• 30 Oct, 2026

টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে মহেরা জমিদার বাড়ি — কালীচরণ ও আনন্দ সাহার ১৮৯০-এর প্রাসাদ, চারটি লজ ও বিশাখা সাগর, পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারের সংরক্ষণ, ১৪ মে ১৯৭১-এর হত্যাকাণ্ড, টিকিট ও যাতায়াত গাইড।

বাংলাদেশের জমিদার বাড়িগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ঝকঝকে সুসংরক্ষিতটি খুঁজতে গেলে প্রথম সারিতেই থাকবে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের মহেরা জমিদার বাড়ি। সাদা-রঙিন প্রাসাদ, স্তম্ভসারি, ফোয়ারা আর দীঘির পাড়ের সাজানো বাগান দেখে একে অনেকেই বলেন "বাংলার হোয়াইট হাউস"। ঢাকা থেকে মাত্র ৬৬ কিলোমিটার দূরত্বে এটি রাজধানীর সবচেয়ে জনপ্রিয় হেরিটেজ ডে-ট্রিপগুলোর একটি।

লবণ-ব্যবসায়ী দুই ভাইয়ের প্রাসাদ

কলকাতার ধনী লবণ ও ডাল ব্যবসায়ী দুই ভাই কালীচরণ সাহা ও আনন্দ সাহা ১৮৯০ সালের দিকে মহেরায় এসে করোটিয়ার জমিদারদের কাছ থেকে এই এলাকার জমিদারি কিনে নেন (রাইজিংবিডি/বাংলা উইকিপিডিয়া)। প্রায় আট একর জমিতে তাঁরা গড়ে তোলেন প্রাসাদ-নগরী, যার নকশায় ছিল স্পেনের কর্ডোভা নগরীর আদল এবং রোমান ও মোঘল শৈলীর মিশেল (বাংলা উইকিপিডিয়া)। সাহা পরিবার দানশীল হিসেবে খ্যাত ছিল — এলাকায় স্কুল-কলেজসহ নানা জনহিতকর কাজ তাঁদের হাতে গড়া (রাইজিংবিডি)।

চার লজ আর বিশাখা সাগর

কমপ্লেক্সের প্রাণ চারটি প্রধান আবাসিক ভবন বা "লজ": কালীচরণ লজ (ইংরেজি U-আকৃতির ভবন; এর একটি সুসজ্জিত একতলা অংশে এখন ছোট জাদুঘর), আনন্দ লজ (সবচেয়ে আকর্ষণীয় — নীল-সাদা রঙের তিনতলা ভবন, ঝুলন্ত বারান্দাসহ), চৌধুরী লজ (গোলাপি রঙের দোতলা ভবন, রোমান শৈলীর স্তম্ভের সারি) এবং মহারাজ লজ (রাইজিংবিডি/অবজারভার)। প্রধান ফটক পেরোলেই সামনে বিশাল দীঘি বিশাখা সাগর — ঘাটবাঁধানো পাড়ে ছায়াঘেরা বসার জায়গা; পেছনে আরও দুটি পুকুর, পাসরা পুকুর ও রানী পুকুর; প্রাঙ্গণে ১৮৯০ সালে নির্মিত ফোয়ারা, ফুলের বাগান, আম্রকানন, নায়েব সাহেবের ঘর, কাছারি ঘর ও গোমস্তাদের ঘর (বাংলা উইকিপিডিয়া)। সংরক্ষণের মানদণ্ডে এটি ধ্বংসপ্রায় বালিয়াটি বা দালাল বাজারের ঠিক উল্টো অভিজ্ঞতা — কারণ এখানে প্রতিদিন শত শত মানুষের বসবাস ও প্রশিক্ষণ চলে।

১৯৭১-এর ক্ষত ও পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার

এই সৌন্দর্যের গায়ে গভীর ক্ষতও আছে। ১৯৭১ সালের ১৪ মে পাকিস্তানি বাহিনী মহেরায় হামলা চালিয়ে জমিদার বাড়ির কুলবধূসহ পাঁচজন গ্রামবাসীকে গুলি করে হত্যা করে (বাংলাদেশ পোস্ট/বাংলা উইকিপিডিয়া)। পরে এখানে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প বসে এবং পরিবারটি দেশত্যাগ করে। স্বাধীনতার পর পরিত্যক্ত প্রাসাদে ১৯৭২ সালে পুলিশ ট্রেনিং স্কুল স্থাপিত হয়, যা ১৯৯০ সালে পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে (পিটিসি) উন্নীত হয় (বাংলা উইকিপিডিয়া)। ভাগ্যের পরিহাসে, প্রতিষ্ঠানিক ব্যবহারই বাড়িটিকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচিয়েছে — পুলিশের রক্ষণাবেক্ষণে ছাদ-দেয়াল-বাগান সবই আজ যত্নে রাখা।

ভ্রমণ তথ্য

অবস্থান: ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের নাটিয়াপাড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার পূর্বে মহেরা গ্রামে; টাঙ্গাইল শহর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার (বাংলা উইকিপিডিয়া)। ঢাকা থেকে বাসে নাটিয়াপাড়া নেমে অটোরিকশায় সরাসরি গেটে পৌঁছানো যায় (অবজারভার)। প্রবেশ: দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত; সাম্প্রতিক ভ্রমণ-বিবরণ অনুযায়ী প্রবেশমূল্য ৮০ টাকা, ভেতরে ছোট পার্ক, মিনি চিড়িয়াখানা, বিশাখা সাগরে বোট রাইড ও পিকনিক স্পট আছে (অবজারভার — ফি বদলাতে পারে, গেটে যাচাই করুন)। মনে রাখুন, এটি একটি সক্রিয় পুলিশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র — নির্ধারিত এলাকার বাইরে যাবেন না, প্রশিক্ষণ এলাকায় ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

মহেরা জমিদার বাড়ি কারা নির্মাণ করেন?

দুই ভাই কালীচরণ সাহা ও আনন্দ সাহা, ১৮৯০-এর দশকে (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

একে "বাংলার হোয়াইট হাউস" বলা হয় কেন?

এর সাদা প্রাসাদ-ভবন, উপনিবেশিক ধাঁচ আর সুসংরক্ষিত সাজানো প্রাঙ্গণের জন্য (টিনেজার্সবিডি)।

এখন বাড়িটি কী কাজে ব্যবহৃত হয়?

বাংলাদেশ পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার (পিটিসি) হিসেবে; দর্শনার্থীদের জন্যও উন্মুক্ত (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

ভেতরে কী কী দেখবেন?

চারটি লজ, বিশাখা সাগর দীঘি, ফোয়ারা, বাগান, ছোট জাদুঘর, মিনি চিড়িয়াখানা ও বোট রাইড (রাইজিংবিডি/অবজারভার)।

ঢাকা থেকে কীভাবে যাবেন?

বাসে নাটিয়াপাড়া বাসস্ট্যান্ড, সেখান থেকে অটোরিকশায় মহেরা (অবজারভার)।

শেষকথা

মহেরা প্রমাণ করে, ঐতিহাসিক স্থাপনা বাঁচে তখনই, যখন তার দৈনন্দিন ব্যবহার থাকে। কর্ডোভার আদলের প্রাসাদ, ১৯৭১-এর শহীদদের স্মৃতি আর প্রশিক্ষণরত পুলিশের কুচকাওয়াজ — তিনটি যুগ একই প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে। টাঙ্গাইল ভ্রমণের শুরুটা এখান থেকেই হোক।