• 29 Oct, 2026

কোর্ট বিল্ডিং ও পরীর পাহাড়: ১৮৯২ সালের ইন্দো-সারাসেনিক প্রাসাদে চট্টগ্রামের বিচার-ইতিহাস

কোর্ট বিল্ডিং ও পরীর পাহাড়: ১৮৯২ সালের ইন্দো-সারাসেনিক প্রাসাদে চট্টগ্রামের বিচার-ইতিহাস

পরীর পাহাড়ের কোর্ট বিল্ডিংয়ের গাইড — পর্তুগিজ ব্যবসায়ী জন হ্যারির পাহাড় থেকে ১৮৯২–৯৮ সালের লাল প্রাসাদ, ইন্দো-সারাসেনিক স্থাপতত্য, কাচারি পাহাড়ের ইতিহাস ও বর্তমান আদালত-জীবন।

নিউ মার্কেটের ভিড় ছাড়িয়ে পাহাড় বেয়ে উঠলেই চোখে পড়ে লাল রঙের বিশাল প্রাসাদ — চট্টগ্রাম কোর্ট বিল্ডিং। যে পাহাড়ে এটি দাঁড়িয়ে, তার আদি নাম পরীর পাহাড় (ফেয়ারি হিল); ভবন আসার পর থেকে মানুষের মুখে তা হয়ে গেছে ‘কাচারি পাহাড়’ বা ‘কোর্ট হিল’। পাশের লালদীঘি: চট্টগ্রামের ঐতিহ্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি-র সঙ্গে মিলিয়ে এই পাহাড়টাই পুরনো শহরের প্রশাসনিক হৃদয়।

পাহাড়ের আগের গল্প

  • পর্তুগিজ আমলে এই পাহাড় ছিল ব্যবসায়ী জন হ্যারির ব্যক্তিগত সম্পত্তি; জঙ্গলাকীর্ণ পাহাড়ে তখন একটি কুটিরে পর্তুগিজদের চিকিৎসাকেন্দ্র চলত বলে বিচার বিভাগের ইতিহাসে উল্লেখ আছে।
  • নানা হাত বদলে ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি পাহাড়টি কেনেন পটিয়ার ছনহরার জমিদার অখিল চন্দ্র সেন।
  • ১৮৮৯ সালে আদালত ভবনের জন্য ব্রিটিশ সরকার পাহাড়টি হুকুম দখল করে।

প্রাসাদের স্থাপতত্য

১৮৯২–৯৮ সালে নির্মিত ভবনটি বাংলায় গড়ে ওঠা ইন্দো-ব্রিটিশ / ইন্দো-সারাসেনিক শৈলীর উৎকৃষ্ট নমুনা — গম্বুজ, গথিক খিলান, পদ্ম-মোটিফের টেরাকোটা ছাঁচ, ইউরোপীয় পেডিমেন্ট আর মুঘল ধাঁচের বিন্যাস একসঙ্গে। আদিতে লাল রঙের দ্বিতল ভবন (১৯৫৩ সালে আরও এক তলা যোগ হয়); শতাধিক কক্ষের এই ভবনে বর্তমানে ৭৬টি আদালত বসে। দুঃখের বিষয়, বাংলাপিডিয়ার মতে ভবনটি এখনো ঐতিহ্য-সংরক্ষণ আইনের আওতায় সুরক্ষিত নয়।

আজকের কোর্ট হিল

এখানে এখন জেলা ও দায়রা জজ আদালত, মহানগর আদালত, বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয় এবং জেলা ট্রেজারি; ধারণক্ষমতার চাপে পাশে ২০১০ সালে নতুন আদালত ভবনও নির্মিত হয়েছে। পাহাড়ের চূড়া থেকে দেখা যায় পুরনো শহর, কর্ণফুলী নদী ও বন্দরের বিস্তৃত দৃশ্য; পাদদেশে জেনারেল পোস্ট অফিস, নিউ মার্কেট আর সিডিএ ভবন।

দর্শনের নিয়ম

এটি সক্রিয় আদালত ও প্রশাসনিক এলাকা — পর্যটনকেন্দ্র নয়। বাইরে থেকে স্থাপত্য দেখা ও পাহাড়ের পথ ধরে ওঠা-নামাই মূল অভিজ্ঞতা; অফিস সময়ে ভেতরে প্রবেশে অনুমতি ও নিরাপত্তা-তল্লাশি লাগতে পারে। আদালতের মর্যাদা বজায় রাখুন, ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন।

কীভাবে যাবেন

কোতোয়ালি/নিউ মার্কেট এলাকা থেকে পাহাড়ে ওঠার পথ; জিইসি বা আন্দরকিল্লা থেকে রিকশা/সিএনজিতে সহজেই পৌঁছানো যায়। কাছেই আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ ও লালদীঘি — তিনটি ঐতিহ্য এক বিকেলে দেখা যায়।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

কোর্ট বিল্ডিং কত সালে তৈরি?
১৮৯২ সালে নির্মাণ শুরু, শেষ ১৮৯৮ সালে।

‘পরীর পাহাড়’ নাম কেন?
এটি পাহাড়টির আদি নাম; কোর্ট বিল্ডিং হওয়ার পর ‘কোর্ট হিল’ নামে পরিচিতি পায়। নামের পেছনের পরী-কাহিনি লোকমুখের গল্প মাত্র।

সাধারণ দর্শনার্থী কি ভেতরে ঢুকতে পারেন?
আদালতের কাজে গেলে প্রবেশ করা যায়; নিছক দর্শনের জন্য ভেতরে ঘোরার ব্যবস্থা নেই — বাইরের স্থাপত্য ও পাহাড়ের দৃশ্যই মূল আকর্ষণ।

শেষকথা

কোর্ট বিল্ডিং চট্টগ্রামের প্রশাসনিক ইতিহাসের সবচেয়ে দৃশ্যমান স্মারক — লাল ইটের গায়ে লেগে আছে দেড় শতকের বিচার-জীবন। পাহাড়ি ধারাবাহিকতায় এরপর পড়ুন সীতাকুণ্ড: একেক মৌসুমে একেক সাজ।