মধ্যযুগে বাংলার রাজধানী গৌড়-লখনৌতি ছিল উপমহাদেশের অন্যতম সমৃদ্ধ নগরী। আজ সেই নগরীর ধ্বংসাবশেষ দুই দেশে ভাগ হয়ে গেছে — সীমান্তের এপারে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলায় রয়ে গেছে তার উল্লেখযোগ্য এক অংশ: ছোট সোনা মসজিদ, দারাসবাড়ি মসজিদ-মাদ্রাসা আর তোহাখানা কমপ্লেক্স। এক রুটে এই তিনটি দেখা মানে সুলতানি বাংলার স্বর্ণযুগ থেকে মুঘল যুগ পর্যন্ত হেঁটে যাওয়া। রাজশাহী থেকে দূরত্ব প্রায় ৮৫ কিলোমিটার, চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার (বাসস)।
ছোট সোনা মসজিদ: সুলতানি স্থাপত্যের রত্ন
ফিরোজপুর গ্রামে বিশাল দীঘির পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই মসজিদকে বলা হয় "সুলতানি স্থাপত্যের রত্ন" বা "গৌড়ের রত্ন" (পর্যটন বিচিত্রা)। প্রধান প্রবেশপথের ওপরে স্থাপিত শিলালিপি অনুযায়ী, সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ-এর রাজত্বকালে (১৪৯৩–১৫১৯) মজলিস-ই-মাজালিস মনসুর ওয়ালী মুহাম্মদ বিন আলী মসজিদটি নির্মাণ করেন — তবে শিলালিপির তারিখের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় নির্দিষ্ট নির্মাণসাল জানা যায় না (প্রথম আলো/বাংলা উইকিপিডিয়া)। নামের গল্পটি মর্মস্পর্শী: গম্বুজ ও বাইরের গায়ে একসময় সোনালি গিল্টির আস্তরণ ছিল — সূর্য-চন্দ্রের আলোয় পুরো স্থাপনাটি সোনার মতো ঝলমল করত; ক্রাইটন ও কানিংহামের বর্ণনাতেও এর উল্লেখ মেলে (পর্যটন বিচিত্রা)। গৌড়ের ভারতীয় অংশে নুসরত শাহের তৈরি আরও বড় "বড় সোনা মসজিদ" থাকায় এটি "ছোট"। বাইরের মাপ ৮২ × ৫২.৫ ফুট, উচ্চতা প্রায় ২০ ফুট; ছাদে ১৫টি গম্বুজ — মাঝের সারির তিনটি চৌচালা ধাঁচের (ভেতরে গোলাপ-নকশার কারুকাজ), দুই পাশে ছয়টি করে গোল গম্বুজ; সামনে পাঁচটি ও দুই পাশে তিনটি করে মোট ১১টি প্রবেশপথ (বাসস)। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হলে ১৯০০ সালে ব্রিটিশ সরকার মসজিদটি সংস্কার করে (বাসস) — আজ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সংরক্ষণে থাকা সুলতানি নিদর্শনগুলোর মধ্যে এটিকে সর্বোত্তমের সারিতে রাখা হয়। এর স্থাপত্য-ধারার উত্তরসূরি রাজশাহীর বাঘা মসজিদ আর খুলনার ষাট গম্বুজ। মসজিদের কাছেই বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের সমাধি (ভ্রমণ-গাইড সূত্রে)।
দারাসবাড়ি: ধ্বংসের ভাঁজে বৃহত্তম
ছোট সোনা থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার পশ্চিমে (ইংরেজি উইকিপিডিয়া) দাঁড়িয়ে আছে এক ভিন্ন দৃশ্য — দারাসবাড়ি মসজিদ-এর ছাদহীন ধ্বংসাবশেষ। কলকাতার ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে সংরক্ষিত শিলালিপি অনুযায়ী, ১৪৭৯ খ্রিস্টাব্দে (৮৮৪ হিজরি) সুলতান শামসুদ্দিন ইউসুফ শাহ এটি নির্মাণ করেন (বাংলাপিডিয়া)। এটি ছিল গৌড়ের বাংলাদেশ অংশের সর্ববৃহৎ মসজিদ (বাংলাপিডিয়া) — বাইরের মাপ ৩৪ × ২০.৬ মিটার, ইটের গায়ে টেরাকোটা ফলকের অলংকরণ। প্রথমে নাম ছিল ফিরোজপুর মসজিদ; পাশে মাদ্রাসা গড়ে উঠলে "দরস" (পাঠ) থেকে দারাসবাড়ি নাম প্রচলিত হয়; মসজিদ-মাদ্রাসার মাঝে প্রায় ৬০ বিঘার বিশাল দীঘি (ভ্রমণট্রিপস)। সতর্কতা হিসেবে বলা দরকার: ২০০৬ সালের ডেইলি স্টার প্রতিবেদনে মসজিদের টেরাকোটা ফলক চুরি ও রক্ষণাবেক্ষণ-ঘাটতির কথা এসেছিল — ধ্বংসাবশেষ দেখতে যাওয়ার মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই যান। তবু বাংলাদেশ অংশের গৌড়ের সেরা টেরাকোটার নিদর্শন হিসেবে এর গুরুত্ব অস্বীকারের উপায় নেই।
তোহাখানা: সুলতানি নগরে মুঘল প্রাসাদ
ছোট সোনা থেকে আধা কিলোমিটারেরও কম দূরে ফিরোজপুরে বড় পুকুরের ("দাফে-উল-বালাহ") পশ্চিম পাড়ে তোহাখানা কমপ্লেক্স — ফারসি "তাহখানা" মানে ঠান্ডা ভবন (বাংলাপিডিয়া)। নির্মাতা নিশ্চিতভাবে জানা না গেলেও শৈলী ও ঐতিহাসিক বর্ণনা মিলিয়ে বাংলাপিডিয়ার সিদ্ধান্ত: মুঘল সুবাহদার শাহ সুজা (১৬৩৯–১৬৬০) তাঁর মুরশিদ শাহ নেয়ামতউল্লাহ ওয়ালী-র খানকাহ ও শীতকালীন বিশ্রামের জন্য এই ছোট প্রাসাদ গড়েন। কমপ্লেক্সে আছে ইটের দোতলা প্রাসাদ (দরজার চৌকাঠে কালো পাথর, ছাদে কাঠের কড়ি), পাশে অষ্টভুজ জলাধার থেকে পানি আসা হাম্মাম, প্রাসাদের উত্তর-পশ্চিমে তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ আর বারান্দাঘেরা এক গম্বুজের সমাধি ভবন — যেটি সম্ভবত সাধকের জন্যই আগে থেকে নির্মিত (বাংলাপিডিয়া)। সুলতানি শহরের বুকে খাঁটি মুঘল স্থাপত্যের এই কমপ্লেক্স পরবর্তীতে ঢাকা-মুর্শিদাবাদের মুঘল ভবনের প্রোটোটাইপ হয়েছিল বলে বাংলাপিডিয়ার মূল্যায়ন। মাজারের বিস্তারিত পরের পোস্টে থাকছে।
রুট ও ভ্রমণ তথ্য
তিনটি স্থানই একই সড়ক-করিডরে: চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর → সোনামসজিদ স্থলবন্দরমুখী মহাসড়ক → কোতোয়ালী দরজা (গৌড়ের প্রাচীর-তোরণের চিহ্ন) → দারাসবাড়ি → ছোট সোনা মসজিদ → তোহাখানা। এলাকাটি সীমান্তবর্তী — ছবি তোলা ও ঘোরাঘুরিতে স্থানীয় নির্দেশনা মেনে চলুন, সীমান্তরেখার দিকে অনাবশ্যক এগোবেন না। শীতকাল (নভেম্বর–ফেব্রুয়ারি) এই খোলা আকাশের ধ্বংসাবশেষ দেখার সেরা সময়। অর্ধেক দিনের পরিকল্পনা যথেষ্ট; শিবগঞ্জ বা জেলা শহরে ফিরে খাওয়া-দাওয়া।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ছোট সোনা মসজিদ কে নির্মাণ করেন?
ওয়ালী মুহাম্মদ বিন আলী, হোসেন শাহের আমলে (১৪৯৩–১৫১৯); নির্দিষ্ট সাল শিলালিপি-ক্ষতির কারণে অজানা।
"ছোট" সোনা কেন?
গৌড়ের ভারতীয় অংশে নুসরত শাহের বড় সোনা মসজিদ বড় বলে এটি ছোট (পর্যটন বিচিত্রা)।
দারাসবাড়ি মসজিদ কবে নির্মিত?
১৪৭৯ খ্রিস্টাব্দে, সুলতান ইউসুফ শাহের আদেশে (বাংলাপিডিয়া)।
তোহাখানা কে তৈরি করেন?
ঐতিহ্যগতভাবে শাহ সুজাকে নির্মাতা ধরা হয়; বাংলাপিডিয়ার মতে প্রমাণ তাঁর দিকেই ইঙ্গিত করে।
তিনটি স্থান কি একদিনে দেখা যায়?
হ্যাঁ — সবই শিবগঞ্জের একই করিডরে, অর্ধদিনেই সম্ভব।
শেষকথা
গৌড়ের বাংলাদেশ অংশ ইতিহাসের এমন এক অধ্যায় যেখানে রাজধানীর জৌলুস এখন ধুলোয় — তবু ছোট সোনার পাথরের খোদাই, দারাসবাড়ির ছাদহীন প্রার্থনাকক্ষ আর তোহাখানার "ঠান্ডা ভবন" মিলে বাংলার পাঁচশো বছরের গল্প এক দুপুরে বলে দেয়।