• 30 Oct, 2026

শাহপরান (রঃ)-এর মাজার: কবুতরের কিংবদন্তি আর টিলার খানকাহ

শাহপরান (রঃ)-এর মাজার: কবুতরের কিংবদন্তি আর টিলার খানকাহ

সিলেট শহর থেকে ~৭–৮ কিমি পূর্বে খাদিমনগরের টিলায় হযরত শাহপরান (রঃ)-এর মাজার — শাহজালালের ভাগ্নে ও প্রধান খলিফা, জালালী কবুতর খাওয়ার কিংবদন্তি ও পাখা থেকে কবুতর ফিরিয়ে দেওয়ার লোককথা, মুঘল-ধাঁচের মসজিদ, আশাগাছ আর রবিউল আউয়ালের ওরসসহ যাচাইকৃত গাইড।

সিলেটে জিয়ারত সাধারণত দুটি নাম একসঙ্গে উচ্চারণ করে করা হয় — শাহজালাল ও শাহপরান। শাহজালালের সিলেট পোস্টে আমরা দরগাহের গল্প বলেছি; এবারের গন্তব্য তাঁর ভাগ্নে ও প্রধান খলিফা হযরত শাহপরান (রঃ) — যাঁর আসল নাম শাহ ফরহান, জন্ম ইয়েমেনের হাদরামাউতে। শহর থেকে প্রায় ৭–৮ কিমি পূর্বে খাদিমনগরের এক উঁচু টিলায় তাঁর মাজার — শান্ত, সবুজে ঘেরা, ভিড়ভাট্টা তুলনামূলক কম।

পরিচয়: মামার সঙ্গী থেকে খাদিমনগরের পীর

শাহপরান মামা শাহজালালের সঙ্গেই ভারতে আসেন এবং ১৩০৩ সালের সিলেট অভিযানে অংশ নেন (বাংলা উইকিপিডিয়া/অফরোড বাংলাদেশ)। বিজয়ের পর তিনি শহরের বাইরে দক্ষিণগঢ় পরগনার খাদিমনগরে খানকাহ গড়ে ইসলাম প্রচারে জীবন কাটান; সিলেট ছাড়া নবীগঞ্জ-হবিগঞ্জ অঞ্চলেও তাঁর প্রচারকার্যের কথা বলা হয় (আলফাফা ডিরেক্টরি)। তিনি অবিবাহিত ছিলেন, উত্তরসূরি রেখে যাননি; ঠিক কবে ও কীভাবে তাঁর ইন্তেকাল হয় — তা জানা যায় না বলেই সূত্রগুলো স্বীকার করে। খানকাহর পাশেই টিলার ওপর তাঁর সমাধি।

কিংবদন্তি: কবুতর খাওয়া আর পাখার ঝাঁক

সিলেটের সবচেয়ে জীবন্ত লোককথাগুলোর একটি জড়িয়ে শাহপরানের নামে। কাহিনি অনুযায়ী, নিজামুদ্দিন আউলিয়ার উপহার দেওয়া জালালী কবুতর সিলেটে কেউ শিকার করত না; কিন্তু তরুণ শাহপরান গোপনে রোজ একটি করে কবুতর খেতে থাকেন। সংখ্যা কমে এলে শাহজালাল কারণ জানতে পেরে ভাগ্নেকে ভর্ৎসনা করেন। উত্তরে শাহপরান খাওয়া কবুতরগুলোর জমিয়ে রাখা পাখা আকাশে উড়িয়ে দেন — আর সেগুলো জীবন্ত কবুতর হয়ে মামার দরগাহে ফিরে যায় (বণিক বার্তা)। শাহজালাল তাঁর আধ্যাত্মিক পরিপক্বতায় সন্তুষ্ট হলেও প্রকাশ্যে কেরামত দেখানোর ব্যাপারে সতর্ক করে তাঁকে খাদিমনগরে প্রচারে পাঠিয়ে দেন — কারো কারো বর্ণনায় এই ‘বিচ্ছেদ’ই দুই মাজারের আলাদা ঠিকানার কারণ। লোকসংগীত পর্যন্ত পৌঁছেছে এই গল্প — বয়াতি লতিফ সরকারের গান: ‘শাহপরান আউলিয়া, জালালী কইতর খাইয়া, জিন্দা করিয়া দিল পাখা উড়াইয়া...’

প্রাঙ্গণে যা দেখবেন

  • টিলা ও সিঁড়ি: উঁচু টিলার ওপর ইটের বেষ্টনীদেয়াল ঘেরা মাজার; ওঠার সিঁড়িটি মুঘল আমলে তৈরি বলে লোকমুখে প্রচলিত (ভ্রমণগাইড)।
  • মসজিদ: পশ্চিম পাশে মুঘল স্থাপত্যরীতির প্রাচীন মসজিদ; ১৯৮৯–৯১ সালে আধুনিকায়নের পর একসঙ্গে ~১,৫০০ মুসল্লি নামাজ পড়তে পারেন (উইকিপিডিয়া)। কমপ্লেক্সে ঈদগাহ, লঙ্গরখানা, নারীদের নামাজের জায়গা ও পুকুরও আছে।
  • আশাগাছ: মাজারের উত্তর পাশে প্রাচীন এই গাছটির পাতা দেখে মনে হয় ডুমুর, আমসহ কয়েকটি গাছের মিশেল; ভক্তরা ডুমুরের বীজ তাবারুক হিসেবে খান, গাছের আমও সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করা হয় (অফরোড বাংলাদেশ)।
  • নারী দর্শনার্থীদের ঘর ও পুকুর: মূল টিলা থেকে কিছুটা দূরে নারী পর্যটকদের জন্য ঘর, বিদেশি অতিথিদের বিশ্রামাগার এবং অজু-গোসলের পুকুর রয়েছে (ভ্রমণগাইড)। কাছেই আরেক অনুসারী কন্যাশাহের মাজার ও তাঁর জীবন নিয়ে ছোট প্রদর্শনীও জিয়ারতকারীরা দেখেন।
  • তাঁর নাম বহন করে সুরমা নদীর ওপর শাহপরান সেতু, একটি ফেরি এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছাত্রাবাসও (উইকিপিডিয়া)।

ওরস ও যাওয়ার সময়

প্রতি বছর রবিউল আউয়াল মাসের ৪, ৫ ও ৬ তারিখে এখানে শাহপরানের ওরস অনুষ্ঠিত হয় (একাধিক সূত্র) — সে সময় ভক্তসমাগম চরমে ওঠে। এমনিতে প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী আসেন; শুক্রবার ভিড় বেশি, ভোর বা বিকেলের দিকটা অপেক্ষাকৃত নির্জন। এলাকাটি এখন প্রসারিত সিলেট সিটি করপোরেশনের আওতায় — শহর থেকে সিএনজি/রিকশায় সহজে পৌঁছানো যায়, তবে ওরসের দিনগুলোতে মাজার সড়কে যানজটের প্রস্তুতি রাখুন; গাড়ি পার্কিং সীমিত হতে পারে। মাজার গেটে একটি দৃষ্টিনন্দন তোরণ নির্মাণের উদ্যোগ সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের আমলে নেওয়া হয়েছিল (মানবজমিন আর্কাইভ)।

জিয়ারতের আচরণ ও সুযোগ-সুবিধা

দুই মাজারেই একই শিষ্টাচার — পরিমিত পোশাক, মোবাইল নিরব, মাজারকক্ষে ছবি তোলার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের নিয়ম অনুসরণ। এখানে নারী দর্শনার্থীদের জন্য আলাদা ঘর ও নামাজের জায়গা এবং বিদেশি অতিথিদের বিশ্রামাগার থাকায় পরিবার নিয়ে গেলেও অসুবিধা কম (ভ্রমণগাইড)। টিলার পাদদেশে ফুল-চাদর-আতরের দোকান সারি; কেনাকাটায় দরদাম স্বাভাবিক। মানতের অনুদান দেওয়ার হলে কমপ্লেক্সের নির্ধারিত বাক্স/অফিস ব্যবহার করুন।

অর্ধদিনের নমুনা সূচি (দরগাহের সঙ্গে মিলিয়ে)

  • সকাল: শাহজালালের দরগাহে জিয়ারত শেষে শহরে খাওয়া।
  • দুপুরের আগ: খাদিমনগরে শাহপরানের মাজার — সিঁড়ি বেয়ে টিলা, মসজিদ ও আশাগাছ।
  • বিকেল: ফেরার পথে শহরে সুরমা পাড় বা শাহপরান সেতু এলাকায় বিরতি।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

শাহপরান শাহজালালের কে হন?

বোনের ছেলে — অর্থাৎ ভাগ্নে; তিনি শাহজালালের প্রধান খলিফা হিসেবেও পরিচিত।

শাহপরানের ওরস কখন হয়?

প্রতি বছর রবিউল আউয়ালের ৪–৬ তারিখে।

শাহজালালের দরগাহ থেকে দূরত্ব কত?

প্রায় ৮ কিমি পূর্বে, খাদিমনগর (খাদিমপাড়া) এলাকায়।

শেষকথা

শাহজালালের দরগাহ যেখানে নগরের স্পন্দন, খাদিমনগরের টিলা সেখানে ধ্যানের নিস্তব্ধতা — দুটো মিলেই সিলেট-জিয়ারতের পূর্ণ চিত্র। আসল ক্রমটা মনে রাখুন: প্রথমে শাহজালালের সিলেট, তারপর খাদিমনগর।