• 29 Oct, 2026

হাকালুকি হাওর: ২৩৮ বিলের দেশে শীতের পাখি-উৎসব

হাকালুকি হাওর: ২৩৮ বিলের দেশে শীতের পাখি-উৎসব

দেশের বৃহত্তম হাওরগুলোর অন্যতম হাকালুকি (~১৮,১১৫ হেক্টর; কুলাউড়া-জুড়ী-বড়লেখা-ফেঞ্চুগঞ্জ-গোলাপগঞ্জ), ১৯৯৯ সাল থেকে ইসিএ; গণনায় ৫৮ হাজারের বেশি অতিথি পাখি, মাধবকুণ্ডের মাধবছড়ার গন্তব্য জলরাশি এবং ২০২৫ সালের টাঙ্গুয়ার-হাকালুকি সুরক্ষা আদেশসহ যাচাইকৃত গাইড।

বর্ষায় দিগন্তজোড়া একটানা পানি, শীতে সেই পানিই ভেঙে ছড়িয়ে যায় শত শত বিলে — হাকালুকি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় হাওরগুলোর একটি, এবং শীতকালে দেশের অন্যতম বড় পাখি-সমাবেশের ঠিকানা। আগের পোস্টের মাধবকুণ্ড ঝর্ণার পানিও শেষমেশ এসে মেশে এই হাওরেই — মাধবছড়া ধরে।

বিস্তার ও পরিচয়

  • ভূগোল: দুই জেলার পাঁচ উপজেলাজুড়ে — মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা এবং সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ও গোলাপগঞ্জ (ডেইলি স্টার)। উত্তর পাশে কুশিয়ারা নদী, পাদদেশে মেঘালয়-ত্রিপুরার পাহাড়ি ঢল — তাই প্রায় প্রতি বছরই আকস্মিক বন্যা ঢোকে এই হাওরে।
  • আকার: জলাশয়ের আয়তন ~১৮,১১৫ হেক্টর (ডেইলি স্টারসহ বহু সূত্রে); ভূমিসহ মোট এলাকার হিসাবে সংখ্যাটা আরও বড় পাওয়া যায়। ভেতরে পরস্পর-সংযুক্ত ২৩৮টি বিল (পর্যটন বোর্ড) — চাটলা, হাওরখাল, বালিজুড়ি, জালা, পোআলা, দুদাই, বাইয়া, গজুয়া, রঞ্চি, কালাপানির মতো বড় বিলগুলোই পাখিদের মূল আড্ডা (ডেইলি কান্ট্রি টুডে)।
  • মানুষ ও জীবিকা: হাওরপাড়ের ~১,৯০,০০০ মানুষ প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে এই জলাভূমির ওপর নির্ভরশীল — মাছ (কালিবাউস, রুই, বোয়াল, পাবদা, চাপিলাসহ শতাধিক প্রজাতি), শীতের চারণভূমি আর খড়ের উপকরণে।
  • মর্যাদা: ধ্বংস হতে থাকা হিজল-করচের জলজ বন ও কমতে থাকা পাখির কারণে সরকার ১৯৯৯ সালের এপ্রিলে হাকালুকিকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করে (ডেইলি স্টার)। মনে রাখুন — হাকালুকি রামসার সাইট নয় (বাংলাদেশের রামসার সাইট সুন্দরবন ও টাঙ্গুয়ার হাওর); কোনো কোনো সরকারি প্রচারপাতায় ভুল করে রামসার লেখা থাকলেও সেটি সঠিক নয়।

পাখির হিসাবে গর্ব ও সতর্কবার্তা

  • গণনার ছবি: বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের জরিপে হাকালুকির ৪০টি বিলে এক মৌসুমে গোনা গেছে ৫০ প্রজাতির ৫৮,২৮৯টি পাখি — যার মধ্যে হাঁসই ৩৭,৩৩৮টি (ডেইলি কান্ট্রি টুডে)। সব মিলিয়ে হাওরে নথিভুক্ত পাখির প্রজাতি বিভিন্ন হিসাবে ২৩৮ থেকে ৪১৬।
  • তারকা অতিথি: হিমালয় পেরিয়ে আসা রাজহাঁস (বার-হেডেড গুজ) — মিঠাপানির জলাভূমিতে এখন দুর্লভদর্শন এই পাখিই হাকালুকির সবচেয়ে আকর্ষণীয় অতিথি (শিক্ষামূলক বিবরণ)। সঙ্গে নানা সরালি, চখাচখি, সৈকতপাখির দল।
  • কিন্তু ধারা নিম্নমুখী: বার্ড ক্লাব ও আইইউসিএনের পর্যবেক্ষণে দেশে পরিযায়ী পাখি ২০ বছরে ~৩৫% কমেছে, হাকালুকিতে কমেছে ~৪৫%; ২০০০ সালের আগে প্রতি শীতে এখানে আসত ৭৫,০০০–৮০,০০০ পাখি (নিউ নেশন)। কারণ হিসেবে উঠে এসেছে আবাস ধ্বংস, জলবায়ু পরিবর্তন আর কৃষিতে অতিরিক্ত কীটনাশক।
  • তবু আশার খবরও আছে: বিষ-টোপে পাখি শিকারের বিরুদ্ধে স্থানীয় সচেতনতা বেড়েছে — সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো কোনো বছর এখন মৃত পাখি পাওয়াই যাচ্ছে না, যেখানে আগে মৌসুমে পঞ্চাশের বেশি মৃত পাখি মিলত (নিউ নেশন)। চাটলা ও দোহ বিল এলাকায় পাখির বিশ্রামের জন্য হিজল-করচ-বরণ-মুর্তা রোপণের উদ্যোগও চলছে, যদিও প্রয়োজনের তুলনায় কম (ডেইলি স্টার)।

সুরক্ষা আদেশ ২০২৫ — ভ্রমণকারীর যা জানা জরুরি

টাঙ্গুয়ার হাওরের মতো হাকালুকিও এসেছে নতুন আইনি ছাতার নিচে: ২০২৫ সালের ৬ নভেম্বর সরকার পানি আইন, ২০১৩-এর ২২ ও ২৭ ধারায় জারি করে ‘টাঙ্গুয়ার হাওর ও হাকালুকি হাওর সুরক্ষা আদেশ, ২০২৫’ — ১৯টি নির্দেশনা (বিএসএস; ইউএনবি)। ভ্রমণকারীর জন্য মূল কথা:

  • পরিযায়ীসহ সব পাখি শিকার ও পাখিসমৃদ্ধ এলাকায় বাণিজ্যিক হাঁস পালন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ; হিজল-করচ কাটা বা জলজ বনের ক্ষতি করা যাবে না।
  • জেলা প্রশাসন/পরিবেশ অধিদপ্তর চিহ্নিত সংবেদনশীল এলাকায় (পাখি-মাছের আবাস ও প্রজননক্ষেত্রে) পর্যটক ও নৌকার প্রবেশ নিষেধ।
  • শিক্ষা সফর ও বিদেশি পর্যটক পরিবহনে জেলা প্রশাসনের পূর্বানুমতি লাগবে; নৌকায় উচ্চ শব্দে গান-পার্টি ও একবার-ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধ।
  • ২০২৬ সালের এপ্রিলে আদেশটির একটি গেজেট সংশোধনীও প্রকাশিত হয়েছে (পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট) — মাঠপর্যায়ে কোন বিলে কী নিয়ম, স্থানীয় প্রশাসন/ব্যবস্থাপকদের কাছ থেকে জেনে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ (সাতমাকান্ঠা সম্পাদকীয়, অক্টোবর ২০২৬)।

দেখা ও যাওয়া

  • প্রবেশদ্বারসমূহ: কুলাউড়া দিক (চাটলা বিলের পাড়সহ) পাখি দেখার সবচেয়ে প্রচলিত ভিত্তি; এ ছাড়া জুড়ী, বড়লেখা ও ফেঞ্চুগঞ্জ দিক থেকেও হাওরে ঢোকা যায়। মৌলভীবাজার সদর থেকে হাওরের দূরত্ব ~৬৫ কিমি (পর্যটন বোর্ড)।
  • বর্ষা বনাম শীত: বর্ষায় (জুন–সেপ্টেম্বর) নৌকায় ‘সাগর’ — দিগন্তহীন পানি, গ্রামগুলো দ্বীপের মতো। শীতে (নভেম্বর–ফেব্রুয়ারি) বিলে বিলে নৌকা ঘুরিয়ে পাখি দেখা — দূরবীন ছাড়া হাকালুকি অর্ধেক দেখা।
  • থাকা: হাওরের ভেতরে থাকার ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি বললেই চলে; কুলাউড়া, জুড়ী, বড়লেখা বা শ্রীমঙ্গলের হোটেলে থেকে দিনের সফর করাই প্রচলিত পন্থা।

হাকালুকি-দিনের নমুনা সূচি (শীতে)

  • ভোর: কুলাউড়া থেকে রওনা; চাটলা বিলে নৌকা নিয়ে সূর্যোদয়ের পাখি-ঝাঁক।
  • বেলা: বিল থেকে বিলে — হাঁস, রাজহাঁসের খোঁজে; পাড়ের গ্রামে চা।
  • বিকেল: হিজল-করচের ছায়ায় ফেরার নৌকা; সূর্যাস্ত হাওরের পানিতে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

হাকালুকি কি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় হাওর?

‘সবচেয়ে বড়’ দাবি নিয়ে হাওরভেদে মতভেদ আছে; হাকালুকি দেশের বৃহত্তম হাওরগুলোর অন্যতম (~১৮,১১৫ হেক্টর জলাশয়, ২৩৮ বিল) — এটুকু নথিভুক্ত।

টাঙ্গুয়ারের মতো হাউসবোট আছে?

না — হাকালুকিতে হাউসবোট-পর্যটন গড়ে ওঠেনি; স্থানীয় নৌকায় দিনের সফরই এখানকার ধরন, এবং সুরক্ষা আদেশের সংবেদনশীল-এলাকার নিয়ম এখানেও প্রযোজ্য।

কোন ঋতুতে যাব?

পাখির জন্য শীত, পানির বিশালতার জন্য বর্ষা — দুটোই স্বতন্ত্র অভিজ্ঞতা। আকস্মিক বন্যার মৌসুমে আবহাওয়া দেখে যান।

শেষকথা

হাকালুকি এখনো ‘আবিষ্কৃত’ হয়নি পর্যটনের কাছে পুরোপুরি — আর হয়তো সেটাই এর সৌভাগ্য। কম ভিড়ে, বেশি পাখির এই হাওরটাই অনেকের কাছে হয়ে উঠতে পারে সিলেট বিভাগের সেরা চমক।