• 29 Oct, 2026

জয়াগ গান্ধী আশ্রম: নোয়াখালীতে মহাত্মা গান্ধীর শান্তি-মিশনের জীবন্ত স্মৃতি

জয়াগ গান্ধী আশ্রম: নোয়াখালীতে মহাত্মা গান্ধীর শান্তি-মিশনের জীবন্ত স্মৃতি

সোনাইমুড়ির জয়াগে গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টের গাইড — ১৯৪৬-এর দাঙ্গার পর গান্ধীর চার মাসের নোয়াখালী পদযাত্রা, ২৯ জানুয়ারি ১৯৪৭-এ ব্যারিস্টার হেমন্ত কুমার ঘোষের সর্বস্ব দান, গান্ধী স্মৃতি জাদুঘরের শতাধিক ছবি ও ব্যবহৃত জিনিসপত্র; যাতায়াত ও দর্শনের তথ্যসহ।

বাংলাদেশের মাটিতে মহাত্মা গান্ধীর সবচেয়ে দীর্ঘ ও আবেগঘন অবস্থানের স্মৃতি যদি কোথাও জীবন্ত থাকে, তা নোয়াখালীর সোনাইমুড়ির জয়াগ গ্রামে। দ্বীপ-ভ্রমণের কোলাহল (হাতিয়া থেকে ঘুরে এসে) ছেড়ে এখানে এলে পাবেন ইতিহাসের এক নীরব প্রাঙ্গণ — যেখানে এক জমিদার তাঁর সর্বস্ব দান করেছিলেন শান্তির বার্তাবাহকের নামে।

পটভূমি: ১৯৪৬-এর নোয়াখালী ও গান্ধীর আগমন

১৯৪৬ সালের অক্টোবরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় রক্তাক্ত হয় নোয়াখালী ও তৎকালীন ত্রিপুরা জেলার (কুমিল্লা) বিস্তীর্ণ এলাকা। খবর পেয়ে ৭৭ বছর বয়সী মহাত্মা গান্ধী শান্তি-মিশন নিয়ে ছুটে আসেন — ১৯৪৬ সালের ৭ নভেম্বর তিনি নোয়াখালীর চৌমুহনী রেলস্টেশনে পা রাখেন এবং সেখানেই হয় তাঁর প্রথম জনসভা। এরপর প্রায় চার মাস ধরে তিনি গ্রাম থেকে গ্রামে হেঁটে — অনেক জায়গায় খালি পায়ে — ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন, উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে প্রার্থনা ও আলোচনায় বসেন। ইতিহাসবিদদের কাছে এই সফর গান্ধীর জীবনের সবচেয়ে কঠিন ও মানবিক অধ্যায়গুলোর একটি।

২৯ জানুয়ারি ১৯৪৭: এক দানের গল্প

পদযাত্রা করতে করতে ১৯৪৭ সালের ২৯ জানুয়ারি গান্ধী এসে পৌঁছান জয়াগ গ্রামে। সেখানে তিনি ওঠেন গ্রামের জমিদার ও নোয়াখালী জেলার প্রথম ব্যারিস্টার হেমন্ত কুমার ঘোষের বাড়িতে। সেদিনই হেমন্ত কুমার ঘোষ তাঁর স্থাবর-অস্থাবর সকল সম্পত্তি গান্ধীর আদর্শ প্রচার ও স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য উৎসর্গ করেন — প্রতিষ্ঠা হয় আম্বিকা কালিগঙ্গা চ্যারিটেবল ট্রাস্ট ও এই গান্ধী আশ্রম; পরিচালনার ভার দেওয়া হয় গান্ধীর সহচর চারু চৌধুরীকে। ১৯৭৫ সালে ট্রাস্টটির নাম বদলে হয় গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময় থেকে আশ্রমের কাজ শুধু দাতব্য নয় — পল্লী উন্নয়ন, শিক্ষা ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নই এখন এর মূল ব্রত; দীর্ঘদিন ধরে ট্রাস্টের সচিবের দায়িত্বে আছেন পদ্মশ্রী-প্রাপ্ত ঝর্ণা ধারা চৌধুরী (সূত্র: আশ্রম-পরিচিতি)।

জয়াগে গান্ধী মুসলিম প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করেন, এমনকি দাঙ্গা-পরবর্তী ব্যাপক গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন (প্রথম আলো) — তাঁর শান্তি-মিশন যে একপক্ষের জন্য ছিল না, এই পর্বটা তার বড় প্রমাণ। আশ্রম প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে এই ইতিহাসটা জানা থাকলে চারদিকের নীরবতা আরও গভীর মনে হবে। আশ্রম একটি চলমান প্রতিষ্ঠান — দর্শনার্থী হিসেবে প্রাঙ্গণে শৃঙ্খলা ও নীরবতা বজায় রাখুন, চলমান স্কুল/প্রশিক্ষণের ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন।

বিখ্যাত ছাগলের গল্প

জয়াগের মাটিতে জনশ্রুতি আছে অন্যরকম এক গল্পের — এখানেই নাকি গান্ধীর সঙ্গী ছাগলটি হারিয়ে/চুরি গিয়েছিল (ছাগলের দুধই ছিল তাঁর খাদ্যের অংশ)। প্রথম আলোর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এই কিংবদন্তির খোঁজ করেছে; গল্পে গান্ধীর প্রতিক্রিয়া হিসেবে প্রচলিত আছে — চোরও দরিদ্র বলেই হয়তো নিয়েছে, এই মর্মে ক্ষমাশীল এক মন্তব্য। সত্য-কিংবদন্তি যাই হোক, গল্পটা বলে দেয়, এই গ্রামের মানুষের স্মৃতিতে গান্ধী আজও কতটা কাছের।

গান্ধী-ট্রেইল: সফরের অন্য ঠিকানাগুলো

ইতিহাস-ঘন একদিন চাইলে জয়াগের সঙ্গে জুড়ে নিতে পারেন — চৌমুহনী: যেখানে ৭ নভেম্বর ১৯৪৬-এ গান্ধীর প্রথম জনসভা হয়েছিল (এমএলএ হরান ঘোষ চৌধুরীর উদ্যোগে); আর দত্তপাড়া (বেগমগঞ্জ): সফরের শুরুর দিকের আরেক জনসভার গ্রাম। তিন ঠিকানা মিলে নোয়াখালীতে গান্ধীর শান্তি-মিশনের একটা পূর্ণ ছবি পাওয়া যায় — মাইজদি থেকে চৌমুহনী কাছেই, জয়াগ তার উত্তরেই।

যা দেখবেন আজ

  • গান্ধী স্মৃতি জাদুঘর: আশ্রমের মূল ভবনে ২০০০ সালের ২ অক্টোবর যাত্রা শুরু করা জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে গান্ধীর নোয়াখালী সফরের শতাধিক দুর্লভ ছবি, তাঁর ব্যবহৃত জিনিসপত্র, বই ও প্রকাশিত লেখা। জাদুঘরটি সাধারণত সোমবার থেকে শনিবার দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে (ভ্রমণগাইড সূত্র — যাওয়ার আগে স্থানীয়ভাবে সময় মিলিয়ে নিন)।
  • গান্ধীর ভাস্কর্য: জাদুঘরের সামনে প্রাঙ্গণে স্থাপিত মহাত্মা গান্ধীর বিশাল ভাস্কর্য আর চারদিকে তাঁর বাণী-সংবলিত সাইনবোর্ড।
  • হেমন্ত ঘোষের বাড়ি ও প্রাঙ্গণ: যে বাড়িতে গান্ধী উঠেছিলেন, সেটিই আশ্রমের কেন্দ্র; বন বিভাগের লাগানো সবুজ গাছের সারি পেরিয়ে ঢোকার পথটাই মনে শান্তি এনে দেয়।
  • ট্রাস্টের উন্নয়ন কাজ: স্কুল-স্বাস্থ্য-প্রশিক্ষণের চলমান কার্যক্রম দেখলে বুঝবেন আশ্রমটা শুধু জাদুঘর নয়, জীবন্ত সেবা-প্রতিষ্ঠান।
  • বিশেষ উপলক্ষ: ২ অক্টোবর গান্ধী জয়ন্তীতে এখানে অনুষ্ঠান হয়; জানুয়ারি-শেষে তাঁর জয়াগ-আগমনের স্মরণেও স্থানীয়দের সমাগম ঘটে।

কীভাবে যাবেন

মাইজদি কোর্ট (নোয়াখালী শহর) থেকে আশ্রমের দূরত্ব প্রায় ২৫–৩০ কিলোমিটার উত্তরে — সোনাইমুড়ি হয়ে জয়াগ বাজার। আশ্রমটি সোনাইমুড়ী–চাটখিল ও রামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে, তাই লক্ষ্মীপুর বা কুমিল্লা দিক থেকেও চাটখিল-রামগঞ্জ হয়ে আসা যায়। ঢাকা থেকে বাসে সোনাপুর (৫৫০–৮০০ টাকা) এসে সিএনজি/লোকাল বাসে মাইজদি, সেখান থেকে সোনাইমুড়িগামী বাস বা সিএনজি রিজার্ভ করে জয়াগ বাজার — আশ্রমটি বাজারের পাশের সড়ক ধরে প্রধান ফটক দিয়েই ঢোকা যায়। ট্রেনে এলে উপকূল এক্সপ্রেসে মাইজদি নেমে একই পথ। দিনের ভ্রমণেই যথেষ্ট; জাদুঘর দেখা ও প্রাঙ্গণ ঘুরতে ১.৫–২ ঘণ্টা রাখুন।

থাকা ও খাওয়া

জয়াগে পর্যটক-থাকার ব্যবস্থা নেই বললেই চলে — থাকতে হলে মাইজদি শহরের হোটেলই ভরসা। খাওয়া জয়াগ বাজার বা সোনাইমুড়ির স্থানীয় হোটেলে; জাদুঘর-দর্শনের আগে পানি ও হালকা খাবার সঙ্গে রাখুন। বিদ্যালয়ের শিক্ষা-সফর বা গবেষণার জন্য গেলে আশ্রম কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আগেই যোগাযোগ করা ভালো।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

গান্ধী আশ্রম দেখতে কি টিকিট লাগে?

জাদুঘর-দর্শনে সাধারণত নামমাত্র বা কোনো ফি নেই — কর্তৃপক্ষের নিয়ম অনুযায়ী; দর্শনার্থী হিসেবে অনুদান দেওয়ার রেওয়াজ আছে।

গান্ধী ঠিক কতদিন নোয়াখালীতে ছিলেন?

১৯৪৬ সালের ৭ নভেম্বর থেকে ১৯৪৭ সালের মার্চের শুরু পর্যন্ত — প্রায় চার মাস (প্রথম আলো); জয়াগে তিনি আসেন ২৯ জানুয়ারি ১৯৪৭-এ।

ছবি তোলা যাবে?

প্রাঙ্গণে সাধারণত যায়, তবে জাদুঘরের ভেতরের নিয়ম মেনে চলুন — কোথাও নিষেধ থাকলে সম্মান করুন।

শেষকথা

অহিংসার বার্তা নিয়ে এক বৃদ্ধের খালি পায়ের পদযাত্রা আর এক জমিদারের সর্বস্ব-দান — জয়াগ গান্ধী আশ্রম বাংলাদেশের ইতিহাস-ভ্রমণের সবচেয়ে অনন্য ঠিকানাগুলোর একটা। শান্তি-ঐতিহ্যের এই ধারাবাহিকতায় আরও পড়ুন রামু ভ্রমণ গাইড — কক্সবাজারের বৌদ্ধ ঐতিহ্যের প্রাণকেন্দ্র।