• 29 Oct, 2026

পৃথিমপাশা নবাব বাড়ি: পাঁচ শতকের জীবন্ত জমিদারি

পৃথিমপাশা নবাব বাড়ি: পাঁচ শতকের জীবন্ত জমিদারি

কুলাউড়ার পৃথিমপাশায় লংলার নবাব পরিবারের বাড়ি — পারস্যের খোরাসান থেকে আসা সখী সালামতের বংশধারা প্রায় ১৪৯৯ সাল থেকে; ১৮৫৭-র সিপাহী-পর্ব, আলী আমজাদের ঘড়ির সূত্র, ইমামবাড়া-মহরম ঐতিহ্য ও শাহ-ই-ইরানের সফরসহ এখনো বংশধরদের বসবাস করা ‘জীবন্ত জমিদার বাড়ি’র যাচাইকৃত ইতিহাস-গাইড।

বাংলাদেশের বেশির ভাগ জমিদার বাড়ি আজ ধ্বংসস্তূপ বা জাদুঘর — কিন্তু কুলাউড়ার পৃথিমপাশা নবাব বাড়ি ব্যতিক্রম: এখানে জমিদারির বংশধরেরা এখনো বাস করেন, দীঘির ঘাটে এখনো সকালের স্নান হয়, ইমামবাড়ায় মহরমে এখনো ভিড় জমে। বলা হয়, এমন ‘জীবন্ত’ জমিদার বাড়ি দেশে দ্বিতীয়টি নেই (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

পরিবারটি: খোরাসান থেকে লংলা

  • প্রতিষ্ঠাতা: পরিবারটি শিয়া পারসিক সম্ভ্রান্ত বংশ — আদি নিবাস গ্রেটার খোরাসান (বর্তমান ইরান-আফগান সীমান্ত অঞ্চল)। প্রতিষ্ঠাতা সখী সালামত পঞ্চদশ শতকের শেষে উপমহাদেশে আসেন; দিল্লির লোদি দরবার হয়ে সিলেটে এসে লংলা পরগনার পৃথিমপাশা মৌজায় জাগির পেয়ে এখানেই বসতি গাড়েন — সালটি প্রচলিত হিসাবে ~১৪৯৯ (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)। তাঁর পুত্র ইসমাইল খান লোদী মুঘলদের কাছ থেকে জাগির ও ‘নবাব’ মর্যাদা পান — সেই থেকে পরিবারটি লংলার নবাব নামে পরিচিত।
  • রবির বাজার: বংশের চতুর্থ পুরুষ মৌলভী মুহাম্মদ রবি খান দানিশমন্দ ১৭৫৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন আজকের পরিচিত রবির বাজার (ইংরেজি উইকিপিডিয়া) — কুলাউড়ার এই জনপদে যাওয়ার পথে বাজারটি আজও সক্রিয়; পাশে ছোট সাহেব বাড়ির বেগম তালিব-উন-নিসা খাতুনের প্রতিষ্ঠিত রবির বাজার জামে মসজিদ।
  • ১৮৫৭-র পর্ব: সিপাহী বিদ্রোহের সময় চট্টগ্রাম কোষাগার লুট করে পালিয়ে আসা ৩০০ বিদ্রোহী সিপাহী আশ্রয় নেয় নবাব গাউস আলী খানের কাছে; কয়েক দিন কোষাগার বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণেই থাকে (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)। পরে গাউস আলী খান গ্রেপ্তার হলেও প্রমাণের অভাবে মুক্তি পান।

আলী আমজাদ ও আলী হায়দার: উজ্জ্বল দুই পুরুষ

  • নবাব আলী আমজাদ খান (১৮৭১–১৯০৫): বৃহত্তর সিলেটের সবচেয়ে প্রতাপশালী জমিদারদের একজন, আলীগড়ে পড়াশোনা করা মানবহিতৈষী — মৌলভীবাজার-কুলাউড়ায় স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা ও সুপেয় পানির দীঘি খননে তাঁর নাম জড়িয়ে (শিক্ষক বাতায়ন)। তাঁর পিতা আলী আহমদ খান ১৮৭২ সালে সিলেট শহরে পুত্রের নামে যে ঘড়িঘর বানান, সেটিই আজকের বিখ্যাত আলী আমজাদের ঘড়ি — সিলেট শহর ভ্রমণে যা না দেখলেই নয়।
  • অতিথি-তালিকা: আলী আমজাদের আমলে এই বাড়িতে অতিথি হয়েছিলেন ত্রিপুরার মহারাজা রাধাকিশোর মাণিক্য এবং ইরানের শাহ; শাহের সফরের নিরাপত্তায় পাকিস্তান সরকার তখন পাঠিয়েছিল তরুণ জেনারেল আইয়ুব খানকে — যিনি পরে ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হন (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)।
  • নবাব আলী হায়দার খান (১৯০০–১৯৬৩): আলী আমজাদের পুত্র — ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতা, মুসলিম লীগের রাজনীতিবিদ ও মন্ত্রী (বাংলা উইকিপিডিয়া)। পরের প্রজন্মের আলী সারওয়ার খান ও আলী আব্বাস খান স্বাধীন বাংলাদেশে সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হন (ইংরেজি উইকিপিডিয়া)। পরিবারটির ভূমিকা ছুঁয়ে গেছে ১৮৫৭, ১৯৪৭-এর সিলেট গণভোট আর ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকেও।

যা দেখবেন

  • বিস্তার: মৌলভীবাজার জেলা সদর থেকে ~৪৭ কিমি পূর্বে, কুলাউড়া উপজেলার পৃথিমপাশা গ্রামে। প্রাঙ্গণের আয়তন সূত্রভেদে ২৫–৩৫ একর (বাংলা উইকিপিডিয়া; শিক্ষক বাতায়ন) — দুটি বাড়ি (বড় ও ছোট সাহেব বাড়ি), পুরনো দালানসারি, পারস্য-মুঘল-ব্রিটিশ ছাপের স্থাপত্য ও কারুকার্যময় আসবাব।
  • দীঘি: বাড়িতে ঢুকতেই বাঁ পাশে শান-বাঁধানো ঘাটসহ বিশাল দীঘি (শিক্ষক বাতায়ন)।
  • ইমামবাড়া: প্রাঙ্গণের সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থাপনা — শিয়া সম্প্রদায়ের নকশাখচিত এই ইমামবাড়াকে অঞ্চলের প্রাচীনতম ইমামবাড়াগুলোর একটি মনে করা হয়; ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পের পর আলী আমজাদ খান এটি পুনর্নির্মাণ/সংস্কার করেন, পরে আলী হায়দার ও আলী আসগর খানের আমলেও পরিবর্তন আসে (ডেইলি স্টারের ঐতিহাসিক প্রতিবেদন)। পূর্ব পাকিস্তান আমলে এখানকার মহরমের অনুষ্ঠানে সারা পাকিস্তান-ভারত থেকে মানুষ আসত — আজও মহরমে এখানে বড় সমাবেশ হয়।
  • একদার জাঁক: পুরনো বর্ণনায় হাতির পিলখানা, বাঘ-হরিণ-ময়ূরের কথা এসেছে (শিক্ষক বাতায়ন) — সে যুগ গেছে, কিন্তু প্রাঙ্গণের গাছগাছালি আর সাজানো-গোছানো রূপ দেখলে জমিদারি রুচির আন্দাজ মেলে। সরকারের জেলা প্রশাসন বাড়িটিকে জেলার গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে তালিকাভুক্ত রেখেছে (আই নিউজ, জেলা প্রশাসন সূত্রে)।

যাওয়া ও শিষ্টাচার

  • রুট: মৌলভীবাজার/শ্রীমঙ্গল থেকে কুলাউড়া হয়ে রবির বাজার; সেখান থেকে পৃথিমপাশা গ্রামের পথে সিএনজি/রিকশা। একই দিনে কুলাউড়ার গা ঘেঁষা হাকালুকি হাওরের পাড়ও ঘুরে আসা যায়।
  • সবচেয়ে জরুরি কথা: এটি ব্যক্তিগত বসতবাড়ি — মালিক পরিবার এখানে থাকেন। গেটের বাইরে থেকে ও দীঘির দিক থেকে দেখা সাধারণত সম্ভব হলেও, আঙিনায় ঢোকা, ছবি তোলা বা দালানের ভেতরে যাওয়ার আগে অবশ্যই বাড়ির লোকজনের অনুমতি নিন; অনুমতি না মিললে বাইরে থেকেই দেখে ফিরুন। নির্দিষ্ট খোলার সময় বা টিকিটের ব্যবস্থা নেই — ভ্রমণটা রাখুন মর্যাদার মধ্যে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

পৃথিমপাশা পরিবার কত পুরনো?

প্রচলিত হিসাবে প্রায় ১৪৯৯ সাল থেকে — ৫০০ বছরের বেশি সময় ধরে একই পরিবার একই জায়গায়, যা বাংলাদেশে বিরল।

আলী আমজাদের ঘড়ির সঙ্গে এই বাড়ির সম্পর্ক কী?

ঘড়িঘরটি আলী আমজাদের পিতা আলী আহমদ খান পুত্রের নামে ১৮৭২ সালে সিলেটে নির্মাণ করেন — পরিবারটির প্রভাব তখন সিলেট শহর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

মহরমের সময় যাওয়া যাবে?

ইমামবাড়ায় মহরমে বড় ধর্মীয় সমাবেশ হয়; দর্শনার্থী হিসেবে শিষ্টাচার মেনে ও ভিড়ের প্রস্তুতি নিয়ে যাওয়া যায় — তবে সেটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান, পর্যটন নয়, এই মনোভাব রাখুন।

শেষকথা

পাঁচ শতকের ইতিহাস যে বাড়িতে এখনো প্রতিদিনের জীবন — পৃথিমপাশা তাই জমিদার বাড়ির তালিকায় আলাদা। শ্রীমঙ্গল-কুলাউড়া সফরে আধ বেলা সময় রাখুন এর জন্য। ব্যাচের শেষ পোস্টে এবার মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি — বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমানের স্মৃতি কমপ্লেক্স।