• 29 Oct, 2026

ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর: লুটের পর ফিরে পাওয়া সাদা রাজ্য

ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর: লুটের পর ফিরে পাওয়া সাদা রাজ্য

কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জে ধলাই নদের উৎসে সাদাপাথর — সাদা পাথরের বিছানা, চেরাপুঞ্জির পাহাড়, রোপওয়ে-ঐতিহ্য; ২০২৪-২৫-এর লুটপাট ও পাথর ফিরিয়ে আনার অভিযানের সত্যকথা, নৌকার সরকারি রেট ও যাওয়ার রুটসহ যাচাইকৃত গাইড।

সিলেটের সবচেয়ে আলোচিত — আর সাম্প্রতিককালে সবচেয়ে বিতর্কিত — পর্যটনকেন্দ্র। ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায়, সিলেট শহর থেকে ~৩৫ কিমি দূরে ধলাই নদের উৎসমুখে: নদের বুকে প্রায় পাঁচ একর জুড়ে ছড়ানো সাদা পাথরের বিছানা, তার ওপর দিয়ে বরফশীতল স্বচ্ছ পানির তীব্র স্রোত, আর ওপারে ভারতের চেরাপুঞ্জির পাহাড়ের সবুজ দেয়াল। ভাইরাল ছবিতে জায়গাটাকে কেউ কেউ ‘বাংলার কাশ্মীর’ পর্যন্ত বলেছেন। বিছানাকান্দি-র পাথুরে বিছানার চেয়েও এখানকার রঙ আরও উজ্জ্বল সাদা — তবে এই গাইডে শুধু সৌন্দর্যের কথা নয়, গত দুই বছরে যা ঘটেছে সেটাও সোজাসুজি বলা হলো।

ধলাই, কোয়ারি আর রোপওয়ের গল্প

ভোলাগঞ্জ দেশের সর্ববৃহৎ পাথর কোয়ারি এলাকা: বর্ষায় খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড় থেকে ঢল নামলে ধলাই নদী ভাসিয়ে আনে প্রচুর পাথর, আর পরের বর্ষা পর্যন্ত চলে আহরণ (স্থানীয় তথ্যসূত্র)। ব্রিটিশ-পরবর্তী যুগের শিল্প-ঐতিহ্য হিসেবে এখানে ১৯৬৪–৬৯ সালে নির্মিত হয় ভোলাগঞ্জ রোপওয়ে প্রকল্প — দৈর্ঘ্য ~১১ মাইল, টাওয়ার ১২০টি; উত্তোলিত পাথর রোপওয়ে ও রেলওয়ে বাংকার হয়ে পাঠানো হতো ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে। ১৯৯৪ সালের পর এই পদ্ধতিতে উত্তোলন বন্ধ হয়ে যায়; বাংকারে জমে থাকা পাথরের স্তূপ ছিল এক প্রকারের খোলা ভান্ডার। এই ভূগোল-শিল্পের ইতিহাসই সাদাপাথরের পটভূমি।

২০২৪–২৫: লুটপাট আর পাথর ফেরানোর নজিরবিহীন অভিযান

সত্যিটা এড়িয়ে গেলে এই গাইড অসম্পূর্ণ থাকবে:

  • ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে সাদাপাথর পর্যটন এলাকা ও পাশের রেলওয়ে বাংকারের জমানো পাথরে অবাধ লুটপাট শুরু হয়; কর্মকর্তাদের হিসেবে স্পটটিতে আনুমানিক ১ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট পাথর ছিল, পরিবেশকর্মীদের দাবি — লুট হয়েছে দুই কোটি ঘনফুটেরও বেশি (ডেইলি স্টার/নিউ এজ)। দেশজুড়ে প্রতিবাদের মুখে ২০২৫ সালের আগস্টে হাইকোর্ট সাত দিনের মধ্যে লুটের পাথর উদ্ধার করে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন (ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস)।
  • জেলা প্রশাসনের জরুরি সভার (১৩ আগস্ট ২০২৫) সিদ্ধান্ত: জাফলং ইসিএ ও সাদাপাথরে ২৪ ঘণ্টা যৌথবাহিনীর দায়িত্ব, চেকপোস্ট, অবৈধ ক্রাশারের বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন, জড়িতদের গ্রেপ্তার — এক ইউপি চেয়ারম্যানসহ (ডেইলি স্টার)।
  • অভিযানে মিল-ইয়ার্ড এমনকি বাড়ির রান্নাঘরের পেছনে বালুচাপা দেওয়া পাথরও উদ্ধার হয়; আগস্টের শেষ নাগাদ প্রায় ২৬–২৮ লাখ ঘনফুট পাথর উদ্ধার করে নৌকায় করে স্পটে ফিরিয়ে বসানো হয়, জব্দ হয় দেড় শতাধিক ট্রাক (বাসস/নিউ এজ)।
  • তবে প্রশাসনের নিজের স্বীকারোক্তিতেই সীমার কথা স্পষ্ট: দশকের পর দশকে প্রাকৃতিকভাবে জমে ওঠা পাথরকে হুবহু আগের বিন্যাসে ফেরানো কঠিন (বাসস-ভিত্তিক বিশ্লেষণ)। অর্থাৎ সাদাপাথর ফিরে আসছে — ধীরে, নজরদারির মধ্যে — কিন্তু আগের রূপ পুরোপুরি ফিরেছে, এমন দাবি এই গাইড করবে না। পর্যটক হিসেবে আপনার ভূমিকা: পাথর সরাবেন না, ছবিতেই সীমাবদ্ধ থাকুন।

যাওয়া ও নৌকা (বর্তমান প্রচলিত ব্যবস্থা)

  • সড়ক: আম্বরখানা থেকে কোম্পানীগঞ্জ রুটে সিএনজি (জনপ্রতি ~১২০–২০০ টাকা, গন্তব্যভেদে), বিআরটিসি/লোকাল বাস (~৭০–৮০ টাকা) চলাচল করে টুকের বাজার/ভোলাগঞ্জ বাজার পর্যন্ত। সিলেট-কোম্পানীগঞ্জ সড়কের দীর্ঘদিনের বেহাল দশার পর উন্নয়নকাজ চলমান — তবু সময় ~১.৫ ঘণ্টা হাতে রাখুন।
  • নৌকা: টুকের বাজার ঘাট থেকে ট্রলারে ~৩০ মিনিট; যাওয়া-আসা ভাড়া ~১,০০০–১,২০০ টাকা (রিজার্ভ)। ভোলাগঞ্জের ১০ নম্বর জিরো পয়েন্ট ঘাট থেকে নৌকার সরকারি রেট ৮০০ টাকা (যাওয়া-আসা) বলে একাধিক সাম্প্রতিক গাইডে উল্লেখ আছে; স্পটে সাধারণত ~৩ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়। নিয়মিত নৌকাই ব্যবস্থা — ‘দশ মাইল’ ঘাট থেকে নিলে কম (~৫০০–৬০০) পড়লেও সড়কভাড়া বাড়ে। যাওয়ার আগে ঘাটে বর্তমান রেট যাচাই করুন।
  • মৌসুম: প্রকৃত রূপ বর্ষা ও তার পরের মাসগুলো (জুন–ডিসেম্বর); শীতে নদীতে পানি কমে নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে যায় — তখন নদীর বুক দিয়ে হেঁটে স্পটে যেতে হয় (ভোরের কাগজ/শিক্ষক বাতায়ন)।

সতর্কতা

তীব্র স্রোত ও গভীর পানি — সাঁতার জানলেও নদীর গভীরে নামবেন না (শিক্ষক বাতায়নের সতর্কবাণী); সীমান্তবর্তী এলাকা বলে বিজিবির নির্দেশনা মানুন; পলিথিন-প্লাস্টিক ফেলে আসবেন না। ছুটির দিনে ভিড় ও নৌকা-জট — সকালে পৌঁছান। থাকার ব্যবস্থা স্পটে নেই; সিলেট শহরই ঘাঁটি।

একদিনের নমুনা সূচি

  • সকাল ৭.৩০: আম্বরখানা থেকে কোম্পানীগঞ্জের বাস/সিএনজি; পথে বিল-পাড়ের দৃশ্য (দ্বিতল বিআরটিসির ওপরতলা ভিউয়ের জন্য আলাদা আনন্দের)।
  • সকাল ১০টা: ঘাট থেকে নৌকায় সাদাপাথর; সাদা বিছানায় স্রোতের ধারে সময়।
  • দুপুর: ঘাটে ফিরে স্থানীয় খাবার; বাংকার/রোপওয়ের ধ্বংসাবশেষ ঝলক দেখা (দূর থেকে)।
  • বিকেল: শহরে প্রত্যাবর্তন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

সাদাপাথরের পাথর কি আগের মতো আছে?

আংশিক — লুটের পর উদ্ধারকৃত পাথর ফিরিয়ে বসানো হয়েছে এবং এলাকা এখন যৌথবাহিনীর নজরদারিতে; তবে প্রাকৃতিক বিন্যাস পুরোপুরি ফেরেনি। সর্বশেষ অবস্থা যেতে যেতে স্থানীয় সূত্রে যাচাই করুন।

নৌকার ভাড়া নির্দিষ্ট কত?

জিরো পয়েন্ট ঘাট থেকে সরকারি রেট ৮০০ টাকা (যাওয়া-আসা) প্রচারিত; টুকের বাজার থেকে রিজার্ভ ট্রলার ১,০০০–১,২০০ পর্যন্ত যায়। ঘাটে নিশ্চিত করুন।

শীতে যাওয়া যাবে?

যাওয়া যায়, তবে নৌকা বন্ধ থাকলে নদীবুক হেঁটে যেতে হয় এবং পানির স্রোতধারার রূপটা পাওয়া যায় না।

শেষকথা

সাদাপাথর একই সঙ্গে বাংলাদেশের পর্যটনের সম্ভাবনা আর তার ঝুঁকির পাঠশালা। নদীর পাথর নদীতেই থাকলে আগামী বর্ষায় ধলাই আবার পূর্ণ রূপ নেবে। সিলেটের পাথুরে ত্রয়ীর বাকি অধ্যায় পড়ুন জাফলং ভ্রমণ গাইড-এ।