• 30 Oct, 2026

ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার দুই রত্ন — আবাইপুরে রামসুন্দর শিকদারের জমিদার বাড়ি ("শিকদার স্ট্রিট", কুমার নদের তীর) এবং দরগাপাড়ায় সুলতানি আমলের শাহী মসজিদ (~১৫২৩–২৪, নুসরাত শাহের আমল) ও দরবেশ আরব শাহের মাজার। ইতিহাস, বর্তমান অবস্থা ও যাওয়ার গাইড।

ঝিনাইদহ জেলার উত্তরের উপজেলা শৈলকূপা ভ্রমণকারীর রাডারে কমই আসে — অথচ এখানেই কুমার নদের দুই পাড়ে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে দুই যুগের দুই কীর্তি: সুলতানি আমলের এক শাহী মসজিদ, পাঁচ শ বছর ধরে যেখানে নামাজ চলে আসছে; আর উনিশ শতকের শিকদার জমিদারদের বিশাল বাড়ি, যা "শিকদার স্ট্রিট" নামে একসময় ছিল জনপদের প্রাণকেন্দ্র। ঝিনাইদহ শহরের ঐতিহ্য-বৃত্ত শেষ করে উত্তরে এক বেলার সফরেই এই দুটো দেখে ফেলা যায়।

শৈলকুপা শাহী মসজিদ: নুসরাত শাহের আমলের নিদর্শন (দরগাপাড়া)

উপজেলা সদরের দরগাপাড়ায়, কুমার নদের উত্তর তীরে শৈলকুপা শাহী মসজিদ — দক্ষিণবঙ্গে সুলতানি স্থাপত্যের অন্যতম প্রাচীন নিদর্শন, বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে। নির্মাণকাল নিয়ে সূত্রে সামান্য মতভেদ আছে; অধিকাংশ বর্ণনায় (আদার বেপারী, বাংলা উইকিপিডিয়ার ইতিহাস-অংশ) ধরা হয়, ১৫২৩–২৪ সালের দিকে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের পুত্র সুলতান নাসিরউদ্দিন নুসরাত শাহের আমলে মসজিদটি নির্মিত — কোনো সূত্রে ১৫৩২ সালও এসেছে। প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, নুসরাত শাহ গৌড় থেকে ঢাকার পথে শৈলকূপায় কিছুদিন বিশ্রাম নেন; তাঁর সফরসঙ্গী দরবেশ আরব শাহ (শাহ মোহাম্মদ আরিফ-ই-রব্বানী) এখানে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে সুলতান তাঁর জন্য মসজিদটি নির্মাণ করেন এবং পরিচালনা-সংস্কারের জন্য কয়েক শ বিঘা জমি ওয়াকফ করে দেন। ছোট লাল ইটের মসজিদটি লম্বায় প্রায় ৩১.৫ ফুট, প্রস্থে ২১ ফুট, দেয়াল সাড়ে পাঁচ ফুট পুরু (ভ্রমণগাইডের মাপ অনুযায়ী); গম্বুজসংখ্যা নিয়ে সূত্রে ছয় ও সাত — দুটো সংখ্যাই পাওয়া যায়; চারকোণে অলংকৃত মিনার, সাতটি প্রবেশপথ ও তিনটি মেহরাব রয়েছে; মূল প্রবেশপথ ও মিনারগুলো পরবর্তী সংস্কারে যুক্ত হয়েছে (বাংলা উইকিপিডিয়া)। পূর্বপাশে দরবেশ আরব শাহের উঁচু মাজার, আশেপাশে আরও কয়েকজন আউলিয়ার কবর; উত্তরে পুকুর। ওয়াকফকৃত জমির আয় থেকেই যুগে যুগে মসজিদটির সংস্কার হয়ে এসেছে বলে বর্ণনা পাওয়া যায় — অর্থাৎ স্থাপনাটির টিকে থাকা শুধু পুরনো ইটের গুণে নয়, পাঁচ শ বছর ধরে চলা একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ফসল। মসজিদটি এখনো সক্রিয় উপাসনালয় — নামাজের সময়ে ভেতরে ঢুকতে হলে জামাতের শৃঙ্খলা মেনে চলুন। ঝিনাইদহের গেজেটভুক্ত ২১টি স্থাপনার তালিকায় এই মসজিদও সংরক্ষণ-অভাবের তালিকায় আছে (বণিক বার্তা/দ্য ফ্রি লাইব্রেরি প্রতিবেদন) — পাঁচ শ বছরের স্থাপনাটির যত্নে আরও উদ্যোগ দরকার।

জমিদার বাড়ি: "শিকদার স্ট্রিট" (আবাইপুর)

আবাইপুর গ্রামে কুমার নদীর ধারে শৈলকুপা জমিদার বাড়ি — অবিভক্ত যশোর জেলার জমিদার রামসুন্দর শিকদারের বাড়ি, যার প্রসার এতটাই ছিল যে এলাকাটি "শিকদার স্ট্রিট" নামে পরিচিতি পেয়েছিল (সববাংলায়, বাংলা উইকিপিডিয়া)। দ্বিতল এই বিশাল বাড়ি নির্মিত হয়েছিল ১২০০ বঙ্গাব্দের মাঝামাঝি সময়ে; জমিদারদের ব্যবহৃত গ্রামোফোন, হুঁকো, তরবারি ও এসরাজের মতো নিদর্শন বংশধরদের কাছে সংরক্ষিত আছে বলে জানা যায় (সববাংলায়)। জনশ্রুতিতে বাড়িটির কক্ষসংখ্যা তিন শতাধিক বলা হলেও তা যাচাইকৃত নয় — তবে আজ যা দেখা যায়, ধ্বংসপ্রায় কারুকার্যময় প্রাসাদ, বিশাল থাম-পিলার, ভেতরের বড় পুকুর আর নদীর পাড়ের নীরব পরিবেশ মিলিয়ে জায়গাটি ছবি তোলার জন্য দারুণ। ভবনটি জরাজীর্ণ — ভঙ্গুর অংশে ঢোকা বিপজ্জনক, বাইরে থেকে দেখাই নিরাপদ; প্রবেশে আনুষ্ঠানিক টিকিটের চল নেই (ভ্রমণ-বর্ণনা অনুযায়ী), তবে এটি বসতিসংলগ্ন এলাকা — স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে ঘুরুন।

দুটো স্থাপনাকে জোড়া দেয় কুমার নদ

লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, শৈলকূপার দুই কীর্তির ঠিকানাই একই নদীর গায়ে — শাহী মসজিদ কুমার নদের উত্তর তীরে, আর জমিদার বাড়ির পাশ দিয়েও বয়ে গেছে এই কুমার নদীই। একসময় এই নদীপথেই মানুষ, পণ্য ও জমিদারি ক্ষমতা চলাচল করেছে; নদী মরে যেতে যেতে দুটো স্থাপনার ভাগ্যও যেন এক সুতোয় বাঁধা পড়েছে। ভ্রমণের ক্রমটা তাই সাজান এভাবে: প্রথমে সদরের দরগাপাড়ায় শাহী মসজিদ ও আরব শাহের মাজার, তারপর আবাইপুরের জমিদার বাড়ি — ফাঁকে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে বিকেলের আলোয় দুটো যুগকে একসঙ্গে দেখা। পর্যটকদের বর্ণনায় বাড়িটির নীরব পরিবেশ ও প্রাচীন প্রেক্ষাপটে ছবি তোলার অভিজ্ঞতাই সবচেয়ে বেশি প্রশংসিত হয়।

একই দিনে বারোবাজারের সঙ্গে কীভাবে মেলে

শৈলকূপা থেকে ঝিনাইদহ শহর হয়ে দক্ষিণে কালীগঞ্জের বারোবাজার — দুটোই সুলতানি যুগের গল্প, একদিকে মসজিদকেন্দ্রিক বসতি, অন্যদিকে গোটা সমাধি-নগরী। ঝিনাইদহে রাত কাটিয়ে সকালে শৈলকূপা (শহর থেকে ~২০ কিলোমিটার) আর বিকেলে বারোবাজার ধরলে জেলার দুই প্রান্তের সুলতানি ঐতিহ্য এক খাঁটি দিনে মিলে যায়।

কীভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে বাসে ঝিনাইদহ (গাবতলী থেকে একাধিক পরিবহন চলে; ভাড়া কোম্পানিভেদে বদলায়); ঝিনাইদহ জেলা সদর থেকে বাস বা সিএনজিতে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে শৈলকূপা উপজেলা সদর। শাহী মসজিদ সদরের দরগাপাড়াতেই; জমিদার বাড়ি আবাইপুর গ্রামে — সদর থেকে ভ্যান/ইজিবাইকে স্থানীয়দের জিজ্ঞেস করে যান। শৈলকূপায় ভালো হোটেল নেই — থাকতে হবে ঝিনাইদহ শহরে; খাবারের জন্য শৈলকূপা বাজারে সাধারণ হোটেল আছে, ভালো খাবার শহরেই মিলবে। মসজিদে গেলে পোশাক ও আচরণে উপাসনালয়ের মর্যাদা রক্ষা করুন; জুমার দিনে ভিড় বেশি থাকে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

শাহী মসজিদ কত পুরনো ও কে নির্মাণ করেন?

প্রায় পাঁচ শ বছরের — বেশিরভাগ বর্ণনায় ১৫২৩–২৪ সালে সুলতান নাসিরউদ্দিন নুসরাত শাহের আমলে নির্মিত (কোনো সূত্রে ১৫৩২); প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী সফরসঙ্গী দরবেশ আরব শাহের জন্য নির্মাণ, যাঁর মাজার মসজিদের পাশেই।

মসজিদে কি নামাজ হয়?

হ্যাঁ — এটি এখনো সক্রিয় উপাসনালয় ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত স্থাপনা।

জমিদার বাড়ি কার ছিল?

অবিভক্ত যশোরের জমিদার রামসুন্দর শিকদারের; এলাকাটি "শিকদার স্ট্রিট" নামে খ্যাত ছিল। বাড়িটি এখন ধ্বংসপ্রায় — বাইরে থেকে দেখা নিরাপদ।

শৈলকূপা ঝিনাইদহ শহর থেকে কত দূর?

প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তরে; বাস/সিএনজিতে সহজে যাওয়া যায়।

এক দিনে কী কী দেখা হয়?

সকালে শৈলকূপার শাহী মসজিদ ও জমিদার বাড়ি, বিকেলে ঝিনাইদহ শহর বা বারোবাজার — এই কম্বিনেশনই সবচেয়ে কার্যকর।

শেষকথা

শৈলকূপার দুটি স্থাপনা দুই যুগের দুই শিক্ষা দেয়: মসজিদটি টিকে আছে কারণ মানুষ প্রতিদিন সেখানে ফিরে আসে; জমিদার বাড়িটি হারিয়ে যাচ্ছে কারণ কেউ ফেরেনি। কুমার নদের পাড়ে দাঁড়িয়ে এই তফাতটা চোখে পড়ে — আর সম্ভবত সেখানেই এই সফরের আসল মূল্য।