ঢাকা থেকে মাত্র আধঘণ্টা-পঁয়তাল্লিশ মিনিটের পথে সময় যেন থমকে আছে একটি সরু রাস্তায় — দুই পাশে সারিবদ্ধ জীর্ণ প্রাসাদের গায়ে রঙিন মোজাইকের কাজ, দরজা-জানালায় ঔপনিবেশিক কারুকাজ। এটি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের পানাম নগর, বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত "হারানো নগরী"। কাছেই জয়নুল আবেদিনের গড়া লোকশিল্প জাদুঘর — দুটো মিলিয়ে এটি ঢাকার নিকটতম পূর্ণাঙ্গ ঐতিহ্য-ভ্রমণ।
সোনারগাঁও: ঈশা খাঁর রাজধানী থেকে মসলিনের বন্দর
পানাম বুঝতে হলে আগে সোনারগাঁওয়ের গল্প জানতে হয়। ১৩৩৮ সালে ফখরুদ্দিন মোবারক শাহর আমলে সুবর্ণগ্রাম (পরে সোনারগাঁ) হয় স্বাধীন সুলতানির রাজধানী; ১৪শ শতকে এখানে এসেছিলেন ইবনে বতুতা, আর ১৫৮৫ সালে রালফ ফিচ লিখে যান এখানকার বিশ্ববিখ্যাত মসলিন কাপড়ের কথা (বাংলাপিডিয়া-ভিত্তিক বিবরণ)। বারো ভূঁইয়াদের নেতা ঈশা খাঁর আমলে সোনারগাঁও আবার রাজধানীর মর্যাদা পায়; মুঘল রাজধানী ঢাকায় সরে গেলে (১৬০৮–১০) এর রাজনৈতিক গুরুত্ব কমলেও মসলিন বাণিজ্যের খ্যাতি টিকে থাকে বহুদিন। একটি জরুরি সংশোধন: পানাম নগরের আজকের ভবনগুলো কিন্তু ঈশা খাঁর আমলের নয় — সেগুলো আরও পরের গল্প।
পানাম নগর: ৬০০ মিটার রাস্তা, ৫২টি প্রাসাদ
উনিশ শতকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাপড় ও নীল বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে পানামে গড়ে ওঠে ধনী হিন্দু বণিকদের — সাহা, পোদ্দার প্রভৃতি পদবির ব্যবসায়ীদের — আবাসিক শহর (বাংলাপিডিয়া/এনসিটিবি পাঠ্য)। মাত্র প্রায় ৬০০ মিটার দীর্ঘ ও ৫ মিটার চওড়া একটি রাস্তার দুই পাশে আজও দাঁড়িয়ে ৫২টি ভবন — উত্তরে ৩১টি, দক্ষিণে ২১টি; উচ্চতা এক থেকে তিন তলা (এনসিটিবি)। ভবনগুলোতে ইন্দো-ইউরোপীয় স্থাপত্যের সঙ্গে মোগল প্রভাব ও রঙিন মোজাইকের কারুকাজ মিশেছে; নিরাপত্তার জন্য পুরো এলাকা ঘিরে খনন করা হয়েছিল পরিখা। দেশভাগের পর বণিক পরিবারগুলো চলে গেলে শহরটি ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হয়। ঐতিহ্যের এই অবস্থা দেখে ওয়ার্ল্ড মনুমেন্টস ফান্ড পানামকে বিশ্বের ১০০টি ধ্বংসপ্রায় ঐতিহাসিক শহরের তালিকায় রেখেছে (কুহুডাক) — তাই এখানে ঘোরা মানে সৌন্দর্য দেখার পাশাপাশি সংরক্ষণের জরুরিতাটাও উপলব্ধি করা। একই ঔপনিবেশিক ধনী-সংস্কৃতির ঢাকার নমুনা আহসান মঞ্জিল — দুটো একসঙ্গে পড়লে যুগটা পরিষ্কার হয়।
বড় সরদার বাড়ি ও লোকশিল্প জাদুঘর
পানাম থেকে হাঁটা দূরত্বেই বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন — ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন পানামের একটি পুরনো বাড়িতে এটি প্রতিষ্ঠা করেন (কুহুডাক)। প্রায় ১৬ হেক্টর সবুজ প্রাঙ্গণে ফাউন্ডেশনের প্রধান আকর্ষণ বড় সরদার বাড়ি (গোপীনাথ সাহা সরদার বাড়ি): ১৯০১ সালে নির্মিত, করিডোর দিয়ে যুক্ত দুটি প্রাসাদে মোট ৭০টি কক্ষ, গায়ে রঙিন মোজাইকের অপূর্ব কাজ (এনসিটিবি) — এখানেই এখন লোকশিল্প জাদুঘরের মূল প্রদর্শনী। গোটা প্রাঙ্গণে আছে ৪,৫০০-এর বেশি লোকজ নিদর্শন, ১০টি গ্যালারি, জয়নুল আবেদিন স্মৃতি জাদুঘর, কারুশিল্প গ্রাম ও লোকজ মঞ্চ (কুহুডাক)। সময় থাকলে মোগরাপাড়ায় সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের সমাধি (মৃ. ১৪১১)-ও ঘুরে আসা যায়। প্রাচীন রাজধানী-নগরীর ধারায় এটি কুমিল্লার ময়নামতীর প্রত্ন-ঐতিহ্যের সুন্দর সঙ্গী।
টিকিট, সময় ও যাতায়াত
লোকশিল্প জাদুঘর: সাপ্তাহিক বন্ধ বৃহস্পতিবার; অন্যান্য দিন সকাল ১০টা–বিকেল ৬টা। টিকিট (কুহুডাকের হালনাগাদ তালিকা অনুযায়ী) জাদুঘরে জনপ্রতি ৫০ টাকা (বিদেশি ১০০, শিক্ষার্থী ৩০), বড় সরদার বাড়িতে আলাদা ১০০ টাকা (বিদেশি ২০০); অনলাইনে সরকারি টিকিট পোর্টালেও কাটা যায়। পানাম নগরে প্রবেশ ফি নামমাত্র (কুহুডাক অনুযায়ী ১৫ টাকা) — ফি বদলাতে পারে, গেটে যাচাই করুন। যাওয়া: গুলিস্তান থেকে সোনারগাঁগামী বাসে মোগরাপাড়া চৌরাস্তা নেমে রিকশা/অটোতে পানাম (ঢাকা থেকে মোট ~৩০ কিলোমিটার); আগে জাদুঘর দেখে পরে পানামের রাস্তায় বিকেলের আলোয় হাঁটা সবচেয়ে ভালো পরিকল্পনা। সতর্কতা: অনেক ভবন ঝুঁকিপূর্ণভাবে জীর্ণ — ভেতরে ঢুকবেন না, দেয়ালে হেলান দেবেন না, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সাইনবোর্ডের নির্দেশ মেনে চলুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
পানাম নগরে কয়টি ভবন আছে?
৫২টি — একটি ৬০০ মিটার রাস্তার দুই পাশে (উত্তরে ৩১, দক্ষিণে ২১) (এনসিটিবি)।
ভবনগুলো কোন আমলের?
উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক আমলের বণিক-বাড়ি — ঈশা খাঁর আমলের নয় (বাংলাপিডিয়া)।
লোকশিল্প জাদুঘর কে, কবে প্রতিষ্ঠা করেন?
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, ১২ মার্চ ১৯৭৫ (কুহুডাক)।
কোন দিন বন্ধ থাকে?
লোকশিল্প জাদুঘর বৃহস্পতিবার বন্ধ থাকে (কুহুডাক)।
ঢাকা থেকে কীভাবে যাবেন?
গুলিস্তান থেকে বাসে মোগরাপাড়া, সেখান থেকে রিকশা/অটোতে পানাম নগর।
শেষকথা
পানাম নগর বাংলাদেশের সেই বিরল জায়গা, যেখানে ইতিহাস জাদুঘরের কাচে নয় — খোলা রাস্তায়, ভাঙা দেয়ালে দাঁড়িয়ে আছে। জীর্ণ প্রাসাদগুলোর ফাঁক দিয়ে বিকেলের আলো পড়লে বোঝা যায়, হারানো নগরীর দুঃখের ভেতরেও কতটা সৌন্দর্য বেঁচে আছে।