হাওর অঞ্চলের হিন্দু বিয়েতে একটি দৃশ্য অপরিহার্য: উঠোনের মাঝখানে পিঁড়িতে বর-কনে, আর তাদের ঘিরে বৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে হাততালি দিয়ে গান গাইছেন গ্রামের নারীরা — এই গীত-নৃত্যের নাম ধামাইল। আর এই ধারার সবচেয়ে বড় নাম সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরের সাধক-কবি রাধারমণ দত্ত — যাঁকে বলা হয় ধামাইল গানের জনক (বাসস)। মজার যোগসূত্র: জগন্নাথপুর নামের শহরটির গোড়াপত্তন হয়েছিল লাউড় রাজা বিজয় মাণিক্যের আমলে — আটশ বছর আগের রাজ্য আর দেড়শ বছর আগের কবি একই মাটির গল্প।
ধামাইল কী
- রূপ: মূলত নারীদের আচারকেন্দ্রিক লোকগান ও লোকনৃত্য — সিলেট ও ময়মনসিংহের হাওরবেষ্টিত এলাকায়, বিশেষ করে সুনামগঞ্জে প্রচলিত (বাংলা উইকিপিডিয়া)। সাত-আটজন থেকে শুরু করে বড় দলের নারীরা বৃত্তাকারে দাঁড়ান; একজন গান ধরেন, অন্যরা তালি ও পায়ের ছন্দে অনুসরণ করেন; গতি ধীরে ধীরে বাড়ে (ইংরেজি উইকিপিডিয়া/প্রথম আলো)।
- উপলক্ষ: বিয়ে (জলভরা, যাত্রা, দ্বিরাগমন), গায়ে হলুদ, অন্নপ্রাশন, পূজা-পার্বণ — মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান (ঢাকা মেইল)। হাওরাঞ্চলে হিন্দু বিয়ে ধামাইল ছাড়া অসম্পূর্ণ মনে করা হয় (প্রথম আলো)।
- জলভরার আচার: গানের আগে নারীরা নদী/পুকুর থেকে কলসি ভরে জল আনেন; বর-কনেকে মাঝখানে বসিয়ে সামনে সাজানো হয় কলস, ধান, দূর্বা, কুলা, প্রদীপ, সিঁদুরসহ নানা উপকরণ; গান শেষে সেই কলসির জল দিয়ে বর-কনেকে স্নান করানো হয় (প্রথম আলো)। গানের বিষয়বস্তুতে প্রাধান্য পায় রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা — আনন্দের সঙ্গে মিশে থাকে বিরহের বিষাদও (ঢাকা মেইল)।
- নাম ও প্রাচীনত্ব: ‘ধামাইল’ শব্দের উৎস নিয়ে মতভেদ — ‘ধামাল’ (আনন্দোচ্ছ্বাসের নৃত্য) থেকে, অথবা বৈষ্ণব কীর্তনের বৃত্তনৃত্যের বিবর্তন থেকে (ঢাকা মেইল)। শব্দটির দেখা মেলে চতুর্দশ শতকের কবি চণ্ডীদাস থেকে শুরু করে ষোড়শ-সপ্তদশ শতকের কবিদের রচনায়ও (ইংরেজি উইকিপিডিয়া) — অর্থাৎ ধারাটি পুরনো; সিলেটে একে বর্তমান রূপ দেওয়ার কৃতিত্ব দেওয়া হয় রাধারমণ ও আরকুম শাহকে।
- গবেষণা: বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের ধামাইল গান’ (সম্পাদনা: সুমনকুমার দাশ) গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে প্রায় ১,০০০ ধামাইল গান (বাংলা উইকিপিডিয়া)। রাধারমণ ছাড়াও হাওরাঞ্চলে জনপ্রিয় ধামাইল-রচয়িতা প্রতাপরঞ্জন তালুকদার — তাঁর গান ‘প্রতাপ-বান্ধা’ নামে পরিচিত।
রাধারমণ দত্ত: জীবন ও গান
- জন্ম-মৃত্যু:২৬ মে ১৮৩৩ সালে জগন্নাথপুর উপজেলার কেশবপুর গ্রামে জন্ম; মৃত্যু ১০ নভেম্বর ১৯১৫ (২৬ কার্তিক ১৩২২) (বাসস)। বাবা গীতিকার রাধামাধব দত্ত, মা সুবর্ণা দেবী; শৈশবেই পিতৃহারা হন (অনুশীলন)।
- সাধনা: সহজিয়া বৈষ্ণব গুরু রঘুনাথ স্বামীর কাছে দীক্ষা (১২৭৫ বঙ্গাব্দ); নলুয়ার হাওরের পাড়ে নির্জন আশ্রম গড়ে দীর্ঘ সাধনা করেন (অনুশীলন)। জীবনের শেষ ভাগে স্ত্রী ও দুই পুত্রের একযোগে মৃত্যু তাঁকে সংসার-ত্যাগী সাধনায় নিমগ্ন করে — বিডিনিউজের ব্লগ-প্রবন্ধ অনুযায়ী টানা ৩২ বছর তিনি সাধনা করেছেন।
- রচনা: দেহতত্ত্ব, ভক্তি, প্রেম, ভজন ও ধামাইলসহ কয়েক হাজার গান — তিনি ভাবাবেগে অনর্গল গাইতেন, শিষ্যরা লিখে নিতেন (বাংলা উইকিপিডিয়া/অনুশীলন)। সবচেয়ে প্রিয় গান ‘ভ্রমর কইও গিয়া’; আরও চেনা গান — ‘শ্যাম কালিয়া সোনা বন্ধুরে’, ‘কারে দেখাব মনের দুঃখ গো’, ‘শ্যাম চিকন কালিয়া’, ‘আমার গলার হার খুলে নে ওগো ললিতে’। তাঁর শততম মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়েছে (বাংলা উইকিপিডিয়া)। কৌতুকের মতো শোনালেও সত্যি — তাঁর ‘ভ্রমর কইও গিয়া’র সুর এক রোমানিয়ান শিল্পীর গানেও ধার করা হয়েছে বলে বিশ্বকোষ-জীবনীতে উল্লেখ আছে।
- সমাধি ও স্মরণ: কেশবপুরেই বৈষ্ণব মতে সমাহিত হন; সমাধিস্থলটি দীর্ঘকাল ধরে স্থানীয় সেবায়েৎদের যত্নে টিকে আছে — একজন প্রবাসীর অর্থায়নে পাকা করা হলেও সরকারি সংরক্ষণের বড় উদ্যোগের খবর সাম্প্রতিক সূত্রে মেলেনি (বিডিনিউজ)। তবে স্মরণ থেমে নেই: ২০২৫ সালের নভেম্বরে তাঁর ১১০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে সুনামগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমি বাউল চত্বরে স্মরণসভা ও গান পরিবেশনের আয়োজন করে (বাসস)।
ভ্রমণকারীর জন্য: ধামাইল ‘দেখা’ যায় কীভাবে
ধামাইল মঞ্চনাটক নয় — এটি জীবন্ত আচার; টিকিট কেটে দেখার আসর নেই। তবু অভিজ্ঞতা পাওয়ার উপায় আছে:
- বিয়ের মৌসুমে (শীতকাল) হাওর-গ্রামে আমন্ত্রণ/পরিচয়সূত্রে বিয়েবাড়িতে গেলে জলভরার ধামাইল দেখার সুযোগ সবচেয়ে বেশি — অচেনা বাড়িতে অনাহূত হাজির হওয়া নয়, স্থানীয় যোগাযোগই ভরসা।
- কেশবপুর, জগন্নাথপুর: কবির জন্মগ্রাম ও সমাধি — সুনামগঞ্জ শহর থেকে জগন্নাথপুর হয়ে যাওয়া যায়; সঙ্গে দেখে নিন জগন্নাথপুরের বিজয় মাণিক্য-যুগের ঐতিহ্যও।
- সংস্কৃতি-অনুষ্ঠানে: জেলা শিল্পকলা একাডেমির অনুষ্ঠান, পহেলা বৈশাখ ও লোকউৎসবে ধামাইল পরিবেশনা মেলে; নভেম্বর (কার্তিক) কবির মৃত্যুবার্ষিকী কেন্দ্রিক আয়োজনের মাস।
- সীমান্তের ওপারেও: ধামাইল জীবিত আছে আসামের বরাক উপত্যকা ও ত্রিপুরার সিলেটি-সংস্কৃতি অঞ্চলেও — সংস্কৃতিটি সীমান্ত মানে না (টাইমস অব ইন্ডিয়া)।
সত্যকথা: ঐতিহ্যটি চাপের মুখে
আধুনিক বিয়ের ডিজে-সংস্কৃতি আর শহরমুখী জীবনে গ্রামে ধামাইল-জানা নারীদের সংখ্যা কমছে — পুনরুজ্জীবনের কর্মশালা ও সংকলনের উদ্যোগ চললেও ধারাটি যে আগের মতো স্বতঃস্ফূর্ত নয়, তা পরিবেশক-গবেষকেরা বলছেন। ঐতিহ্য-ভ্রমণের নৈতিকতা এখানেই: আচারটিকে ‘শো’ বানিয়ে না ফেলে শ্রদ্ধা ও অনুমতি নিয়ে উপস্থিত হোন, ছবি-ভিডিওর জন্য সম্মতি নিন।
নমুনা দিনসূচি
- সকাল: সুনামগঞ্জ শহর থেকে জগন্নাথপুর; কেশবপুরে কবির সমাধি ও জন্মভিটা।
- দুপুর: জগন্নাথপুর বাজারে খাওয়া; নলুয়ার হাওরের পাড়ে বিকেলের হাঁটা।
- সন্ধ্যা: সুনামগঞ্জে ফিরে শিল্পকলা একাডেমি/বাউল চত্বরের অনুষ্ঠান থাকলে তাতে যোগ।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ধামাইল শুধু নারীরাই করেন?
আসরের নাচ-গান নারীদেরই; বাদ্যযন্ত্রে (মৃদঙ্গ-করতাল) পুরুষেরা সঙ্গ দিতে পারেন (ইংরেজি উইকিপিডিয়া) — প্রাণটা নারীকেন্দ্রিকই।
রাধারমণ দত্তের সমাধি কোথায়?
জগন্নাথপুর উপজেলার কেশবপুর গ্রামে — সেখানেই তাঁকে সমাহিত করা হয় (বিডিনিউজ/বাসস)।
ধামাইল দেখতে সেরা সময় কোন মাসে?
বিয়ের মৌসুম (শীতকাল) ও বৈশাখী/লোকউৎসবের সময়ে — আচারকেন্দ্রিক বলে নির্দিষ্ট ‘শো-টাইম’ নেই।
শেষকথা
রাধারমণের ধামাইল আর হাসন রাজার মরমি গান — সুনামগঞ্জের দুই মহীরুহ যেন একই হাওরের দুই পাড়। এখানেই শেষ হচ্ছে সুনামগঞ্জ জেলার সিরিজ; পরের গন্তব্য হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান।