• 01 Nov, 2026

টঙ্ক আন্দোলন গাইড — ফসল হোক বা না হোক ধান দিতেই হবে, এই 'টঙ্ক' প্রথার শোষণ, জমিদার-সন্তান মণি সিংহের নেতৃত্বে কৃষক-সংগঠন, ১৯৪৬ সালের ৩১ জানুয়ারি বহেরাতলীতে কুমুদিনী হাজংকে বাঁচাতে গিয়ে হাজং মাতা রাশিমণির শহীদ হওয়া এবং কুল্লাগড়ার স্মৃতিসৌধ ও টঙ্ক দিবসের বর্তমান চিত্র।

সুসং রাজবাড়ির গল্পের অন্য পিঠ এই পোস্ট — সেই রাজবাড়িরই প্রজারা একদিন টঙ্ক প্রথার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল, নেতৃত্ব দিয়েছিলেন জমিদার পরিবারেরই সন্তান, আর প্রাণ দিয়েছিলেন এক হাজং বিধবা মা, যাঁকে আজ সবাই ডাকে হাজং মাতা রাশিমণি। দুর্গাপুরের কুল্লাগড়ার বহেরাতলীতে তাঁর স্মৃতিসৌধ — বাংলার কৃষক-আন্দোলনের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী স্মৃতিচিহ্নগুলোর একটি।

টঙ্ক প্রথা: ফসল হোক বা না হোক, ধান দিতেই হবে

'টঙ্ক' বলতে বোঝাত ধান-কড়ারি খাজনা — জমিতে ফসল ফলুক বা খরায় পুড়ে যাক, নির্দিষ্ট পরিমাণ ধান জমিদারকে দিতেই হতো (বাংলা উইকিপিডিয়া; সালেক খোকন)। হিসাবটা ছিল নির্মম: সোয়া একর (১.২৫ একর) জমির জন্য বছরে ৭ থেকে ১৫ মণ ধান, অথচ একই জমির প্রচলিত নগদ খাজনা ছিল মাত্র ৫–৭ টাকা — ধানের দাম হিসেবে কৃষককে দিতে হতো বাড়তি ১১–১৭ টাকার সমমূল্য (মণি সিংহের আত্মজীবনী 'জীবন সংগ্রাম' থেকে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড)। তার ওপর টঙ্ক জমিতে কৃষকের কোনো মালিকানাই ছিল না। প্রথাটি চলত কলমাকান্দা, দুর্গাপুর, হালুয়াঘাট, নালিতাবাড়ী ও শ্রীবরদী থানায়, সবচেয়ে ব্যাপকভাবে সুসং জমিদারি এলাকায় (সালেক খোকন)। এর শিকার প্রধানত ছিলেন হাজং কৃষকরা — যাঁরা এককালে ঝুম চাষে স্বাধীন ছিলেন, হাতির খেদায় বিনা পারিশ্রমিকে খাটানোর বিরুদ্ধে বিদ্রোহও করেছিলেন; গারো পাহাড়ের মালিকানা ব্রিটিশদের হাতে চলে যাওয়ার পর জমিদাররা ক্ষতিপূরণের পথ হিসেবে চাপান এই টঙ্ক (নিউ এজ)।

জমিদার-সন্তানের বিদ্রোহ: কমরেড মণি সিংহ

এই আন্দোলনের বিস্ময় তার নেতা — মণি সিংহ (১৯০১–১৯৯০), সুসং দুর্গাপুরের জমিদার পরিবারের সন্তান, যিনি নিজের পরিবার ও আত্মীয়দের বিরুদ্ধেই কৃষকদের সংগঠিত করেছিলেন (আজকের পত্রিকা; ডেইলি স্টার)। ১৯৩৭ সালের নভেম্বরে এক বৈঠক থেকে আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক সূচনা; তিনি প্রণয়ন করেন ছয় দফা দাবিনামা — টঙ্ক প্রথার সম্পূর্ণ বিলুপ্তি, বকেয়া মওকুফ, জমিদারি উচ্ছেদ, নগদে বাজারদরে খাজনা, উচ্ছেদ ও সালামি বন্ধ (বাংলা উইকিপিডিয়া; নিউ এজ)। তাঁর আত্মজীবনী 'জীবন সংগ্রাম' এই আন্দোলনের প্রধান দলিলগুলোর একটি। পরবর্তী জীবনে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা নেতা, দীর্ঘ বছর আত্মগোপনে থাকা সংগঠক এবং ১৯৭১ সালে মুক্তিবাহিনীর গেরিলা শাখার পরিচালক ও অস্থায়ী সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন।

৩১ জানুয়ারি ১৯৪৬: বহেরাতলীর দিন

আন্দোলন দমনে বিরিশিরিতে সশস্ত্র ঘাঁটি বসায় ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেলস। ১৯৪৬ সালের ৩১ জানুয়ারি বাহিনীটি আসে কুল্লাগড়ার বহেরাতলী গ্রামে — লক্ষ্য আন্দোলনের নেতা লঙ্কেশ্বর হাজং। তাঁকে না পেয়ে সৈন্যরা তাঁর নববিবাহিতা স্ত্রী কুমুদিনী হাজংকে ধরে ক্যাম্পের দিকে টেনে নিয়ে যেতে থাকে। খবর পেয়ে রাশিমণি হাজং শত শত নারী-পুরুষকে দা, কুড়াল, লাঠি, তির-ধনুক নিয়ে প্রতিরোধে ডাক দেন; মুখোমুখি সংঘর্ষে সৈন্যদের গুলিতে শহীদ হন রাশিমণি ও সুরেন্দ্র হাজং, পাল্টা আক্রমণে নিহত হন দুই সৈন্যও (ভিউজ বাংলাদেশ)। পরদিন বাহিনী গ্রামজুড়ে তল্লাশি ও লুটপাট চালায়। এই দিনটিই প্রতি বছর 'টঙ্ক দিবস' হিসেবে পালিত হয়।

রাশিমণি: যেভাবে 'হাজং মাতা' হলেন

রাশিমণির জন্ম ধোবাউড়ার মাইজপাড়ায় এক দরিদ্র টঙ্কচাষির ঘরে; বারো বছরে বিয়ে, অল্পদিনেই বিধবা। অন্যের জমিতে ধান রোওয়া-কাটার মজুরি ঢেঁকিতে ভেনে চাল বানিয়ে হাটে বিক্রি করতেন, গরিব হাজং মেয়েদের জন্য কাপড় বুনতেন, আর ছিলেন এলাকার মায়েদের সেরা দাই (সালেক খোকন)। ১৩৫০ বঙ্গাব্দের মহামন্বন্তরে মহিলা আত্মরক্ষা সমিতির চাল-সংগ্রহ দল নিয়ে পরগণা ঘুরে ত্রাণ সংগ্রহ করেছেন — নেত্রী হওয়ার অনেক আগেই তিনি ছিলেন এই জনপদের মা। সেই মা-ই ৩১ জানুয়ারি অন্যের মেয়েকে বাঁচাতে বুক পেতে দিয়েছিলেন।

স্মৃতি আজ: সৌধ, টঙ্ক দিবস আর শেষ সাক্ষী

রাশিমণির আত্মত্যাগ স্মরণে ২০০৪ সালে কুল্লাগড়ায় নির্মিত হয় হাজং মাতা রাশিমণি স্মৃতিসৌধ (বাংলা উইকিপিডিয়া)। প্রতি বছর ৩১ জানুয়ারি বহেরাতলীর সৌধ প্রাঙ্গণে মৃত্যুবার্ষিকী ও টঙ্ক দিবস পালিত হয় — ২০২৫ সালে ৭৯তম বার্ষিকীতে বিরিশিরি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমির আয়োজনে দিনব্যাপী অনুষ্ঠানে নানা সংগঠন শ্রদ্ধা জানায় (প্রথম আলো)। আন্দোলনের শেষ জীবিত সাক্ষী কুমুদিনী হাজং ১০২ বছর বয়সে ২০২৪ সালের মার্চে বহেরাতলীতেই মারা যান (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড) — তাঁর হাত ধরেই দুর্গাপুরে কমরেড মণি সিংহ স্মৃতি জাদুঘরের উদ্বোধন হয়েছিল। আন্দোলনের চূড়ান্ত জয় আসে ১৯৫০ সালে — টঙ্ক প্রথা ও জমিদারি প্রথা দুটোই উচ্ছেদ হয় (বাংলা উইকিপিডিয়া)। সোমেশ্বরীর পাড়ের সেই জনপদে দাঁড়িয়ে এই ইতিহাস পড়লে চিনামাটির পাহাড়ের সৌন্দর্যও অন্য রঙ পায়।

ভ্রমণ তথ্য

যাওয়া: স্মৃতিসৌধ দুর্গাপুর উপজেলার কুল্লাগড়া ইউনিয়নের বহেরাতলীতে — বিরিশিরি-বিজয়পুর যাওয়ার পথেই পড়ে, শহর থেকে স্থানীয় যানে যাওয়া যায়; চালককে 'রাশিমণি স্মৃতিসৌধ, বহেরাতলী' বললেই চিনবেন। সেরা সময়: ৩১ জানুয়ারি টঙ্ক দিবস — অনুষ্ঠান ও স্থানীয়দের সমাগমে জায়গাটি সবচেয়ে জীবন্ত; বছরের অন্য সময়ে নীরব স্মৃতিস্থল। সঙ্গে ঘুরুন: একই দিনে বিরিশিরি কালচারাল একাডেমি (হাজং সংস্কৃতির ধারাবাহিক রূপ সেখানেই) ও সুসং রাজবাড়ি। শিষ্টাচার: এটি শহীদদের স্মৃতিস্থল — মর্যাদা বজায় রাখুন; গ্রামের মানুষের সঙ্গে কথা বললে এই ইতিহাসের জীবন্ত ভাষ্য পাবেন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

টঙ্ক প্রথা কী?

ধান-কড়ারি খাজনা — ফসল হোক বা না হোক নির্দিষ্ট ধান (সোয়া একরে ৭–১৫ মণ) দিতেই হতো (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

আন্দোলনের নেতা কে ছিলেন?

কমরেড মণি সিংহ (১৯০১–১৯৯০) — সুসং জমিদার পরিবারের সন্তান হয়েও কৃষকদের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন (আজকের পত্রিকা)।

রাশিমণি কীভাবে শহীদ হন?

১৯৪৬ সালের ৩১ জানুয়ারি কুমুদিনী হাজংকে সৈন্যদের হাত থেকে ছাড়াতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন (ভিউজ বাংলাদেশ)।

স্মৃতিসৌধ কোথায় ও কবে তৈরি?

দুর্গাপুরের কুল্লাগড়া ইউনিয়নের বহেরাতলীতে; নির্মাণ ২০০৪ সালে (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

টঙ্ক দিবস কবে পালিত হয়?

প্রতি বছর ৩১ জানুয়ারি, সৌধ প্রাঙ্গণে (প্রথম আলো)।

কুমুদিনী হাজং কে ছিলেন?

আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী ও শেষ জীবিত সাক্ষী; ১০২ বছর বয়সে ২০২৪ সালের মার্চে মারা যান (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড)।

শেষকথা

বাংলার কৃষক-আন্দোলনের ইতিহাসে তেভাগা-নানকারের পাশে টঙ্ক আন্দোলনের নাম কম উচ্চারিত হয়, অথচ এখানে প্রতিরোধের গল্পটা সবচেয়ে মানবিক: এক জমিদার-সন্তানের আত্মত্যাগী নেতৃত্ব, আর এক বিধবা দাই-মায়ের অন্যের সন্তানকে বাঁচাতে প্রাণ দেওয়া। বহেরাতলীর ছোট্ট সৌধটির সামনে দাঁড়ালে বোঝা যায়, স্মৃতিসৌধের উচ্চতা নয়, গল্পের ওজনই আসল।