জলের ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার অনুভূতি কেমন, জানতে হলে যেতে হবে যশোরের মণিরামপুরে — রাজগঞ্জ বাজারের সঙ্গে ঝাঁপা গ্রামকে জোড়া দেওয়া ভাসমান সেতুটিতে। ৮৩৯টি নীল প্লাস্টিক ড্রামের ওপর স্টিলের পাত বিছিয়ে তৈরি এই সেতু কোনো সরকারি প্রকল্পের ফসল নয়; এটি গড়েছেন গ্রামের ৫৬ জন যুবক, নিজেদের টাকায় আর স্বেচ্ছাশ্রমে, একজন স্বশিক্ষিত লেদ-কারিগরের নকশায়। যশোরের এই দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের আরও এক বিস্ময় কেশবপুরের হনুমান গ্রাম — দুটো মিলিয়ে একদিনের সফর সাজানো যায় সহজেই।
কেন দরকার পড়েছিল এই সেতুর
কপোতাক্ষ নদ আর ঝাঁপা বাওড়ে ঘেরা ঝাঁপা গ্রামের মানুষের রাজগঞ্জ বাজারে পৌঁছানোর একমাত্র পথ ছিল নৌকা — নয়তো প্রায় ১০ কিলোমিটার ঘুরপথ। শত শত বছর ধরে চলে আসা এই ব্যবস্থায় সবচেয়ে ভুগেছেন শিক্ষার্থীরা: নৌকা পাড়ি দিয়ে স্কুল-কলেজে যেতে গিয়ে অনেকেই পানিতে পড়েছেন, ভিজেছে বই-খাতা-পোশাক (আরটিভি অনলাইনের প্রতিবেদন)। প্রায় ১৫ হাজার মানুষের এই দৈনন্দিন দুর্ভোগ ঘোচাতেই এগিয়ে আসেন গ্রামের তরুণরা।
৫৬ যুবক, একজন কারিগর আর ৭০ লাখ টাকার স্বপ্ন
সমস্যা সমাধানে গঠিত হয় "ঝাঁপা গ্রাম উন্নয়ন ফাউন্ডেশন" — এর ৫৬ জন সদস্য গ্রামবাসীর দেওয়া অর্থ আর নিজেদের স্বেচ্ছাশ্রমে প্রায় তিন মাসের চেষ্টায় ২০১৭ সালের শুরুতে তৈরি করে ফেলেন সেতুটি; সে বছরের ২ জানুয়ারি উদ্বোধন হয় বলে সমকালীন প্রতিবেদনে এসেছে। নির্মাণ-ব্যয় প্রায় ৭০ লাখ টাকা, উপকরণ: ৮৩৯টি প্লাস্টিক ড্রাম, প্রায় ৮০০ মণ লোহার অ্যাঙ্গেল আর ২৫০টি লোহার পাত (প্রথম আলো, আরটিভি ও ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে একই হিসাব)। সেতুর প্রধান কারিগর রবিউল ইসলাম — রাজগঞ্জের একজন লেদ-মেশিন কারিগর, যাঁর প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা অভাবের কারণে মাধ্যমিকেই থেমে গিয়েছিল; প্রথম আলোর ফিচারের শিরোনামই ছিল "ভাসমান সেতুর কারিগর"। কোনো প্রকৌশলীর মতামত ছাড়া, নিজেদের পরিকল্পনায় গড়া এই সেতু দুই পাড়ের অন্তত নয়টি গ্রামের পারাপারের চিত্র বদলে দেয় — সেতুর পাশে টাঙানো সাইনবোর্ডে কারিগর হিসেবে রবিউল ইসলামের নাম আজও লেখা আছে।
মাপ নিয়ে দুই রকম হিসাব — কোনটা ঠিক?
সেতুটি সম্পর্কে লিখতে গেলে একটি অসঙ্গতি পাঠকের জানা উচিত: উদ্বোধনের সময়ের প্রতিবেদনগুলোতে (প্রথম আলো, আরটিভি, ডেইলি স্টার) সেতুর দৈর্ঘ্য প্রায় ১,০০০ ফুট ও প্রস্থ ৪ ফুট বলা হয়েছে; পরবর্তীকালের ভ্রমণ-প্রতিবেদনগুলোতে (ভ্রমণগাইড, আজকের শিক্ষা প্রভৃতি) দৈর্ঘ্য ~১,৩০০ ফুট, প্রস্থ ~৯ ফুট ও ড্রামের সংখ্যা কোথাও ৮৮৯ বলা আছে। সবচেয়ে যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা: জনপ্রিয়তার পর সেতুটি পরবর্তী সময়ে সম্প্রসারিত ও চওড়া করা হয়েছে। বর্তমান রূপ যাই হোক — দুই পাশে রেলিংযুক্ত এই সেতুর ওপর দিয়ে এখন সাইকেল, ভ্যান ও মোটরসাইকেল চলাচল করে, ভারী যান নয়। দেশের প্রথম ও দীর্ঘতম ভাসমান সেতু হিসেবে এর পরিচিতি তখন থেকেই।
পর্যটন, টিকিট আর রক্ষণাবেক্ষণের বাস্তবতা
খবর ছড়িয়ে পড়তেই সেতুটি হয়ে ওঠে দর্শনার্থীদের গন্তব্য — শুরুর দিকে সেতু-ব্যবস্থাপনা কমিটির ভাষ্যে প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার পর্যন্ত মানুষ এসেছিলেন; এখনো ছুটির দিনে ভিড় হয়। সেতুতে ওঠার টিকিট নামমাত্র (প্রথম দিকে ছিল ৫ টাকা; স্থান ও উপলক্ষ্যে ভিন্ন স্তরের টিকিটের কথাও ভ্রমণ-প্রতিবেদনে এসেছে)। পূর্ব পাড়ে পিকনিক স্পট গড়ে উঠেছে, আছে নাগরদোলাসহ ছোটখাটো রাইড, গাড়ি রাখার ব্যবস্থা আর দুই পাড়ে অস্থায়ী দোকানপাট (ভ্রমণগাইড/ভ্রমণট্রিপস)। রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সেই ফাউন্ডেশনেরই — কালবৈশাখীতে একবার সেতুর অংশবিশেষ ভেঙে পড়লে গ্রামবাসী নিজেরাই মেরামত করে দ্রুত চলাচল পুনরায় চালু করেছিলেন (ডেইলি স্টার)। তাই ঝড়-বৃষ্টির পরপর যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে যাওয়া ভালো। শীতকালে (নভেম্বর–ফেব্রুয়ারি) বাওড়ের পরিবেশ সবচেয়ে মনোরম — পিকনিকের ভিড়ও তখনই বেশি।
সেতুর দুই পাড়ের জীবন
দর্শনার্থীদের জন্য সেতুটি বিস্ময় হলেও দুই পাড়ের মানুষের কাছে এটি নিত্যদিনের পথ — অন্তত নয়টি গ্রামের প্রায় ১৫ হাজার বাসিন্দা এখন নিয়মিত এই পথে রাজগঞ্জ বাজারে আসেন, শিক্ষার্থীরা বই-খাতা শুকনো রেখে স্কুল-কলেজে যান (আরটিভি)। মজার বিষয়, যাঁদের জীবিকা ছিল বাওড়ে নৌকা চালানো, সেই মাঝিদের অনেকেই সেতুটিকে সাধুবাদ জানিয়েছিলেন — পারাপারের দুর্ভোগ তাঁদের নিজেদেরও ছিল। ভোরের দিকে সেতুর ওপর দাঁড়ালে দেখা যায় মাছ ধরার জাল আর বাজারের ঝুড়ির যাতায়াত, দুপুরে স্কুল-ফেরত শিশুদের সারি — পর্যটনের বাইরেও সেতুটি তাই একটি জীবন্ত গ্রাম-সড়ক, যার চলাচলের শৃঙ্খলা (টিকিট, রক্ষণাবেক্ষণ) স্থানীয় কমিটিই দেখভাল করে। দর্শনার্থী হিসেবে এই দৈনন্দিনতার প্রতি সম্মান রাখুন — এটি কারো সাজানো থিম পার্ক নয়, মানুষের প্রয়োজনে গড়া পথ।
কীভাবে যাবেন
যশোর শহর থেকে বাসে মণিরামপুর, সেখান থেকে স্থানীয় যানে রাজগঞ্জ বাজার — সেতুর পূর্ব প্রান্ত সেখানেই; পশ্চিম প্রান্তে ঝাঁপা গ্রাম। এলাকাটা যশোর শহর থেকে দিন-সফরের দূরত্বে; থাকার জন্য মণিরামপুর সদর বা যশোর শহরই ভরসা। সেতুতে হাঁটার সময় মাঝখানে গিয়ে দুই পাশের বাওড়ের বিস্তার দেখে নিন — হালকা ঢেউয়ে সেতুর মৃদু দুলুনিটাই এখানকার আসল অভিজ্ঞতা। ছোট যানবাহনের চলাচল থাকে বলে হাঁটার সময় ধার ঘেঁষে চলুন, রেলিংয়ে ভর দিয়ে বেশি ঝুঁকবেন না।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
সেতুটি কারা, কবে তৈরি করেন?
ঝাঁপা গ্রাম উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের ৫৬ যুবক (কারিগর রবিউল ইসলাম), গ্রামবাসীর অর্থ ও স্বেচ্ছাশ্রমে; উদ্বোধন ২০১৭ সালের ২ জানুয়ারি বলে সমকালীন প্রতিবেদনে এসেছে।
সেতুর দৈর্ঘ্য কত?
শুরুর হিসাবে ~১,০০০ ফুট; পরবর্তী ভ্রমণ-প্রতিবেদনে ~১,৩০০ ফুট — সম্ভবত পরে সম্প্রসারিত হয়েছে। প্রস্থ যথাক্রমে ৪ ফুট থেকে ~৯ ফুট।
টিকিট কত?
নামমাত্র — প্রথম দিকে ৫ টাকা; বর্তমান হার পৌঁছে যাচাই করে নিন। পিকনিক স্পট ও রাইডের খরচ আলাদা।
কী কী যান চলতে পারে?
সাইকেল, ভ্যান ও মোটরসাইকেল — ছোট যানবাহন মাত্র; ভারী যান চলাচল করে না।
সেরা সময় কখন?
শীতকাল (নভেম্বর–ফেব্রুয়ারি); ছুটির দিনে ভিড় বেশি থাকে। ঝড়ের পরপর মেরামতির কারণে বন্ধ থাকতে পারে — খোঁজ নিয়ে যান।
শেষকথা
ঝাঁপা ভাসমান সেতুর গল্প আসলে ক্ষমতার উল্টো পাঠ: উন্নয়ন সবসময় ওপর থেকে আসে না — ৫৬ জন গ্রাম্য যুবক আর একজন লেদ-কারিগর মিলে যা গড়ে তুলেছেন, তা একই সঙ্গে যোগাযোগ-ব্যবস্থা, পর্যটন-সম্পদ আর আত্মমর্যাদার প্রতীক। বাওড়ের জলে পা রেখে হাঁটার সেই অদ্ভুত রোমাঞ্চের পেছনে আছে এই বিশ্বাসটাই।