বর্ষাকালে কিশোরগঞ্জের হাওরে দাঁড়ালে চারদিকে শুধু পানি আর পানি — গ্রামগুলো ভাসমান দ্বীপ। সেই পানির বুক চিরে সোজা চলে গেছে একটি পিচঢালা সড়ক: ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম অলওয়েদার সড়ক। চালু হওয়ার পর থেকেই এটি শুধু হাওরবাসীর জীবনরেখা নয়, দেশের অন্যতম আলোচিত ভ্রমণ-রুট — যেখানে গাড়ির দুই পাশে দিগন্তজোড়া জলরাশি।
২০২০ সালে চালু হওয়া হাওর-সড়ক
কিশোরগঞ্জ জেলার প্রায় অর্ধেক এলাকা — ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও নিকলী উপজেলা — সম্পূর্ণ হাওর অঞ্চল, যেখানে বর্ষায় চলাচলের একমাত্র মাধ্যম ছিল নৌকা (ঢাকা ট্রিবিউন)। এই তিন উপজেলাকে সারা বছর সড়কপথে যুক্ত করতে নির্মিত হয় ২৯.৭৩ কিলোমিটার দীর্ঘ অলওয়েদার সড়কটি, ব্যয় ৮৭৪ কোটি টাকার বেশি; প্রকল্পে ছিল ৩টি বড়সহ মোট ১৪টি সেতু ও ৬২টি বক্স কালভার্ট (সড়ক ও জনপথ বিভাগ/ঢাকা ট্রিবিউন)। ধনু ও বাউলাই নদীর সমান্তরালে হাওরের মাঝখান দিয়ে যাওয়া সড়কটির নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেছিলেন ২০১৬ সালে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ — তাঁর নিজের জেলা কিশোরগঞ্জ; যান চলাচলের জন্য সড়কটি আনুষ্ঠানিকভাবে খুলে দেওয়া হয় ২০২০ সালের ৮ অক্টোবর (নিউ এজ/ঢাকা ট্রিবিউন)। সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরের মতোই এখানেও বর্ষার বিশালত্বই মূল আকর্ষণ — পার্থক্য হলো, এখানে নৌকার বদলে সড়ক দিয়েই সেই বিশালত্বের মাঝখানে পৌঁছে যাওয়া যায়।
ভ্রমণের অভিজ্ঞতা
বর্ষা (জুন–অক্টোবর) সড়কটির সেরা রূপ: দুই পাশে থৈ থৈ পানি, দূরে দ্বীপের মতো গ্রাম, মাঝে মাঝে জেলেদের নৌকা। মিঠামইনের জিরো পয়েন্টে দাঁড়িয়ে হাওরের বিশালত্ব অনুভব করা ভ্রমণকারীদের প্রিয় অভিজ্ঞতা (কাগজের বার্তা, অক্টোবর ২০২৬)। পথে নৌকা ভাড়া করে হাওরের ভেতরে ঘুরে আসা যায়; অষ্টগ্রামে দেখে নিতে পারেন ষোড়শ শতকের বলে কথিত প্রাচীন কুতুব শাহ মসজিদ (কাগজের বার্তা)। শীতে চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো — পানি নেমে গেলে সড়কের দুই পাশে সবুজ-সোনালি বোরো ধানের ক্ষেত, আর হাওরবাসীর কর্মব্যস্ত জীবন। হাকালুকি হাওরের মতো এ অঞ্চলও পাখি ও মাছের জন্য পরিচিত। বর্ষায় যাওয়ার আগে আবহাওয়া ও বন্যা পরিস্থিতি জেনে নিন, আর সড়কের ওপর যেখানে-সেখানে গাড়ি থামিয়ে বিপদ ডেকে আনবেন না।
বিতর্কটাও জানা জরুরি
সড়কটি নিয়ে পরিবেশগত বিতর্ক আছে, যা লুকানো উচিত নয়। সমালোচকদের অভিযোগ, বাঁধ-আকৃতির এই সড়ক বর্ষার পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে এবং সিলেট অঞ্চলের বন্যার সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকতে পারে; ২০২২ সালের বন্যার পর মন্ত্রিসভা হাওরে নতুন সড়ক নির্মাণ বন্ধ করে এলিভেটেড (উড়াল) সড়কের নীতি নেয় এবং বিদ্যমান সড়কে আরও সেতু দেওয়ার সম্ভাবনা যাচাইয়ের নির্দেশ দেয় (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড/আইটিভি)। অন্যদিকে, পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞদের কমিটি (ড. আইনুন নিশাতের নেতৃত্বে) পরীক্ষা করে জানায়, সড়কটিকে সিলেটের বন্যার কারণ মনে হয় না — তবে কয়েক বছর পর পলি জমে প্রভাব পড়তে পারে বলে সতর্কও করেন তাঁরা (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড)। ভ্রমণকারী হিসেবে এই বিতর্ক জানা থাকলে হাওরের সৌন্দর্যের পাশাপাশি এর ভঙ্গুর পরিবেশের প্রতিও শ্রদ্ধা বাড়ে — প্লাস্টিক ফেলবেন না, পানিতে কিছু ছুড়বেন না।
যাতায়াত
ঢাকা থেকে বাস বা ট্রেনে কিশোরগঞ্জ শহর, সেখান থেকে বাস/সিএনজিতে ইটনা — সড়কটির শুরু ইটনা উপজেলা সদর থেকে। সেখান থেকে স্থানীয় যান বা ভাড়ার গাড়িতে মিঠামইন হয়ে অষ্টগ্রাম পর্যন্ত পুরো ২৯.৭৩ কিলোমিটার পাড়ি দেওয়া যায়। একদিনে ঢাকা থেকে গিয়ে ফেরা তাড়াহুড়োর হবে — কিশোরগঞ্জ শহর বা মিঠামইনে একরাত থাকলে বর্ষার সূর্যাস্তটা হাওরের ওপর দেখা যায়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
অলওয়েদার সড়কটি কত লম্বা?
২৯.৭৩ কিলোমিটার — ইটনা থেকে মিঠামইন হয়ে অষ্টগ্রাম (ঢাকা ট্রিবিউন)।
কবে চালু হয়?
যান চলাচলের জন্য ২০২০ সালের ৮ অক্টোবর (নিউ এজ)।
যাওয়ার সেরা সময় কখন?
বর্ষা — সড়কের দুই পাশে পানির বিশালত্ব তখনই পূর্ণ রূপ পায় (কাগজের বার্তা)।
সড়কটি নিয়ে পরিবেশগত বিতর্ক আছে কি?
পানিপ্রবাহ নিয়ে অভিযোগ আছে; তবে বিশেষজ্ঞ কমিটির মতে এটি সিলেটের বন্যার সরাসরি কারণ নয় (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড)।
মিঠামইনে কী দেখবেন?
জিরো পয়েন্ট থেকে হাওরের দৃশ্য, নৌকাভ্রমণ; অষ্টগ্রামে প্রাচীন কুতুব শাহ মসজিদ (কাগজের বার্তা)।
শেষকথা
বাংলাদেশে এমন সড়কভ্রমণ আর দ্বিতীয়টি নেই — যেখানে রাস্তা নিজেই গন্তব্য। হাওরের মানুষের জন্য এটি জীবনবদলের প্রকল্প, ভ্রমণকারীর জন্য পানির রাজ্যে একদিনের রাজকীয় সফর। বর্ষার পূর্ণিমায় বা ভোরের আলোয় এই সড়কে একবার চললেই বুঝবেন, কেন এটি নিয়ে এত কথা হয়।