্ড অব অনার দিয়ে ত্রিপুরা থেকে হস্তান্তর), ১১ ডিসেম্বর ঢাকার মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পুনঃসমাহিত হন তিনি (ইংরেজি উইকিপিডিয়া; ডেইলি স্টার)। বীরশ্রেষ্ঠদের মধ্যে এভাবে দেহাবশেষ ফিরে আসার ঘটনা মাত্র দুটি — প্রথমটি মতিউর রহমানের (ডেইলি স্টার)।
স্মৃতি কমপ্লেক্স: যা আছে
- অবস্থান: শ্রীমঙ্গল থেকে ~২২ কিমি দূরে, কমলগঞ্জের ধলই চা বাগানে, ধলই বিওপির বিজিবি ক্যাম্পের সংলগ্নে — একদিকে বিজিবি ক্যাম্প, অন্যদিকে চা বাগান, দক্ষিণে ভারত সীমান্ত (আদারবেপারী; ভ্রমণগাইড)।
- নির্মাণ-ইতিহাস: স্বাধীনতার দুই দশক পর ১৯৯২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন বিডিআর কর্মকর্তা লে. কর্নেল মো. বজলুল করিম এখানে নামফলক-স্মৃতিস্তম্ভের উদ্বোধন করেন। পরে ধলই বিওপি সংলগ্ন ৭৪ শতাংশ জমিতে পূর্ণাঙ্গ স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় (সময়ের আলোর বিবরণে ৩০ এপ্রিল ২০০৩, অর্থমন্ত্রী এম. সাইফুর রহমান কর্তৃক; কোনো কোনো বিবরণে সালটি ২০০৫ বলা হয়েছে) — ধাপে ধাপে গড়ে ওঠে আজকের কমপ্লেক্স।
- জাদুঘর ও আর্কাইভ: সৌধের পাশে বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর এবং বিজিবি ক্যাম্পের সামনে স্মৃতি আর্কাইভ — প্রদর্শিত তাঁর ছোটবেলার ছবি, পারিবারিক তথ্য ও ছবিসহ স্মারক (সময়ের আলো)। ভানুগাছ চৌমুহনী থেকে মাধবপুর-পাত্রখোলাগামী প্রধান সড়কটির নামকরণ হয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান সড়ক।
- আরেকটি ঠিকানা: নিজ গ্রাম ঝিনাইদহের খালিশপুরে কলেজ মাঠে রয়েছে শহীদ হামিদুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর ও গ্রন্থাগার (ভ্রমণগাইড) — জন্মভূমি ও শাহাদাতভূমি, দুই প্রান্তেই তাঁর স্মৃতি সংরক্ষিত।
যাওয়া ও শিষ্টাচার
- রুট: শ্রীমঙ্গল থেকে ভানুগাছ-কমলগঞ্জ হয়ে ধলই চা বাগান; সিএনজিতে সরাসরি যাওয়া যায়। একই দিনে মাধবপুর লেক ও মণিপুরী পল্লীর সঙ্গে এক সূত্রে গাঁথা যায় — সড়কটাই তো তাঁর নামে।
- শিষ্টাচার: এটি সীমান্ত-সংলগ্ন এলাকা — বিজিবি ক্যাম্পের দিকে ছবি তোলা বা সীমান্তের দিকে এগোনোতে স্থানীয় নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনে চলুন। সৌধ প্রাঙ্গণে আচরণ হোক শ্রদ্ধার — এটি পিকনিক স্পট নয়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
হামিদুর রহমান কেন সর্বকনিষ্ঠ বীরশ্রেষ্ঠ?
শাহাদাতের সময় তাঁর বয়স মাত্র ১৮ বছর (জন্ম ১৯৫৩) — সাত বীরশ্রেষ্ঠের মধ্যে সবচেয়ে কম।
তাঁর কবর এখন কোথায়?
ঢাকার মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে — ২০০৭ সালে ত্রিপুরা থেকে দেহাবশেষ এনে পুনঃসমাহিত করা হয়। ধলইয়ে রয়েছে স্মৃতিসৌধ ও জাদুঘর, সমাধি নয়।
কোন দিনে গেলে অনুষ্ঠান দেখা যাবে?
২৮ অক্টোবর শাহাদাত বার্ষিকীতে ধলইয়ে আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা নিবেদন হয়; এ ছাড়া বিজয় দিবস ও স্বাধীনতা দিবসেও দর্শনার্থী বাড়ে।
শেষকথা
ব্যাচ ৫-এর শেষ পোস্টটি তাই শেষ হলো শ্রদ্ধায়: চা বাগানের জেলার সবুজে দাঁড়িয়ে থাকা এই সৌধ মনে করিয়ে দেয়, এই জনপদের মাটি শুধু পর্যটনের নয় — ইতিহাসেরও। শ্রীমঙ্গল সফরে এক ঘণ্টা সময় ধলইয়ের জন্য রাখুন। এর মধ্য দিয়েই শেষ হলো ব্যাচ ৫ — সিলেট বিভাগের ৩৯টি পোস্টের যাত্রা।