• 01 Nov, 2026

কলমাকান্দা ভ্রমণ গাইড — ১৯৭১ সালের ২৬ জুলাই নাজিরপুর বাজারে সম্মুখযুদ্ধে শহীদ সাত মুক্তিযোদ্ধার নাম-পরিচয় ও লেঙ্গুরার ফুলবাড়িতে 'সপ্তশিখা' সমাধি, গণেশ্বরী নদীর ভাঙনে সমাধির ঝুঁকি (২০২৩) এবং রংছাতি-লেংগুরার পাহাড়ি জনপদ ও পাতলাবনের চিত্র।

দুর্গাপুরের পাশের উপজেলা কলমাকান্দা — টঙ্ক আন্দোলনের দিনে এই থানা ছিল প্রথাটির অন্যতম কেন্দ্র; ১৯৭১ সালে এখানেই ঘটে নেত্রকোণার মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে গৌরবময় সম্মুখযুদ্ধগুলোর একটি। লেঙ্গুরার ফুলবাড়িতে মেহগনি গাছের ছায়ায় শায়িত সাতজন বীর — তাঁদের সমাধি 'সপ্তশিখা' নামে পরিচিত। এই পোস্ট সেই যুদ্ধের, সেই সাত নামের এবং ভাঙনের মুখে দাঁড়ানো সমাধিস্থলের গল্প।

২৬ জুলাই ১৯৭১: নাজিরপুরের সম্মুখযুদ্ধ

খবর এসেছিল: বিরিশিরি থেকে পাকবাহিনীর রসদ যাবে কলমাকান্দার ক্যাম্পে, পথে নাজিরপুর বাজার। নাজমুল হক তারার নেতৃত্বে মাত্র ১৭ জন মুক্তিযোদ্ধা বাজারের প্রবেশপথগুলোতে অ্যামবুশ পাতেন (বাসস/ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস)। বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে নৌকায় করে পাক সৈন্যরা এগিয়ে এলে হালকা মেশিনগানের গুলিতে শুরু হয় যুদ্ধ; দিনভর চলা সেই লড়াইয়ে কমান্ডার তারা গুলিবিদ্ধ হন, আর অ্যামবুশ তুলে নেওয়ার মুহূর্তে শত্রুর মুখোমুখি হয়ে কয়েকজন যোদ্ধা বন্দি অবস্থায় বেয়নেট চার্জে শহীদ হন (ভ্রমণপ্রিয়)। বাসসের হিসাবে সেই যুদ্ধে ১৯ জন পাক সৈন্য নিহত হয় এবং শেষ পর্যন্ত পাকবাহিনী পিছু হটলে মুক্তিযোদ্ধারা নাজিরপুর বাজারে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা ওড়ান। দিনটি আজও পালিত হয় 'ঐতিহাসিক নাজিরপুর দিবস' হিসেবে।

সাত শহীদ: নামগুলো মনে রাখুন

সেই যুদ্ধে শহীদ হন সাতজন (জেলা প্রশাসন/বাংলা উইকিপিডিয়া; ডেইলি স্টার): ডা. আব্দুল আজিজ, মো. ফজলুল হক, মো. ইয়ার মাহমুদ, ভবতোষ চন্দ্র দাস, মো. নূরুজ্জামান, দ্বীজেন্দ্র চন্দ্র বিশ্বাস ও মো. জামাল উদ্দিন। তাঁরা এসেছিলেন তিন জেলা থেকে — আজিজ ও ফজলুল নেত্রকোণার; ইয়ার মাহমুদ, ভবতোষ, নূরুজ্জামান ও দ্বীজেন্দ্র ময়মনসিংহের; জামাল উদ্দিন জামালপুরের (ডেইলি স্টার)। পরদিন, ২৭ জুলাই, সহযোদ্ধারা তাঁদের মরদেহ নিয়ে যান সীমান্তবর্তী লেঙ্গুরা ইউনিয়নের ফুলবাড়িতে — সেখানে সমাহিত ও দাহ করা হয়। সেই সমাধিস্থলই সাত শহীদের মাজার, অপর নাম 'সপ্তশিখা' — সাতটি শিখা (বাংলা উইকিপিডিয়া)। মেহগনি গাছের সারির নির্জন প্রাঙ্গণে, পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া গণেশ্বরী নদীর ধারে এই সমাধি — পর্যটন-কেন্দ্রের জমক নেই, আছে নীরব শ্রদ্ধার আবহ (ভ্রমণ গাইড)।

ভাঙনের মুখে সমাধি: সতর্কবার্তা

দুঃখের হালনাগাদ — ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী গণেশ্বরী নদীর অব্যাহত ভাঙনে সমাধিস্থলটি বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে; নদীপাড়ের পাকা সড়কটিও প্রতি বছর ভাঙছে। স্থানীয়দের দাবি: নদীতে গাইড ওয়াল নির্মাণ ও শহীদদের পূর্ণ তথ্যসহ একটি জাদুঘর; উপজেলা এলজিইডি সড়ক মেরামত ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে গাইড ওয়ালের প্রকল্প প্রস্তাব পাঠিয়েছে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে (ডেইলি স্টার)। যাওয়ার আগে জেনে রাখুন বর্তমান অবস্থা আগের যেকোনো বর্ণনার চেয়ে বদলে যেতে পারে — এবং এই জায়গাটি দেখতে যাওয়ার যুক্তি শুধু পর্যটন নয়, সংরক্ষণের দাবিতে সাক্ষী হওয়াও।

কলমাকান্দার চারপাশ: পাহাড়ের পাদদেশের জনপদ

নামের পেছনে দুটি জনশ্রুতি — জলজ কলমি গাছে ভরা উঁচু ভূমি (কান্দা) থেকে 'কলমকান্দা', কিংবা পাহাড়ি কমলার বাণিজ্যকেন্দ্র থেকে 'কমলাকান্দা' (উপজেলা প্রশাসন)। এলাকাটি এককালে সুসং পরগনার অন্তর্ভুক্ত ছিল। উপজেলার রংছাতি, লেংগুরা ও খারনৈ ইউনিয়নে মেঘালয়-সংলগ্ন পাহাড়ি জনপদ ও সবুজ প্রকৃতি; লেংগুরা টিলা ও মহাদেও নদীর তীরের পাতলাবন (বালুচর, সবুজ মাঠ আর গারো জনপদের মিশেল) স্থানীয়দের প্রিয় বিচরণস্থল (খোলা কাগজ; ক্লিপজ্যাগ)। রংছাতির পাঁচগাঁও ও চন্দ্রডিঙ্গা পাহাড় এই উপজেলার সবচেয়ে পরিচিত নাম — তবে মনে রাখুন, সেখানে নির্মিত পর্যটন-অবকাঠামো দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে আছে (খোলা কাগজ, ২০২৬)। মূল ঘাঁটি নেত্রকোণা শহর থেকে উত্তরমুখী এই পুরো বেল্টটাই সীমান্ত-ঘেঁষা — বিজিবির নির্দেশনা ও সীমান্ত-শিষ্টাচার মেনে চলা বাধ্যতামূলক।

ভ্রমণ তথ্য

যাওয়া: নেত্রকোণা সদর থেকে লেঙ্গুরা ~৫৪ কিলোমিটার (ভ্রমণপ্রিয়) — শহর থেকে মোটরসাইকেল রিজার্ভ করে কলমাকান্দা হয়ে লেঙ্গুরা বাজার পেরিয়ে ফুলবাড়ির সমাধিতে পৌঁছানো সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ (ভ্রমণ গাইড)। ঢাকা মহাখালী থেকে কলমাকান্দার সরাসরি রাতের বাসও আছে (আদার ব্যাপারী — সময়সূচি বদলায়, যাচাই করুন)। সেরা সময়:২৬ জুলাই নাজিরপুর দিবসে উপজেলা প্রশাসন ও মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি অনুষ্ঠান হয় (ডেইলি স্টার); সাধারণ ভ্রমণে শীতকাল। বর্ষায়: ভাঙন-এলাকার পথ পিচ্ছিল ও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে — নদীপাড়ে সতর্ক থাকুন। শিষ্টাচার: সমাধিস্থলে নীরবতা ও মর্যাদা বজায় রাখুন; সীমান্ত এলাকায় ছবি তোলায় স্থানীয় নির্দেশনা মানুন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

সাত শহীদ কারা?

ডা. আব্দুল আজিজ, ফজলুল হক, ইয়ার মাহমুদ, ভবতোষ চন্দ্র দাস, নূরুজ্জামান, দ্বীজেন্দ্র চন্দ্র বিশ্বাস ও জামাল উদ্দিন (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

যুদ্ধটি কবে ও কোথায় হয়েছিল?

১৯৭১ সালের ২৬ জুলাই, কলমাকান্দার নাজিরপুর বাজারে — ১৭ জন মুক্তিযোদ্ধার সম্মুখযুদ্ধ (বাসস)।

সমাধি কোথায়?

লেঙ্গুরা ইউনিয়নের ফুলবাড়িতে, গণেশ্বরী নদীর পাড়ে; অপর নাম সপ্তশিখা (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

নাজিরপুর দিবস কবে পালিত হয়?

প্রতি বছর ২৬ জুলাই (ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস)।

সমাধি কি নিরাপদ আছে?

২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী গণেশ্বরীর ভাঙনে ঝুঁকিতে; গাইড ওয়ালের দাবি উঠেছে (ডেইলি স্টার)।

কলমাকান্দায় আর কী দেখব?

লেংগুরা টিলা, পাতলাবন আর রংছাতির পাহাড়ি জনপদ — পাঁচগাঁও-চন্দ্রডিঙ্গা পরিচিত নাম, তবে অবকাঠামো অব্যবহৃত (খোলা কাগজ)।

শেষকথা

কলমাকান্দার সাত শহীদের সমাধি বাংলাদেশের সেই স্মৃতিস্থলগুলোর একটি, যেখানে ইতিহাস এখনো প্রকৃতির সঙ্গে লড়ছে — ১৯৭১-এ পাকবাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে জেতা জায়গাটি আজ নদীর ভাঙনের কাছে হার মানার মুখে। নাজিরপুর দিবসে হোক বা শীতের নীরব দুপুরে, এই মেহগনি-ছায়ায় একবার দাঁড়িয়ে সাতটি নাম পড়ে আসুন — সেটাই এই ভ্রমণের আসল প্রাপ্তি।