নিউ মার্কেটের ভিড় ছাড়িয়ে পাহাড় বেয়ে উঠলেই চোখে পড়ে লাল রঙের বিশাল প্রাসাদ — চট্টগ্রাম কোর্ট বিল্ডিং। যে পাহাড়ে এটি দাঁড়িয়ে, তার আদি নাম পরীর পাহাড় (ফেয়ারি হিল); ভবন আসার পর থেকে মানুষের মুখে তা হয়ে গেছে ‘কাচারি পাহাড়’ বা ‘কোর্ট হিল’। পাশের লালদীঘি: চট্টগ্রামের ঐতিহ্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি-র সঙ্গে মিলিয়ে এই পাহাড়টাই পুরনো শহরের প্রশাসনিক হৃদয়।
পাহাড়ের আগের গল্প
- পর্তুগিজ আমলে এই পাহাড় ছিল ব্যবসায়ী জন হ্যারির ব্যক্তিগত সম্পত্তি; জঙ্গলাকীর্ণ পাহাড়ে তখন একটি কুটিরে পর্তুগিজদের চিকিৎসাকেন্দ্র চলত বলে বিচার বিভাগের ইতিহাসে উল্লেখ আছে।
- নানা হাত বদলে ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি পাহাড়টি কেনেন পটিয়ার ছনহরার জমিদার অখিল চন্দ্র সেন।
- ১৮৮৯ সালে আদালত ভবনের জন্য ব্রিটিশ সরকার পাহাড়টি হুকুম দখল করে।
প্রাসাদের স্থাপতত্য
১৮৯২–৯৮ সালে নির্মিত ভবনটি বাংলায় গড়ে ওঠা ইন্দো-ব্রিটিশ / ইন্দো-সারাসেনিক শৈলীর উৎকৃষ্ট নমুনা — গম্বুজ, গথিক খিলান, পদ্ম-মোটিফের টেরাকোটা ছাঁচ, ইউরোপীয় পেডিমেন্ট আর মুঘল ধাঁচের বিন্যাস একসঙ্গে। আদিতে লাল রঙের দ্বিতল ভবন (১৯৫৩ সালে আরও এক তলা যোগ হয়); শতাধিক কক্ষের এই ভবনে বর্তমানে ৭৬টি আদালত বসে। দুঃখের বিষয়, বাংলাপিডিয়ার মতে ভবনটি এখনো ঐতিহ্য-সংরক্ষণ আইনের আওতায় সুরক্ষিত নয়।
আজকের কোর্ট হিল
এখানে এখন জেলা ও দায়রা জজ আদালত, মহানগর আদালত, বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয় এবং জেলা ট্রেজারি; ধারণক্ষমতার চাপে পাশে ২০১০ সালে নতুন আদালত ভবনও নির্মিত হয়েছে। পাহাড়ের চূড়া থেকে দেখা যায় পুরনো শহর, কর্ণফুলী নদী ও বন্দরের বিস্তৃত দৃশ্য; পাদদেশে জেনারেল পোস্ট অফিস, নিউ মার্কেট আর সিডিএ ভবন।
দর্শনের নিয়ম
এটি সক্রিয় আদালত ও প্রশাসনিক এলাকা — পর্যটনকেন্দ্র নয়। বাইরে থেকে স্থাপত্য দেখা ও পাহাড়ের পথ ধরে ওঠা-নামাই মূল অভিজ্ঞতা; অফিস সময়ে ভেতরে প্রবেশে অনুমতি ও নিরাপত্তা-তল্লাশি লাগতে পারে। আদালতের মর্যাদা বজায় রাখুন, ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন।
কীভাবে যাবেন
কোতোয়ালি/নিউ মার্কেট এলাকা থেকে পাহাড়ে ওঠার পথ; জিইসি বা আন্দরকিল্লা থেকে রিকশা/সিএনজিতে সহজেই পৌঁছানো যায়। কাছেই আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ ও লালদীঘি — তিনটি ঐতিহ্য এক বিকেলে দেখা যায়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
কোর্ট বিল্ডিং কত সালে তৈরি?
১৮৯২ সালে নির্মাণ শুরু, শেষ ১৮৯৮ সালে।
‘পরীর পাহাড়’ নাম কেন?
এটি পাহাড়টির আদি নাম; কোর্ট বিল্ডিং হওয়ার পর ‘কোর্ট হিল’ নামে পরিচিতি পায়। নামের পেছনের পরী-কাহিনি লোকমুখের গল্প মাত্র।
সাধারণ দর্শনার্থী কি ভেতরে ঢুকতে পারেন?
আদালতের কাজে গেলে প্রবেশ করা যায়; নিছক দর্শনের জন্য ভেতরে ঘোরার ব্যবস্থা নেই — বাইরের স্থাপত্য ও পাহাড়ের দৃশ্যই মূল আকর্ষণ।
শেষকথা
কোর্ট বিল্ডিং চট্টগ্রামের প্রশাসনিক ইতিহাসের সবচেয়ে দৃশ্যমান স্মারক — লাল ইটের গায়ে লেগে আছে দেড় শতকের বিচার-জীবন। পাহাড়ি ধারাবাহিকতায় এরপর পড়ুন সীতাকুণ্ড: একেক মৌসুমে একেক সাজ।