• 01 Nov, 2026

সুসং দুর্গাপুর গাইড — ১২৮০ খ্রিষ্টাব্দে সোমেশ্বর পাঠকের প্রতিষ্ঠিত সুসং রাজবংশের ইতিহাস, আকবরের সঙ্গে রঘুনাথ সিংহের চুক্তি ও দশভূজা মন্দিরের অষ্টধাতু দুর্গা, ১৩০৪ বঙ্গাব্দের ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়ে পুনর্নির্মিত রাজবাড়ির বর্তমান অবস্থা ও কমলা রানীর দিঘির কিংবদন্তি।

সোমেশ্বরীর নামের সঙ্গে যে মানুষটির নাম জড়িয়ে, সেই সোমেশ্বর পাঠকের রাজধানী ছিল এই সুসং দুর্গাপুর। দুর্গাপুর শহর থেকে মাত্র ২ কিলোমিটার দূরের জমিদার বাড়িটিই একসময়ের সুসং রাজ্যের কেন্দ্র — যেখানে একটি রাজবংশ প্রায় সাতশ বছর ধরে এই পাহাড়ি জনপদ শাসন করেছে। রাজবাড়ি দেখতে যাওয়ার আগে প্রত্যাশা ঠিক রাখুন: এটি ঝকঝকে জাদুঘর-প্রাসাদ নয়, ইতিহাসের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাওয়া একটি বসবাসরত প্রাঙ্গণ।

সুসং রাজ্যের প্রতিষ্ঠা: সোমেশ্বর পাঠক থেকে রঘুনাথ সিংহ

প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী ১২৮০ খ্রিষ্টাব্দে (৬৮৬ বঙ্গাব্দ) কামরূপ-কামাখ্যা থেকে আগত ব্রাহ্মণ সোমেশ্বর পাঠক এই অঞ্চলে এসে গারো রাজা বৈশ্যকে পরাজিত ও নিহত করে প্রতিষ্ঠা করেন 'সু-সঙ্গ' অর্থাৎ 'ভাল সঙ্গ' নামের রাজ্য (বাংলা উইকিপিডিয়া; ভ্রমণকারী) — যদিও আগমনের সন নিয়ে মতান্তরও আছে, উইকিপিডিয়ায় ১৫৯৪ খ্রিষ্টাব্দের কথাও এসেছে। রাজ্যের প্রজাদের অধিকাংশ ছিলেন আদিবাসী, বিশেষ করে গারো। বংশধররা নানা উপাধি বদলে শেষে 'সিংহ' উপাধি ধারণ করেন এবং জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের আগ পর্যন্ত প্রায় তিনশ বছর এই অঞ্চলে জমিদারি করেন (বাংলা উইকিপিডিয়া)। বংশের সবচেয়ে খ্যাতিমান রাজা রঘুনাথ সিংহ — মল্লযোদ্ধা ও কূটনীতিক; আকবরের সঙ্গে চুক্তি করে তিনি মানসিংহের পক্ষে বিক্রমপুরের চাঁদ রায় ও কেদার রায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন এবং বিজয়ের পর নিয়ে আসেন অষ্টধাতুর এক দুর্গা প্রতিমা, যা রাজমন্দিরে স্থাপিত হয়ে আজও দশভূজা মন্দির নামে পরিচিত (বাংলা উইকিপিডিয়া)। প্রচলিত ব্যাখ্যায় তখন থেকেই 'সু-সঙ্গ'-এর সঙ্গে 'দুর্গা' যুক্ত হয়ে নাম হয় সুসঙ্গ দুর্গাপুর।

রাজবাড়ি আজ: চার বাড়ি, ভূমিকম্প আর নতুন ব্যবহার

বর্তমান জমিদার বাড়িটি চারটি অংশে বিভক্ত — বড় বাড়ি, মেজো বাড়ি, আবু বাড়ি ও দুই আনি বাড়ি। আগের প্রাসাদ বাংলা ১৩০৪ সালের (১৮৯৭) ভয়াবহ ভূমিকম্পে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেলে বংশধররা এটি পুনর্নির্মাণ করেন (বাংলা উইকিপিডিয়া)। প্রাঙ্গণে পূজামণ্ডপ রয়েছে, দুর্গাপূজায় এলাকা জমজমাট হয়। বর্তমানে বাড়িটির একাংশ উপজেলা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে (বাংলা উইকিপিডিয়া) — অর্থাৎ এটি কারও বাসস্থান ও প্রশাসনিক ব্যবহারের জায়গা; বাইরে থেকে দেখুন, ভেতরে ঢুকতে হলে অনুমতি নিন, এবং 'মহারাজার প্রাসাদ' বলতে চোখে যে ছবি ভাসে, তার বদলে একটি পুরনো জমিদার-প্রাঙ্গণের বাস্তব চেহারা দেখার মানসিকতা রাখুন।

কমলা রানীর দিঘি: কিংবদন্তি ও বর্তমান

উপজেলা সদর থেকে ~৩ কিলোমিটার দূরে, বিরিশিরি ইউনিয়ন পরিষদের কাছে কমলা রানীর দিঘি (সাগর দিঘি নামেও পরিচিত) — এর গল্পটি স্পষ্টতই কিংবদন্তি, ইতিহাস নয় (ভ্রমণ গাইড)। প্রচলিত কথা: পঞ্চদশ শতকের শেষভাগে রাজা জানকি নাথ প্রজাদের পানির কষ্ট দূর করতে দিঘি খনন করেন, কিন্তু পানি ওঠে না; স্বপ্নাদেশ পেয়ে রাণী কমলা দেবী মাঝদিঘিতে পূজা দিতে নামলে চারদিক থেকে পানি উঠে এসে তাঁকে ডুবিয়ে দেয় (অন্যমতে বজ্রপাতে দিঘির তলা ফেটে পানি ওঠে)। লোককথা আরও বলে, রাণী রাতে এসে শিশুপুত্র রঘুনাথকে দুধ খাইয়ে যেতেন। সেই রঘুনাথই পরে সুসংকে শক্তিশালী পরগনায় পরিণত করেন। বর্তমান বাস্তবতা কাব্যিক নয়: দিঘির মাঝ দিয়ে এখন সোমেশ্বরী নদী বয়ে গেছে — কালের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে কেবল দক্ষিণ ও পশ্চিম পাড়, একাংশে বসতিও গড়ে উঠেছে (ভ্রমণ গাইড)। জায়গাটির মূল্য এখন দৃশ্যে নয়, গল্পে।

চারপাশে আরও যা দেখবেন

দশভূজা মন্দির — রাজবাড়ির প্রাঙ্গণ-সংলগ্ন এলাকাতেই; সোমেশ্বর পাঠক নাকি এখানকার অশোক গাছের নিচে প্রথম যাত্রাবিরতি করেছিলেন (ভ্রমণকারী)। দুর্গাপুর শহরে শিল্পী মাহমুদুল হাসান সোহাগের 'সুসং' পোড়ামাটির ভাস্কর্য (২০২০) — ১৮ ফুট উঁচু এই শিল্পকর্মে ময়ূরের লেজের খোদাইয়ে ফুটে উঠেছে মণি সিংহ, রাশিমণি, টঙ্ক আন্দোলন ও ১৯৭১-এর স্মৃতি (বাংলা উইকিপিডিয়া)। কমরেড মণি সিংহ স্মৃতিসৌধও এই শহরেই — টঙ্ক আন্দোলনের সেই ইতিহাস এই সিরিজের পরের পোস্টের বিষয়। কাছেই বিরিশিরির কালচারাল একাডেমি ও রানীখং মিশন মিলিয়ে দুর্গাপুরের সাংস্কৃতিক সার্কিট পূর্ণ হয়।

ভ্রমণ তথ্য

যাওয়া: দুর্গাপুর বাজার থেকে রিকশায় ~২ কিলোমিটার। ঢাকা থেকে মহাখালীর বাসে সরাসরি সুসং দুর্গাপুর আসা যায় (আদার ব্যাপারী — ভাড়া বদলায়, আগে যাচাই করুন)। সময়: রাজবাড়ি-দশভূজা-দিঘি মিলিয়ে ঘণ্টা দুয়েক যথেষ্ট; দুর্গাপূজার সময় প্রাঙ্গণ সবচেয়ে জীবন্ত। শিষ্টাচার: বাসভবন-ব্যবহৃত অংশে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ বা ছবি নয়; মন্দিরে ধর্মীয় শিষ্টাচার মানুন। একদিনে: রাজবাড়ি দিয়ে শুরু করে চিনামাটির পাহাড় ও কালচারাল একাডেমি — দুর্গাপুরের পূর্ণ দিনের এই ক্রমটাই সবচেয়ে যুক্তিসংগত।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

সুসং রাজ্য কে প্রতিষ্ঠা করেন?

সোমেশ্বর পাঠক — প্রচলিত মতে ১২৮০ খ্রিষ্টাব্দে, গারো রাজা বৈশ্যকে পরাজিত করে (বাংলা উইকিপিডিয়া; সন নিয়ে মতান্তর আছে)।

রাজবাড়ি কয়টি অংশে বিভক্ত?

চারটি — বড় বাড়ি, মেজো বাড়ি, আবু বাড়ি ও দুই আনি বাড়ি (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

বর্তমান বাড়িটি কত পুরনো?

১৩০৪ বঙ্গাব্দের (১৮৯৭) ভূমিকম্পে আগের প্রাসাদ ধ্বংসের পর পুনর্নির্মিত (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

রাজবাড়িতে কি ঢোকা যায়?

একাংশ এখন ম্যাজিস্ট্রেটের বাসভবন — বাইরে থেকে দেখুন, প্রবেশে অনুমতি নিন (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

দশভূজা মন্দিরের প্রতিমার গল্প কী?

রঘুনাথ সিংহ বিক্রমপুর জয়ের পর অষ্টধাতুর দুর্গা এনে স্থাপন করেন বলে প্রচলিত (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

কমলা রানীর দিঘির গল্প কি সত্যি?

এটি কিংবদন্তি — দিঘির মাঝ দিয়ে এখন সোমেশ্বরী বয়ে গেছে, টিকে আছে দুটি পাড় (ভ্রমণ গাইড)।

শেষকথা

সুসং দুর্গাপুরের রাজবাড়ি তার প্রাসাদ-জৌলুসে নয়, সময়ের দৈর্ঘ্যে অসাধারণ — ত্রয়োদশ শতকের শেষভাগ থেকে বিংশ শতক পর্যন্ত একই বংশের হাতে একটি জনপদের কেন্দ্র হয়ে থাকা। ভূমিকম্প, নদীভাঙন আর প্রশাসনিক পুনর্ব্যবহারের পর যা টিকে আছে, তা ইতিহাসপ্রেমীর জন্য যথেষ্ট: চারটি বাড়ি, একটি প্রাচীন মন্দির আর গল্পে ভরা এক দিঘির পাড়।