ঠাকুর পরিবারের ইতিহাস খুঁজতে গেলে পথ শেষ পর্যন্ত এসে থামে খুলনার দুটি গ্রামে — ফুলতলার দক্ষিণডিহি আর রূপসার পিঠাভোগ। একটি কবির শ্বশুরবাড়ি আর মামাবাড়ি, অন্যটি তাঁর পিতৃপুরুষের আদি ভিটা। জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে এই দুই গ্রামের আত্মীয়তা এত গভীর যে প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই অঞ্চল থেকেই ঠাকুরবাড়িতে বধূ এসেছেন। খুলনা শহর থেকে দুটি গ্রামই সহজ দিন-ভ্রমণের দূরত্বে — শহরের বাকি দর্শনীয় জায়গার তালিকা পাবেন আমাদের খুলনা শহর গাইডে; এই পোস্টে শুধু রবীন্দ্র-স্মৃতির দুই ঠিকানা।
গল্পটা শুরু পিঠাভোগ থেকে: কুশারীদের আদি ভিটা
রূপসা উপজেলার ঘাটভোগ ইউনিয়নের পিঠাভোগ গ্রামে, ভৈরব নদীর তীরে একসময় বসতি ছিল কুশারী পরিবারের। পারিবারিক ইতিহাস অনুযায়ী তারানাথ কুশারী এই গ্রামে আবাস গাড়েন; তাঁর বংশধর জগন্নাথ কুশারী বিয়ে করেন পাশের দক্ষিণডিহির শুকদেব রায় চৌধুরীর কন্যাকে — সেই বিয়ের সূত্রেই কুশারীরা পীরালি ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ভুক্ত হন এবং দুই গ্রামের বন্ধন শুরু। পরে জগন্নাথের বংশধর পঞ্চানন কুশারী সপ্তদশ শতকের শেষভাগে কলকাতার গোবিন্দপুরে চলে যান; ব্রাহ্মণ বলে প্রতিবেশীদের কাছে 'ঠাকুর' সম্বোধন পেতে পেতে কুশারী পদবী বদলে হয় ঠাকুর — পঞ্চানন থেকেই জোড়াসাঁকোর ঠাকুর গোষ্ঠীর যাত্রা, আর রবীন্দ্রনাথ তাঁর অধস্তন সপ্তম পুরুষ। পিঠাভোগের ভিটাটি পরিচিত 'আমিনের ভিটা' নামেও — জয়রাম ও রামসন্তোষ ঠাকুর ১৭৪২ সালে কলকাতার জরিপকাজে আমিন নিযুক্ত হয়েছিলেন বলেই এই নাম। আজ পিঠাভোগে সরকারি উদ্যোগে সংরক্ষিত বসতভিটা এলাকায় আছে রবীন্দ্র স্মৃতি সংগ্রহশালা। ১৯৯০-এর দশকে পূর্বপুরুষদের একটি কারুকার্যময় ভবন ভেঙে ফেলার ঘটনা ও পত্রিকার প্রতিবেদনের পর সরকার আদি বাড়িটি উদ্ধার করে; পরে প্রায় সাড়ে নয় একর জমিতে প্রত্নতাত্ত্বিক খননও হয়েছে। সবচেয়ে জীবন্ত তথ্য — ঠাকুরদের বংশধরদের কেউ কেউ আজও পিঠাভোগ গ্রামে বসবাস করেন। প্রতি বছর ২৫ বৈশাখ এখানে তিন দিনব্যাপী জাতীয় পর্যায়ের রবীন্দ্রজয়ন্তী অনুষ্ঠান ও বড় মেলা বসে; স্থানীয়দের দাবি, এই মেলার লোকসমাগম দেশের মধ্যে অন্যতম বড়।
দক্ষিণডিহি: যেখানে জন্ম সারদা আর মৃণালিনীর
খুলনা শহর থেকে প্রায় ১৯ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে ফুলতলা উপজেলার দক্ষিণডিহি গ্রামের সঙ্গে ঠাকুর পরিবারের সম্পর্ক তিন প্রজন্মের। রবীন্দ্রনাথের মা সারদা সুন্দরী দেবীর জন্ম এই গ্রামেই — কবি যৌবনে মায়ের সঙ্গে এখানকার মামাবাড়িতে এসেছেন কয়েকবার। তাঁর কাকি ত্রিপুরাসুন্দরী দেবীও এই গ্রামের মেয়ে। আর সবচেয়ে পরিচিত সংযোগটি তাঁর স্ত্রী: ১৮৮২ সালের পূজার ছুটিতে জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর সঙ্গে পুরনো ভিটা দেখতে এসে পাত্রীর সন্ধান চলছিল; দক্ষিণডিহির বেণীমাধব রায় চৌধুরীর কন্যা ভবতারিণীকেই পছন্দ হয় পরিবারের। ১৮৮৩ সালের ৯ ডিসেম্বর জোড়াসাঁকোতে বিয়ে হয় ২২ বছর বয়সী রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে প্রায় দশ বছর বয়সী ভবতারিণীর; ঠাকুরবাড়ির প্রথা অনুযায়ী বিয়ের পর তাঁর নাম রাখা হয় মৃণালিনী দেবী। আজ গ্রামের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সেই শ্বশুরবাড়ির স্মৃতিধন্য দোতলা ভবন — বেণীমাধব রায় চৌধুরীর বাড়ি। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এটিকে সংরক্ষিত প্রত্নস্থল ঘোষণা করে রবীন্দ্র কমপ্লেক্স হিসেবে জাদুঘরে রূপান্তরিত করেছে; প্রাঙ্গণে কবি ও কবিপত্নীর আবক্ষ মূর্তি স্থাপিত। ২৫ বৈশাখে রবীন্দ্রজয়ন্তী আর ২২ শ্রাবণে কবির প্রয়াণ দিবস এখানে নানা আয়োজনে পালিত হয়। একটি সৎ নোট — শান্তিনিকেতনের আদলে পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স গড়ার পরিকল্পনা তিন দশকেও পূর্ণতা পায়নি; উৎসবের দিনগুলো বাদে বছরের বাকি সময় জায়গাটি শান্ত ও কিছুটা নীরব থাকে। সেই নীরবতাটাই আসলে এই গ্রামভ্রমণের স্বাদ।
দুটো গ্রাম একদিনে: সূচি ও যাতায়াত
দুটি গ্রাম খুলনা শহরের দুই দিকে — দক্ষিণডিহি উত্তর-পশ্চিমে ফুলতলায়, পিঠাভোগ দক্ষিণ-পূর্বে রূপসায়। একদিনে দুটোই দেখতে হলে সকাল সকাল বের হোন: প্রথমে ফুলতলাগামী বাসে চড়ে দক্ষিণডিহি (শহর থেকে প্রায় ১৯ কিলোমিটার; ফুলতলা সদর থেকে আরও প্রায় তিন কিলোমিটার স্থানীয় যানে), দুপুরের মধ্যে ফিরে এসে বিকেলে রূপসা উপজেলায় পিঠাভোগ। রূপসায় যেতে খানজাহান আলী সেতু পেরিয়ে বাস বা স্থানীয় পরিবহন মেলে; রূপসা সদর থেকে পিঠাভোগ গ্রামে যাওয়া যায় ইজিবাইক বা ভ্যানে। হাতে গাড়ি থাকলে পুরো ভ্রমণটা আরও স্বস্তির হয়। সেরা সময় ২৫ বৈশাখের জয়ন্তী উৎসবের দিনগুলো — দুই জায়গাতেই তখন অনুষ্ঠান আর লোকসমাগম। অন্য সময়ে গেলে খোলা থাকার সূচি নিয়ে যাওয়ার আগে স্থানীয়ভাবে জেনে নেওয়া ভালো, কারণ উৎসবের বাইরে প্রাঙ্গণ দুটি বেশ নীরব থাকে।
টিপস
দুটো জায়গাই গ্রামের ভেতরে — পোশাক-আচরণে স্থানীয় সংবেদনশীলতা মনে রাখুন। পিঠাভোগে বংশধরদের বাড়ির দিকে গেলে অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত প্রাঙ্গণে ঢুকবেন না। দক্ষিণডিহির ভবনে জাদুঘর-অংশ দেখার সময় ভেতরে ছবি তোলার নিয়ম মেনে চলুন। গ্রীষ্মে গেলে পানি ও ছাতা সঙ্গে রাখুন — দুই গ্রামেই ছায়া আছে, তবে পথে রোদ লাগবেই। রবীন্দ্রনাথের বংশপরিচয় আর দক্ষিণের শিকড় নিয়ে আগ্রহ থাকলে ঢাকার বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সংগ্রহও এই আগ্রহের ভালো সঙ্গী।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
দক্ষিণডিহি আসলে কার বাড়ি?
রবীন্দ্রনাথের শ্বশুর বেণীমাধব রায় চৌধুরীর বাড়ি। আবার এটি কবির মাতুলালয়ও — তাঁর মা সারদা সুন্দরী দেবী এই গ্রামেই জন্মেছিলেন।
মৃণালিনী দেবীর আসল নাম কী ছিল?
ভবতারিণী। ১৮৮৩ সালে বিয়ের পর ঠাকুরবাড়ির প্রথা অনুযায়ী তাঁর নাম হয় মৃণালিনী দেবী।
পিঠাভোগকে 'আমিনের ভিটা' বলা হয় কেন?
ঠাকুর পরিবারের পূর্বপুরুষ জয়রাম ও রামসন্তোষ ১৭৪২ সালে কলকাতার জরিপকাজে আমিন পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন — সেই স্মৃতিতেই পৈতৃক ভিটাটি 'আমিনের ভিটা' নামে খ্যাত।
দুই গ্রাম কি একদিনে দেখা সম্ভব?
সম্ভব — সকালে দক্ষিণডিহি ও বিকেলে পিঠাভোগ রেখে সূচি সাজালে স্বস্তিতে দুটোই দেখা যায়। ব্যক্তিগত গাড়ি থাকলে আরও সহজ হয়।
কখন গেলে উৎসব পাওয়া যাবে?
২৫ বৈশাখে রবীন্দ্রজয়ন্তী উপলক্ষে দুই জায়গাতেই অনুষ্ঠান হয়; পিঠাভোগে তিন দিনব্যাপী মেলাও বসে। দক্ষিণডিহিতে ২২ শ্রাবণেও প্রয়াণ দিবস পালিত হয়।
শেষকথা
কলকাতা আর শান্তিনিকেতনের বাইরে রবীন্দ্রনাথকে খুঁজলে খুলনার এই দুই গ্রামই সবচেয়ে বিশ্বস্ত ঠিকানা — একদিকে মায়ের ও স্ত্রীর গ্রাম, অন্যদিকে বংশের আদি মাটি। ইতিহাসপ্রেমী ভ্রমণকারীর জন্য খুলনা সফরের সবচেয়ে গভীর অর্ধেকদিন কাটতে পারে এই দুই গ্রামে।