• 30 Oct, 2026

কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহ — ১৮২৮ সাল থেকে ঈদের জামাত, সৈয়দ আহমদ ও "সোয়া লাখ" নামকরণ, দেওয়ান মান্নান দাদ খাঁর জমিদান, ২৬৫ কাতারের মাঠ এবং কিশোরগঞ্জ শহরের দর্শনীয় স্থানসহ গাইড।

ঈদুল ফিতরের সকালে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মানুষের জমায়েত হয় একটি জেলা শহরের নদীতীরের মাঠে — কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহ। প্রায় দুইশ বছর ধরে এখানে চলছে ঈদের জামাতের ঐতিহ্য, আর মাঠটির নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে তার প্রথম দিনের গল্প: "সোয়া লাখ"। ধর্মীয় ঐতিহ্য আর উৎসবের আবহ মিলিয়ে শোলাকিয়া কিশোরগঞ্জ শহরের পরিচয়ের কেন্দ্র।

১৮২৮: সৈয়দ আহমদ ও "সোয়া লাখ"

শোলাকিয়ার "সাহেব বাড়ি"র পূর্বপুরুষ, ইয়েমেন হয়ে আগত সুফি সৈয়দ আহমদ ১৮২৭ সালে এখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন এবং ১৮২৮ সালে নিজের তালুকের মাঠে প্রথম ঈদের জামাতের আয়োজন করেন — ইমামতি করেন তিনি নিজে (বাংলা উইকিপিডিয়া/ভ্রমণগাইড)। নামকরণ নিয়ে দুটি মত প্রচলিত: এক মতে, সেদিনের জামাতে বা মোনাজাতে মুসল্লির সংখ্যা হিসেবে তিনি "সোয়া লাখ" (এক লাখ পঁচিশ হাজার) কথাটি উচ্চারণ করেছিলেন — সেই "সোয়া লাখিয়া" থেকেই শোলাকিয়া; অন্য মতে, মোঘল আমলে এই পরগনার রাজস্ব ছিল সোয়া লাখ টাকা, সেই উচ্চারণের বিবর্তনেই নামটি (বাংলা উইকিপিডিয়া)। ১৯৫০ সালে মাঠটি বড় আকার পায় হয়বতনগরের দেওয়ান মান্নান দাদ খাঁর দানে — জঙ্গলবাড়ির ঈশা খাঁর বংশধর এই দেওয়ান অতিরিক্ত ৪.৩৫ একর জমি ঈদগাহকে দান করেন (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

মাঠের কাঠামো ও ঈদের দিন

নরসুন্দা নদীর তীরে উঁচু দেয়ালে ঘেরা মাঠের আয়তন ৭ একর; ভেতরে ২৬৫টি কাতার (সারি) — প্রতি কাতারে প্রায় ৫০০ মুসল্লি ধরলে মাঠেই প্রায় ১ লাখ ৩২ হাজার মানুষের জায়গা হয় (বাংলা উইকিপিডিয়া)। পূর্বদিকে দোতলা মিম্বর ভবন, যেখানে প্রায় ৫০০ মুসল্লি নামাজ পড়তে পারেন। ঈদুল ফিতরে মাঠ ছাড়িয়ে আশপাশের সড়ক, খোলা জায়গা ও বাড়ির উঠান পর্যন্ত জামাত ছড়িয়ে পড়ে — ২০২৫ সালের ঈদুল ফিতরে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছয় লাখ ছাড়িয়ে গিয়েছিল বলে জানা যায় (বাংলা উইকিপিডিয়া)। এখানকার জামাতকে দেশের সবচেয়ে বড় ঈদ-জামাত বলা হয়; চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ বড় মসজিদের মতো বড় ধর্মীয় কেন্দ্রগুলোর মতোই শোলাকিয়াও ঈদের দিনে পুরো শহরটিকে উৎসবে রূপ দেয়। নিরাপত্তা প্রসঙ্গ: ২০১৬ সালের ৭ জুলাই ঈদের জামাতের আগে এই এলাকায় জঙ্গি হামলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ কয়েকজন নিহত হন — এর পর থেকে ঈদের দিন এখানে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও তল্লাশি থাকে; দর্শনার্থী হিসেবে গেলে সহযোগিতা করুন ও ভিড়ের নিয়ম মানুন।

কিশোরগঞ্জ শহরে আর যা দেখবেন

শহরটি নরসুন্দা নদীর দুই তীরে গড়া পুরনো বাণিজ্যিক জনপদ; ঈদগাহ ছাড়া শহরকেন্দ্রিক দিনটি সাজানো যায় এভাবে — শহর থেকে মাত্র ~৭ কিলোমিটারে জঙ্গলবাড়ি দুর্গ (ঈশা খাঁর দ্বিতীয় রাজধানী), আর শহর থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরে মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা কবি চন্দ্রাবতীর মন্দির-স্মৃতি ও তাঁর পিতা মনসামঙ্গলের রচয়িতা দ্বিজবংশী দাসের বাড়ির এলাকা (বন্ধন ম্যাগাজিন)। নরসুন্দার তীরে সন্ধ্যার হাঁটা আর পুরনো বাজারের খাবার দিয়ে দিন শেষ করুন। ঈদ ছাড়া অন্য সময় মাঠটি ফাঁকা ও শান্ত — ইতিহাসের জায়গা হিসেবে দেখতে সেটাই ভালো সময়; ঈদের দিন গেলে ভোরের আগেই পৌঁছাতে হবে এবং প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

শোলাকিয়া ঈদগাহ কবে প্রতিষ্ঠিত?
১৮২৮ সালে সুফি সৈয়দ আহমদের উদ্যোগে প্রথম ঈদের জামাত হয় (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

"শোলাকিয়া" নাম এল কীভাবে?
"সোয়া লাখ" থেকে — হয় প্রথম জামাতের মুসল্লি সংখ্যা, নয় পরগনার রাজস্বের পরিমাণ (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

মাঠে কত মানুষ নামাজ পড়তে পারেন?
মাঠের ২৬৫ কাতারে প্রায় ১ লাখ ৩২ হাজার; চারপাশ মিলিয়ে ঈদুল ফিতরে কয়েক লাখ (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

মাঠটি বড় হয় কার দানে?
১৯৫০ সালে দেওয়ান মান্নান দাদ খাঁ ৪.৩৫ একর জমি দান করেন (বাংলা উইকিপিডিয়া)।

কিশোরগঞ্জ শহরে কাছাকাছি আর কী আছে?
জঙ্গলবাড়ি দুর্গ (~৭ কিমি) ও চন্দ্রাবতীর মন্দির-স্মৃতি (~৬ কিমি) (বন্ধন ম্যাগাজিন)।

শেষকথা

শোলাকিয়া শুধু একটি মাঠ নয় — দুইশ বছরের সামাজিক ইতিহাসের ধারক, যেখানে ঈশা খাঁর বংশধরের জমিদান থেকে শুরু করে লাখো মানুষের প্রার্থনা পর্যন্ত সবই এক সূত্রে গাঁথা। ঈদের ভিড় হোক বা সারা বছরের নীরবতা, নরসুন্দার তীরের এই মাঠ বাংলাদেশের ধর্মীয় ভূগোলের অনন্য এক নাম।